মানিকলাল বললে, তাহলে এটাও বুঝতে হবে যে, সে আমাদেরও নাগালের বাইরে নেই।
জয়ন্ত বললে, এই চিঠি দুখানিই সে-প্রমাণও দিচ্ছে!
মানিকলাল হাসতে হাসতে বললে, এইবারে আমার মাথাও একটু একটু করে খুলছে। মুকুন্দ নন্দীর গদিতে আমরা বেশিক্ষণ ছিলুম না। কিন্তু আমরা বাড়ি আসবার পথেই এই চিঠি দুখানা পেয়েছি। পত্ৰলেখক নিশ্চয়ই খুব কাছেই ছিল!
জয়ন্ত বললে, খুব কাছে–হ্যাঁ, কাছের এক বাড়িতে।
মানিকলাল বললে, বাড়িতে?
নিশ্চয়! বাড়ির নামে তুমি যখন সন্দেহ করছ, তখন তোমার বুদ্ধি খুলতে এখনও দেরি আছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা গাড়িতে বসে চিঠি লিখলে খামের পিছনে ওই রাসায়নিক গুঁড়োগুলো উঠে আসত কি?
মানিক উৎসাহ ভরে বলে উঠল, ঠিক, ঠিক, ঠিক! অপরাধী তাহলে বাগবাজারেই থাকে, তাকে গ্রেপ্তার করা শক্ত হবে না!
জয়ন্ত গম্ভীর ভাবে বললে, এত সহজেই উৎসাহিত হোয়ো না মানিক! চারে মাছ থাকলেই সে যে ডাঙায় উঠবে, এমন কোনও কথা নেই। আমি কেবল এইটুকু বলতে পারি যে, অপরাধী চিঠি লিখে অন্ধকার অনেকটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। কিন্তু ওকথা এখন থাক, আমার আর একটা আবিষ্করের কথা শোনো। দেখো দেখি, এটা কী? এই বলে সে টেবিলের উপর ছোট একটি কাগজের মোড়ক তুলে মানিকের দিকে এগিয়ে দিলে।
মোড়ক খুলে মানিক দেখলে, এক টুকরো শুকনো মাটি।
জয়ন্ত বললে, কিছু বুঝতে পারছ?
মানিক বললে, দেখে মনে হচ্ছে, গঙ্গামাটি।
জয়ন্ত ঘাড় নেড়ে বললে, ঠিক বলেছ। মুকুন্দ নন্দীর গদির যে জানলার গরাদ ভেঙে চোরেরা ঘরের ভিতরে ঢুকেছিল, সেই জানালায় এই মাটিটুকু লেগে ছিল–ভিতর দিকে নয়, বাইরের দিকে। অমন জায়গায় গঙ্গামাটি থাকার কারণ কি? খুব সম্ভব, চোরদের কারুর পায়ে তা ছিল, ঘরে ঢোকবার সময়ে জানালার গায়ে লেগে গিয়েছে।
মানিক অল্পক্ষণ ভেবে বললে, মুকুন্দ নন্দীর গদি বাগবাজারের অন্নপূর্ণা ঘাট থেকে বেশি দূরে নয়। তবে কি চোরেরা গঙ্গার দিক থেকে এসেছে?
সবাই এসেছে কিনা জানি না, তবে একজন যে এসেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।…জয়ন্ত হঠাৎ চমকে উঠে সামনের জানালা দিয়ে পথের দিকে তাকালে, তারপর বললে, মানিক, ওই দেখো, যে আমাকে চিঠি দিয়ে গেছে, সে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছে।
মানিক তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়ে দেখলে, একজন ময়লা কাপড়পরা নিম্নশ্রেণির লোক রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। সে উত্তেজিত স্বরে বললে, আমরাও যেন মনে হচ্ছে ওই লোকটাই আমাকে চিঠি দিয়ে গেছে।
জয়ন্ত বললে, মানিক, ওকে এখানে ডেকে আনতে পারো?
যদি না আসে?
জোর করে ধরে আনবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, গায়ের জোরের দরকার হবে না। ও-লোকটা বোধ হয় চোরদের দলের লোক নয়, দেখছ না ওর ভাবভঙ্গি কেমন নিশ্চিন্ত।
জয়ন্তের কথাই সত্য। মানিক গিয়ে ডাকবামাত্রই লোকটা তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতরে। এল বিনা আপত্তিতে। জয়ন্ত শুধোলে, তুমি কোথায় থাকো?
কুমোরটুলিতে।
কী করো?
চায়ের দোকানে চাকরি করি, খাই-দাই আর বেড়িয়ে বেড়াই।
বেশ, বেশ, তা হলে তুমি তো দেখছি বেশ খুশিতে আছ।
তা আর থাকব না মোশয়! আমি কারুর কোনও ধার ধারি না, একটা বই পেট নয়, ভাবনা-চিন্তে কিছুই নেই! তার ওপরে আজকে আবার বেশি খুশিতে আছি।
বেশি খুশিতে আছ! কেন বল দেখি?
তা যেন বলছি, কিন্তু আপনারা এত কথা জানতে চাইছেন কেন?
তোমাকে আরও বেশি খুশি করব বলে। তুমি নগদ একটাকা রোজগার করবে?
কে দেবে?
আমি!
আমায় কি করতে হবে?
আগে তোমার এত খুশির কারণ শুনি, তারপর বলব।
তবে শুনুন মোশয়! আজ সকালে গঙ্গার ধার থেকে বেড়িয়ে ফিরছি, হঠাৎ এক বাবু এসে আমাকে বললে, ওই যে দুজন লোক দুদিকে চলে যাচ্ছে ওদের একজনের নাম জয়ন্ত, আর একজনের নাম মানিক। ওদের এই চিঠি এক-একখানা দিয়ে যদি ছুটে পালিয়ে আসতে পারিস, তাহলে নগদ একটাকা বকশিশ পাবি।
আমি তখনই রাজি হয়ে গেলুম, এ আর
জয়ন্ত বাধা দিয়ে বললে, বুঝেছি, আর বলতে হবে না। এখন আমার কথা শোনো। সেই বাবুটিকে কেমন দেখতে, তোমার মনে আছে কি? সে বুঝলে, এই বেশি খুশি লোকটি আহ্লাদে আটখানা হয়ে তাদের কারুকেই চিনতে পারেনি।
লোকটা বললে, খুব খুঁটিয়ে বলতে পারব না মোশয়! তবে তার রং কালো নয় আর দেহ খুব লম্বা-চওড়া, আর,
আর? থামলে কেন, বলো না।
বাবুটি যখন আমাকে টাকা দেয় তখন আমি দেখেছিলুম, তার ডান-হাতের বুড়ো আঙুলটা নেই।
মানিক সচমকে জয়ন্তের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে। কিন্তু জয়ন্তের মুখ স্থির।
লোকটা বললে, এখন আমাকে কি করতে হবে মোশয়?
জয়ন্ত পকেট থেকে একটা টাকা বার করে লোকটার হাতে দিয়ে বললে, তোমাকে আর কিছু করতে হবে না, তুমি এখন যাও।
লোকটা অবাক হয়ে খানিকক্ষণ জয়ন্তের মুখের পানে তাকিয়ে রইল, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে উচ্ছ্বসিত স্বরে বললে, বোম মহাদেব। মা লক্ষ্মী দেখছি আজ টাকা বৃষ্টি করছেন।
জয়ন্ত বললে, শুনলে মানিক, তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল নেই! কাজেই তাকে বাঁ হাতে চিঠি লেখা অভ্যাস করতে হয়েছে!
মানিক অভিভূত স্বরে বললে, জয়, জয়, তুমি কি জাদুকর!
জয়ন্ত বললে, মানিক, ভগবান সবাইকে চোখ দিয়েছেন, কিন্তু সবাইকে সমান দেখবার ক্ষমতা দেননি। যেমন সকলেই লিখতে পারলেও সকলেই কবিতা লিখতে পারে না, তেমনি সকলেই দেখতে পেলেও সকলেই আসল জিনিসটুকু দেখতে পায় না। আমি জাদুকর নই ভাই, আমি তোমার বন্ধু!–এই বলে সে খুব বড় এক টিপ নস্য নাকের গর্তে গুঁজে দিল।
