মানিকলাল বয়সে জয়ন্তের চেয়ে বছর দুই-এক ছোট হবে। নিয়মিত ব্যায়ামাদির দ্বারা যদিও তারও দেহ খুব বলিষ্ঠ, কিন্তু তার আকার সাধারণ বাঙালিরই মতন ইচ্ছে করলেই সে আর পাঁচজনের ভিতরে গিয়ে অনায়াসেই আপনাকে লুকিয়ে ফেলতে পারত।
জয়ন্ত ও মানিকলাল দুজনেই এক কলেজে পড়াশুনা করত–কিন্তু নন-কো-অপারেশন আন্দোলনের ফলে তারা দুজনেই কলেজি পড়াশুনো ত্যাগ করেছিল। তারা দুজনেই পিতৃ-মাতৃহীন, কাজেই স্বাধীন। দুজনেরই কিছু কিছু পৈতৃক সম্পত্তি আছে, কাজেই তাদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবার ভয়ও নেই।
ছেলেবেলা থেকেই তাদের ভারি শখ, বিলাতি ডিটেকটিভের গল্প পড়বার। এসব গল্প তারা একসঙ্গে বসেই পড়ত এবং গল্প শেষ হলে তাদের ভিতরে উত্তপ্ত আলোচনা চলত। এডগার অ্যালেন পো, গেবোরিও, কন্যান ডইল ও মরিস লেল্লাঙ্ক প্রভৃতি বিখ্যাত লেখকদের কাহিনি তো তারা একরকম হজম করেই ফেলেছিল এবং হাতে সময় থাকলে অবিখ্যাত লেখকদেরও রচনাকে তারা অবহেলা করতে পারত না। কিন্তু তাদের কাছে উপাস্য দেবতার মতন ছিলেন কন্যান ডইল সাহেবের দ্বারা সুপরিচিত ডিটেকটিভ শার্লক হোমস।
একটি বোতাম, এক টুকরো কাগজ বা একটা ভাঙা চুরোটের পাইপের মতন তুচ্ছ জিনিস দেখে শার্লক হোমস বড় বড় চুরির বা খুনের আসামিকে ধরে ফেলতে পারতেন, জয়ন্ত ও মানিকলাল রুদ্ধশ্বাসে তার সেই বাহাদুরির কথা পাঠ করত এবং বসে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। দেখত, তারাও যেন গোয়েন্দা হয়ে শার্লক হোমসের মতন তুচ্ছ সূত্র ধরে বড় বড় চুরি-রাহাজানি খুনের কিনারা করে ফেলে লোকের চোখে তাগ লাগিয়ে দিচ্ছে।
এইভাবে আলোচনা করতে করতে ক্রমে তাদের পর্যবেক্ষণশক্তি এতটা বেড়ে উঠল যে, পাড়ার কয়েকটা ছোটখাটো চুরির আসামিকে পুলিশের আগেই ধরে ফেলে সত্য-সত্যই সবাইকে অবাক করে দিলে। তারপর একটা শক্ত খুনের কেসে তারা খুবই নামজাদা হয়ে পড়ল। পুলিশ যখন হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল, সেই সময়েই কেসটা হাতে নিয়ে জয়ন্ত হপ্তাখানেকের ভিতরে খুনিকে ধরে পুলিশের কবলে সমর্পণ করেছিল!..এইরকম আরও চার-পাঁচটা জটিল চুরি ও খুনের রহস্য ভেদ করে জয়ন্ত ও মানিকালের নাম এখন চারিদিকেই সুপরিচিত।
.
জয়ন্ত ও মানিকাল এসেছে শুনে মুকুন্দবাবু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে তাদের খুব আদর করে গদির ভিতরে নিয়ে গেলেন।
জয়ন্ত বললে, আমাদের একেবারে চুরির ঘরে নিয়ে চলুন। আমি বাজে কথায় সময় নষ্ট করতে চাই না।
যে-ঘরে চুরি হয়েছিল সে-ঘরে ঢুকে জয়ন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চারিদিকে একবার চেয়ে দেখলে। ভাঙা লোহার সিন্দুকটা পরীক্ষা করে বললে, আচ্ছা, এই সিন্দুক ভাঙার শব্দেও আপনাদের ঘুম ভেঙে যায়নি?
মুকুন্দবাবু বললেন, আমার ঘুম খুব সজাগ আর আমি পাশের ঘরেই থাকি। অথচ শুনলে আপনি অবাক হবেন যে, কাল আমার ঘুম ভাঙেনি!
আপনার যে কর্মচারী আহত হয়েছেন, তিনি এখন কোথায়?
হাসপাতালে!
কারা তাকে আক্রমণ করেছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেছেন?
সে বিশেষ কিছুই বলতে পারেনি, কারণ, অন্ধকারে সে কারুকেই দেখতেই পায়নি। তবে যখন তাকে জানলা গলিয়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন সে চকিতের মধ্যে দেখতে পেয়েছিল যে, নীচে চার-পাঁচজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
হু বলে জয়ন্ত একটা জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। সে জানলার আগে ছয়টা লোহার শিক ছিল, এখন মাত্র দুইটা অবশিষ্ট আছে। জয়ন্ত একটা শিক ধরে টেনে বুঝল, এরকম চার-চারটে শিক দুমড়ে খুলে ফেলা বড় সামান্য শক্তির কাজ নয়। হঠাৎ সেই শিকের এক জায়গায় তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। শিকটার লোহার গায়ে একটু চিড় খেয়েছে, এবং সেইখানেই একগোছা কটা চুল বা লোম আটকে রয়েছে। জয়ন্ত সাবধানে ও সযত্নে সেই চুলের গোছা টেনে নিয়ে একখানা কাগজে মুড়ে পকেটের ভিতরে রাখলে এবং একটি শামুকের নস্যদানি থেকে এক টিপ নস্য নিয়ে নাকের ভিতরে গুঁজে দিলে।
মানিকাল জানত, জয়ন্ত যখনই মনে মনে কোনও কারণে খুশি হয়ে ওঠে, তখন এক টিপ নস্য না নিয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু আপাতত তার খুশি হবার কোনও কারণ আবিষ্কার করতে না পেরে, এগিয়ে এসে চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাপার কী?
জয়ন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে বললে, একটা ভালো সূত্র পেয়েছি। বৈকালে বলব।
মুকুন্দবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, ওকী জয়ন্তবাবু, এখনি চললেন যে?
জয়ন্ত বললে, আমার যা জানবার তা জেনেছি। নতুন কিছু ঘটনা ঘটলে আমাকে তখনই জানাবেন।
মুকুন্দবাবু বললেন, অবশ্যই তা জানাব। জয়ন্তবাবু, আপনার শক্তির কথা আগেই শুনেছি। দেখবেন, আমাকে যেন ভুলবেন না। পুলিশের চেয়ে আমি আপনাকে বেশি বিশ্বাস করি। পুলিশ ঘুষ খায়, আপনি খাঁটি লোক।
জয়ন্ত ফিরে রুক্ষস্বরে বললে, আমি খাঁটি লোক, আপনি তা জানলেন কি করে? মিছে। তোষামোদ আমি ভালোবাসি না।
রাস্তায় এসে জয়ন্ত বললে, মানিকলাল, বাড়িতে গিয়ে খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম করেই আবার আমার সঙ্গে দেখা কোরো–বলেই সে হনহন করে এগিয়ে গেল।
মানিকলাল নিজের বাড়ির পথ ধরে অগ্রসর হল। যখন সে প্রায় বাড়ির কাছে এসে পড়েছে, হঠাৎ একজন লোক পিছন থেকে তার নাম ধরে ডাকলে।
মানিকলাল ফিরে দেখলে, কিন্তু তাকে চিনতে পারলে না।
লোকটা বললে, আপনারই নাম তো মানিকবাবু?
