নৌকো গুহামুখে গিয়ে উপস্থিত হল। তার ভিতরটা ঘন ছায়ায় ভরা, সর্বদাই সেখানে সন্ধ্যার আলো-আঁধার বিরাজ করে। সকলে নৌকার ওপরে হেঁট হয়ে পড়ে গুহার ভিতর দিকটা দেখবার চেষ্টা করলে, কিন্তু ভিতরে শুধু জল থইথই করছে! ভালো করে কিছু দেখাও গেল না, সন্দেহজনক কিছু আছে বলেও মনে হল না।
কুমার বললে, কিন্তু বিমল, এখানে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ পাচ্ছ না কি? কাছে কুমির থাকলে এমনি গন্ধ পাওয়া যায়।
বিমল বললে, হুঁ। তারপর দাঁড়টা যথাসম্ভব বাড়িয়ে দিয়ে গুহার ভিতরকার দেওয়ালে ঠুকে পরীক্ষা করতে লাগল।
আচম্বিতে তাদের নৌকোখানা তীব্রবেগে পিছু হটে গুহার মুখ থেকে খানিক তফাতে গিয়ে পড়ল! সকলে মহাবিস্ময়ে হুমড়ি খেয়ে জলের ভিতর তাকিয়ে দেখলে, কিন্তু কিছুই দেখা গেল না!
কুমার বললে, জলের ভিতর থেকে বিষম ধাক্কা মেরে কে যেন নৌকোখানাকে দূরে ঠেলে দিলে!
বিমল বললে, কিন্তু কে সে? কুমির যে এমন করে নৌকো ঠেলে দিতে পারে, এ কথা তো কখনও শুনিনি!
কিন্তু সে যেই-ই হোক, আমরা যে ওখানে থাকি, এটা সে চায় না!
বিনয়বাবু বললেন, আমরা কি আবার নৌকো নিয়ে গুহার কাছে যাব?
বিমল বললে, না আমরা এইবারে ওই পাহাড়ে গিয়ে উঠব।
.
তিন
পাহাড়ের নীচের দিকটা নদীর জল লেগে লেগে এমন পিছল হয়ে আছে যে, তার ওপরে উঠতে তাদের বিশেষ বেগ পেতে হল।
পাহাড়ের ওপরে মানুষের আবির্ভাব দেখে শকুনটা বিরক্ত হয়ে উড়ে গেল।
বিনয়বাবু বললেন, এই ন্যাড়া পাহাড়ের টুকরোর ওপরে একটা মাছিও লুকিয়ে থাকতে পারে না। এখানে এসে লাভ কি?
বিমল বললে, আমরা ওই গুহার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে ভালো করে দেখবার সুযোগ পাব।
গুহার পাশেই রয়েছে মস্ত একখানা পাথর–জল থেকে হাত-চারেক উঁচু। কুমার তার ওপরে গিয়ে জলের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। বিমল ও বিনয়বাবুও তার পাশে গিয়ে বসলেন।
বিমল স্থির চক্ষে গুহার দিকে তাকিয়ে বললে, ওই গুহার ভিতরে অনায়াসেই কোনও জলচর জীব লুকিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বিনয়বাবু আপনি যে চিৎকার শুনেছিলেন, কোনও জলচর জন্তুর পক্ষে কি সেরকম চিৎকার করা সম্ভব?
বিনয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, না, না, সে হচ্ছে মানুষের কণ্ঠে অমানুষিক চিৎকার!
বেশ বুঝতে পারছি, এই ভাটার সময়েও গুহার ভিতরে ডুবজল রয়েছে। কোনও মানুষ নিশ্চয়ই ওখানে বাস করতে পারে না।
কোনও মানুষ ওখানে বাস করুক বা না করুক, কিন্তু চিৎকারটা এইখানেই উঠেছিল বলে আমার সন্দেহ হয়।
সেদিনের সেই চিৎকার, তারপর ঘাটের ওপরে সেই নরহত্যা, তারপর আজকের এই নৌকোয় ধাক্কা মারার ব্যাপার। এই তিনটের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কিনা, আমাদের এখন সেই বিচারই করতে
হঠাৎ কুমার চমকে পাথরের একটা কোণ দুই হাতে চেপে ধরে আর্তস্বরে বলে উঠল– কে আমার পা ধরে টানছে বিমল
বিমল জলের দিকে একবার উঁকি মেরেই চোখের পলক না ফেলতে পকেট থেকে রিভলভার বার করে উপর-উপরি দুবার গুলি ছুঁড়লে।
তার পরেই এক বুক কাঁপানো গগদভেদী ভয়ঙ্কর চিৎকার!
বিনয়বাবু জলের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, কিন্তু তিনি দেখলেন কেবল মস্ত একটা ছায়া জলের ভিতরে সাঁ করে মিলিয়ে গেল এবং জলের ওপরে ভেসে উঠল খানিকটা রক্ত।
কুমার তাড়াতাড়ি পা গুটিয়ে নিয়ে হতভম্বের মতো বিমলের দিকে তাকিয়ে দেখলে, তার মুখের ভাব উদ্ভ্রান্তের মতো!
তারপর সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললে, বিমল, বিমল, জলের ভিতর থেকে কে আমার পা ধরে টানছিল?
তুমি কি কিছুই দ্যাখোনি?
না দেখবার সময় পেলুম কই? খালি এইটুকু বুঝতে পেরেছি, আমার পা ধরেছিল মানুষের দুখানা হাত!
বিমল অভিভূত কণ্ঠে বললে, আমিও যা দেখেছি হয়তো সেটা মানুষেরই মুখ! কিন্তু মানুষের মুখের চেয়ে অন্তত আড়াই গুণ বড়! তার চোখ, নাক, ঠোঁট, গলা, হাত আছে, অথচ তার কিছুই সত্যিকার মানুষের মতো নয়! সে এক ভয়ানক অসম্ভব দুঃস্বপ্ন, আমার গায়ে এখনও কাঁটা দিচ্ছে।
.
চার
নৌকো আবার পাহাড় ছেড়ে তীরের দিকে ফিরল।
বিনয়বাবু বললেন, পৃথিবীতে চিরদিনই এক বিচিত্র জীবের কথা শোনা যায়, সাহেবরা যাকে বলে mermaid, আর আমরা বলি মৎস্যনারী। ভারতের নানা স্থানে সেকেলে মন্দিরের গায়ে এইরকম জলবাসী আর এক জীবের অর্থাৎ নাগকন্যাদের মূর্তি দেখা যায়। মৎস্যনারীদের দেহের ওপর দিকটা হয় মানুষের মতো আর নীচের দিকটা মাছের মতো। নাগকন্যাদেরও ওপর। দিক মানুষের মতো দেখতে হলেও তাদের নীচের দিকটা হয় সাপের মতো।
কুমার বললে, কিন্তু তারা তো কল্পনা-জগতের জীব!
আগে শোনো। অনেক নাবিক অজানা সমুদ্র থেকে ফিরে এসে অনেকবারই মৎস্যনারীর কথা বলেছে। পণ্ডিতরা সেসব কথা ঠাট্টা করেই উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেদিন স্টেটসম্যান কাগজে দেখলুম, এইবারে অবিশ্বাসী পণ্ডিতদের মুখ বন্ধ হয়েছে।
কীরকম?
সিয়েরা লিওনের ডা. গ্রাহাম মৎস্যনারীর একটি মমি অর্থাৎ রক্ষিত দেহ নিয়ে ইংলন্ডে এসেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে এক দোকানদার ওই দেহটি কিনেছে। বড় বড় বৈজ্ঞানিক আর জীবতত্ত্ববিদ পণ্ডিত পরীক্ষা করে বলেছেন, ওটি যে একদা জীবন্ত কোনও জীবের মৃতদেহ, সে-বিষয়ে সন্দেহ করবার উপায় নেই। এটিও অর্ধ-মৎস্য আর অর্ধ-মানবীর দেহ। এর পরেও মৎস্যনারীকে আর কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে কি?
