বিমল বললে, কিন্তু আমি আজ যে জীবটাকে দেখলুম, তার নীচের দিকটা জলের তলায় ঢাকা ছিল। আর তার মুখে ছিল একরাশ দাড়ি গোঁফ। সে নারী নয়।
কুমার বললে, মৎস্যনারী যদি থাকে তবে মৎস্যনরও আছে!
বিনয়বাবু বললেন, হয়তো ও-জীবটা বানের টানে বা অন্য কোনও কারণে হঠাৎ ব্রহ্মপুত্রের জলে এসে পড়েছে। দিনের বেলায় গুহার ভিতরে লুকিয়ে থাকে, আর রাত্রে বেরিয়ে স্বদেশে ফিরতে না পেরে কেঁদে কেঁদে বেড়ায়!
কিন্তু এর পরেও তার কান্না আর কেউ শুনতে পায়নি। তার কারণ কি বিমলের রিভলভার?
জয়ন্তের কীর্তি (উপন্যাস)
রহস্যময় চুরি
সকালবেলা। শীতকাল। খিড়কির ছোট বাগানের একপাশে, একখানা ইজিচেয়ারে শুয়ে জয়ন্ত একমনে বিলাতি ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়ছে আর তার গায়ের উপর দিয়ে খেলা করে যাচ্ছে, কাঁচা সোনার মতো কচি রোদের মিষ্টি হাসিটুকু।
এমনসময় মানিকলাল উধ্বশ্বাসে সেখানে ছুটে এসে বললে, জয়, জয়—
জয়ন্ত বই থেকে মুখ তুলে বললে, হয়েছে কি? অমন করে ছুটে আসছ কোত্থেকে?
মুকুন্দ নন্দীর গদি থেকে।
কিন্তু ছুটে আসছ কেন? কেউ তোমাকে লাঠি নিয়ে তাড়া করেছে নাকি?
ইজিচেয়ারের হাতলের উপর বসে পড়ে মানিকলাল বললে, হুঃ, আমাকে লাঠি নিয়ে তাড়া করে, এ অঞ্চলে এমন লোক তো কাউকে দেখি না। আমি তাড়াতাড়ি ছুটে আসছি তোমাকে একটা মস্ত খবর দেওয়ার জন্যে। কাল মুকুন্দ নন্দীর গদিতে একটা রহস্যময় চুরি হয়ে গেছে!
জয়ন্ত সিধে হয়ে বসে বললে, রহস্যময় চুরি?
হুঁ। এই দেখো খবরের কাগজ।
তুমি পড়ে শোনাও।
মানিকলাল খবরের কাগজ থেকে পড়ে শোনাতে লাগলঃ
রহস্যময় চুরি
গতকল্য গভীর রজনীতে বাগবাজারের শ্রীযুক্ত মুকুন্দলাল নন্দীর গদিতে এক রহস্যময় চুরি হইয়া গিয়াছে। গদির কার্য শেষ হইয়া যাইবার পর মুকুন্দবাবু যথারীতি হিসাব মিলাইয়া শয়ন করিতে যান। গদিতে সেদিন অনেক টাকার কাজ হইয়াছিল এবং সে টাকা লোহার সিন্দুকের ভিতরে তুলিয়া রাখা হইয়াছিল। সিন্দুকের পাশেই মুকুন্দবাবুর এক কর্মচারী শয়ন করিয়াছিল। গভীর রাত্রে হঠাৎ তাহার নিদ্রাভঙ্গ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে কে তাহাকে ধরিয়া শূন্যে তুলিয়া জানালা দিয়া দ্বিতলের উপর হইতে নিম্নতলে নিক্ষেপ করে। ভাগ্যক্রমে জানালার নিচেই মেদি পাতার ঝোপ ছিল, তাই তাহার উপরে পড়িয়া লোকটি অজ্ঞান হইয়া গেলেও তাহার আঘাত সাংঘাতিক হয় নাই। জ্ঞানেনাদয়ের পর তাহার আর্তনাদে গদির আর সকলকার নিদ্রাভঙ্গ হয়। তাহার মুখ হইতে সমস্ত শুনিয়া মুকুন্দবাবু তখনি লোহার সিন্দুকের ঘরে যান। কিন্তু ঘরের দ্বার ভিতর হইতে বন্ধ ছিল। তখন দ্বার ভাঙিয়া ফেলা হয়। ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া সকলে দেখেন যে, লোহার সিন্দুকের দরজা ভাঙা, ভিতরে টাকাকড়ি কিছুই নাই। একটা জানলার চারিটা লোহার শিক দুমড়াইয়া কে বা কাহারা খুলিয়া ফেলিয়াছিল,–শিকগুলি বাড়ির বাহিরে জানালার ঠিক নীচেই পাওয়া গিয়াছে। চোরেরা যে এই ভাঙা জানালা দিয়াই ভিতরে ঢুকিয়া আবার বাহির হইয়া গিয়াছে, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নাই। মুকুন্দবাবুর প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা সিন্দুক হইতে অদৃশ্য হইয়াছে বলিয়া প্রকাশ। পুলিশ জোর তদন্ত শুরু করিয়াছে।
জয়ন্ত সমস্ত শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বললে, আচ্ছা মানিকলাল, মাসতিনেক আগে ভবানীপুরের এক বড় জুয়েলারের দোকান থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার অলঙ্কার চুরি যায়, মনে আছে?
আছে। কিন্তু সে চুরির সঙ্গে এ-চুরির সম্পর্ক কি?
সম্পর্ক হয়তো কিছুই নেই। কিন্তু সে-চুরির সঙ্গে এ-চুরির মিল আছে অনেকটা।
হ্যাঁ, তা বটে। চোরেরা সেখানেও জানলার লোহার গরাদ ভেঙে ভিতরে ঢুকেছিল আর লোহার সিন্দুকের কপাট ভেঙে গহনা নিয়ে পালিয়েছিল–ঠিক কথা।
জয়ন্ত বললে, কেবল তাই নয়, একজন দারোয়ানকে ধরে তুলে এমন আছাড় মেরেছিল যে তার প্রাণ প্রায় যায় যায় হয়েছিল।
মানিকলাল উৎসাহিত হয়ে বললে, ঠিক, ঠিক! তুমি কি বলো, সেই চোরের দলই কাল মুকুন্দ নন্দীর গদিতে এসে হানা দিয়েছে?
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বললে, আমি এখন ওসব কিছুই বলতে চাই না। আমি এখন খালি জানতে চাই যে, মুকুন্দ নন্দীর সঙ্গে তোমার আলাপ আছে কি না?
মানিকাল বললে, হা, অল্প-স্বল্প আলাপ-পরিচয় আছে বইকী! মুকুন্দবাবু আমাকে তো চেনেনই, তোমারও খ্যাতি তাঁর অজানা নেই। এইমাত্র আমি যখন গদি থেকে আসি, তিনিও আমার সঙ্গে তোমার কাছে আসতে চাইছিলেন।
জয়ন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললে, চলো, তাহলে আর দেরি করে কাজ নেই, একবার গদিটা দেখেই আসি।
.
বেনামা চিঠি
এইবার আগে জয়ন্ত আর মানিকলের একটুখানি পরিচয় দেওয়া দরকার।
জয়ন্তের বয়স একুশ-বাইশের বেশি হবে না–তবে তার লম্বা-চওড়া চেহারার জন্যে বয়সের চাইতে তাকে অনেক বেশি বড় দেখায়। তার মতন দীর্ঘদেহ যুবক বাঙালি জাতির ভিতরে বড় একটা দেখা যায় না–তার মাথার উচ্চতা ছয় ফুট চার ইঞ্চি। ভিড়ের ভিতরেও সে নিজেকে লুকোতে পারত না, সকলের মাথার উপরে জেগে থাকত তার মাথাই। রীতিমতো ডন-বৈঠক, কুস্তি, জিমনাস্টিক করে নিজের দেহখানিকেও সে তৈরি করে তুলেছিল। বাঙালিদের ভিতরে সে একজন নিপুণ মুষ্টিযোদ্ধা বলে বিখ্যাত। আপাতত এক জাপানি মল্লের কাছ থেকে যুযুৎসুর কৌশল শিক্ষা করছে।
