মানিকাল ঘাড় নেড়ে জানালে, হ্যাঁ।
আপনার নামে একখানা চিঠি আছে, এই নিন!
মানিকলাল হাত বাড়িয়ে চিঠিখানা নিলে। খাম ছিঁড়ে চিঠি বার করে পড়লেঃ
মানিকবাবু আমাদের চোখ সর্বত্র। মুকুন্দ নন্দীর গদিতে চুরি হইয়াছে তো আপনাদের কি? যদি প্রাণের মায়া রাখেন, এ ব্যাপার থেকে সরিয়ে দাঁড়ান। না হলে, মৃত্যু অনিবার্য।
পত্রে লেখকের নাম নেই।
পত্র দেখে দৃষ্টি তুলে মানিকলাল দেখলে, যে চিঠি নিয়ে এসেছিল সে কোথায় অদৃশ্য হয়েছে!
মানিকলের আর নিজের বাড়িতে যাওয়া হল না, সে আবার জয়ন্তের বাড়ির দিকে ছুটল।
দুই হাতের উপর মুখ রেখে জয়ন্ত চুপ করে টেবিলের সামনে বসে ছিল।
মানিকলাল ঘরে ঢুকেই চিঠিখানা টেবিলের উপরে ফেলে দিয়ে বললে, জয়, আর-এক নতুন কাণ্ড!
জয়ন্ত একটুও নড়ল না, চিঠির দিকে তাকিয়েও দেখলে না। সহজ ভাবেই বললে, চিঠিতে কি লেখা আছে আমি তা জানি।
জানো?
হ্যাঁ। আমিও এখনি ওইরকম একখানা চিঠি পেয়েছি।
.
একটি বেশি-খুশি মনুষ্য
মানিকলাল সবিস্ময়ে বললে, তুমিও এইরকম একখানি চিঠি পেয়েছ?
হ্যাঁ।
যে চিঠি দিয়েছে তাকে ধরতে পারোনি?
না। কিন্তু তার চেহারা দেখে নিয়েছি, তাকে আবার দেখলেই চিনতে পারব। তবে আমার বিশ্বাস চিঠি সে লেখেনি, সে পত্রবাহক ছাড়া আর কেউ নয়।
তোমার এ বিশ্বাসের কারণ কি?
কারণ, চিঠিখানা এরই মধ্যে আমি কিছু কিছু পরীক্ষা করে দেখেছি।–এই বলে জয়ন্ত টেবিলের উপর থেকে মানিকলের চিঠিখানাও তুলে নিলে, তারপর হঠাৎ উঠে পাশের ঘরে চলে গেল।
পাশের ঘরটি হচ্ছে জয়ন্তের পরীক্ষাগার। মানিকাল বুঝলে, তার চিঠিখানা ভালো করে পরীক্ষা করবার জন্যেই জয়ন্ত ও-ঘরে গেল। সে চুপ করে বসে আজকের ঘটনাগুলো নিয়ে মনে-মনে নাড়াচাড়া করতে লাগল কিন্তু কোনও সূত্রই আবিষ্কার করতে পারলে না।
খানিকক্ষণ পরেই জয়ন্ত পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। অন্যমনস্ক ভাবে যেন নিজের মনেই বললে, না, কোনও সন্দেহ নেই–কোনও সন্দেহ নেই!
মানিক বললে, তোমার কথার অর্থ কি জয়?
জয়ন্ত চেয়ারের উপরে বসে পড়ে এক টিপ নস্য নিয়ে বললে, এই চিঠি দুখানা যে লিখেছে, তার সম্বন্ধে কতকগুলি দরকারি কথা, আমি জানতে পেরেছি।
যথা?
শোনো? পত্ৰলেখক বাঁ-হাতে চিঠি লিখেছে। যাঁরা হাতের লেখা সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ তাঁরা সকলেই জানেন, ডান-হাতের আর বাঁ-হাতের লেখার ছাঁদ হয় আলাদা রকম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পত্ৰলেখক বাঁ-হাত ব্যবহার করেছে কেন? তুমি হয়তো মনে করবে, সে তার ডানহাতের লেখা লুকোবার জন্যেই বাঁ-হাতে লিখে আমাদের ফাঁকি দিতে চেয়েছে। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে অনভ্যাসের জন্যে বাঁ-হাতের চিঠি লেখবার তিনটি কারণ থাকতে পারে। এক ও কারুর কারুর মতন সে হয়তো দুই হাতেই চিঠি লিখতে পারে। দুই ও কারুর কারুর মতন তার হয়তো ডান-হাতের চেয়ে বাঁ-হাতই ভালো চলে। তিন ও হয়তো তার ডান হাত নেই বা থাকলেও অকর্মণ্য, কাজেই তাকে বাঁ-হাতে লেখার অভ্যাস করতে হয়েছে।
মানিকলাল বললে, আর কিছু জানতে পেরেছ?
জয়ন্ত বললে, পেরেছি বইকী। ভালো করে লক্ষ করবার সময় পেলে তুমিও বুঝতে পারতে যে, পত্রলেখক ফাউন্টেন পেনে, সবুজ কালিতে লেখে। খাম আর চিঠির কাগজ কীরকম পুরু আর দামি দেখেছ তো? সাধারণ লোক চিঠি লেখার জন্যে এত অর্থ ব্যয় করে না, আবার অনেক ধনী লোকেও করে না; সুতরাং পত্ৰলেখক কেবল ধনী নয়, বিলাসীও। এই চিঠি লিখে সে মস্ত ভ্রম করেছে, আমাদের অনেক পরিশ্রম বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি? সে বাঙালি, ধনী, বিলাসী আর বাঁ-হাতে লেখে। অপরাধীকে ধরবার জন্যে আমাদের আর কলকাতার নানান জাতের লোকের পিছু নিতে হবে না।
মানিকলাল বললে, কিন্তু কলকাতায় বাঙালির সংখ্যাও তো কম নয়।
জয়ন্ত টেবিলের উপরে নস্যদানিটা ঠুকতে ঠুকতে বললে, মানিক, আমি আরও কিছু কিছু দরকারি কথা জানতে পেরেছি। অপরাধী যদি ইউরোপের লোক হত তাহলে কখনও চিঠি লিখে আমাদের এমন করে শাসাতে সাহস করত না। ইউরোপের পুলিশকে বিজ্ঞান এখন শাসন করে! চোর-ডাকাত-খুনিদের বিরুদ্ধে সেখানকার পুলিশ এখন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে বসে প্রমাণ সংগ্রহ করে। অপরাধীদের ব্যবহৃত ছোটখাটো কোনও জিনিস দেখেও অনেক রহস্য ধরে ফেলা যায়। পত্রলেখক আমাকে চেনে, কিন্তু আমারও যে কোনও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগার আছে এটা জানলে সে চিঠি লেখবার সময় আরও বেশি সাবধান হত! মানিক, পত্ৰলেখক হচ্ছে হয় রাসায়নিক, নয় তার টেবিলের উপরে নানারকম রাসায়নিক চূর্ণ ছড়ানো থাকে।
তাই নাকি, তাই নাকি?
হ্যাঁ। আমি খুব শক্তিশালী অনুবীক্ষণ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলুম, চিঠির খামের পিছনদিকের তিন-চার রকম রাসায়নিক চূর্ণ লেগে রয়েছে সাদা চোখে তা দেখা যায় না। খুব সম্ভব, পত্ৰলেখক জল দিয়ে খাম এঁটে সেখানাকে টেবিলের উপরে চেপে ধরেছিল–লোকে প্রায়ই যা করে থাকে। সাদা চোখে অদৃশ্য ওইসব রাসায়নিক চুর্ণ তার টেবিলের উপরে ছড়ানো ছিল তারই কিছু কিছু খামের গায়ে লেগে গিয়েছে।
মানিকলাল চমৎকৃত হয়ে বললে, এ যে আলিবাবার গল্পের কুনকের সঙ্গে মোহর উঠে আসার মতো হল!
হ্যাঁ, প্রায় সেই রকমই বটে। এখন বুঝে দেখো, কোনও সাধারণ লোকের টেবিলেই নানারকম রাসায়নিক চূর্ণ ছড়ানো থাকে না। সুতরাং আমাদের এই প্রেরক যে কেমিস্ট্রি নিয়ে নাড়াচাড়া করে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। মানিক, সে বাঁ-হাতে ফাউন্টেন পেনে সবুজ কালিতে লেখে আর আমাদের কার্যকলাপ সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে।
