কিন্তু সে ভূতটি আমার মতো শান্তিপ্রিয় নয়। সে রীতিমতো উপদ্রব শুরু করেছে।
রোজ রাত্রে সে ব্রহ্মপুত্রের জলে নেমে সাঁতার কাটে। তাকে চোখে কেউ দেখেনি বটে, কিন্তু সে নাকি রোজ রাত্রেই ভয়ানক হেঁড়ে গলায় কান্নাকাটি করে আর একটা গুহার কাছে জলের ভিতর থেকে তার বিষম কঁপাই-ঝোড়ার শব্দও শোনা যায়।
সে অনায়াসেই খুব চেঁচিয়ে হাসতে পারত। কিন্তু সে হাসে না, কাঁদে খালি কাঁদে!
লোকের কথায় প্রথমটায় বিশ্বাস করিনি। কিন্তু দিন পাঁচ আগে আমিও স্বকর্ণে তার কান্না শুনেছি।
ব্রহ্মপুত্রের তীরেই একখানা বাংলোয় আমি আছি। সেদিন রাত্রে হঠাৎ বৃষ্টি আসায় আমার ঘুম গেল ভেঙে। তাড়াতাড়ি উঠে মাথার দিককার জানলাটা বন্ধ করে দিতে গেলুম।
হু-হু ঝোড়ো-হাওয়ার সঙ্গে এক আশ্চর্য ও অমানুষিক কণ্ঠের উচ্চ ও তীব্র চিৎকার ঘরের ভিতরে ভেসে এল!
তেমন কান্নাভরা বিকট চিৎকার আমি আর কখনও শুনিনি। সে চিৎকার মানুষেরও বটে, মানুষের নয়ও বটে! অর্থাৎ মানুষ ইচ্ছা করলেও তেমন ভাবে চিৎকার করে কাঁদতে পারে না।
তিনবার সেই চিৎকার শুনলুম। তারপর ঝড় ও বৃষ্টির রোখ এমন বেড়ে উঠল যে, জানলা বন্ধ করে দিতে হল।
নদীর জলের ভিতরেই ডাঙা থেকে প্রায় দুশো গজ তফাতে আছে এক শিশু পাহাড়। লক্ষ লক্ষ বৎসর পরে তার চুড়া হয়তো একদিন মেঘ রাজ্যে গিয়ে পৌঁছবে, কিন্তু এখন তার মাথা জল ছাড়িয়ে ত্রিশ ফুটের বেশি ওপরে উঠতে পারেনি। এই ছোট্ট পাহাড়ের নীচের দিকে একটা গুহা আছে। জোয়ারের সময়ে সেই গুহাটা জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে যায় এবং ভাটার সময়েও তার আধাআধি জলে ভরতি হয়ে থাকে।
আমার মনে হল, সেই ভয়াবহ আর্তনাদ আসছে ওই পাহাড়ের কাছ থেকেই।
পরশুদিন রাত্রে আবার এক কাণ্ড হয়ে গেছে।
একটা কুলি সন্ধ্যার পর জল আনতে গিয়েছিল নদীর ঘাটে।
কিন্তু হঠাৎ সে মহা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল। তার দুজন সঙ্গী ব্যাপার কি দেখবার জন্যে ঘাটের দিকে ছুটে গেল। অন্ধকারে তারা কিছুই দেখতে পেলে না বটে, কিন্তু সভয়ে শুনলে যে ঘাটের খুব কাছ থেকেই অমানুষিক কণ্ঠে কে ঘন ঘন গর্জন করছে। তারা আর না এগিয়ে তাড়াতাড়ি পালিয়ে এল!
কাল সকালে গোলমাল শুনে আমি নদীর ঘাটে গিয়ে দেখি, সেই হতভাগ্য কুলির মৃতদেহ জলের ভিতরে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ভালো করে লক্ষ করে বুঝলুম, কেউ তাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। গলার ওপরে তখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মোটা মোটা আঙুলের দাগ! সেগুলো যে মানুষের আঙুলের দাগ, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই!
কে তাকে হত্যা করলে? কেন হত্যা করলে? রাত্রে নদীর জলে কে কাঁদে বা গর্জন করে? পুলিশের পাহারা বসেছে, কিন্তু এসব প্রশ্নের কোনওই জবাব নেই।
এখানকার লোকেরা ভয়ে, বিস্ময়ে ও দুর্ভাবনায় কাতর হয়ে পড়েছে। সূর্য অস্ত গেলে পর কেউ আর নদীর ধার মাড়ায় না। সত্যি কথা বলতে কি, আমিও হতভম্ব হয়ে গেছি।
এরকম অসাধারণ ঘটনা নিয়ে তোমরা মাথা ঘামাতে খুব ভালোবাসো, তাই তোমাদের খবরটা জানিয়ে দিলুম। যদি নতুন উত্তেজনার প্রতি তোমাদের লোভ থাকে, তাহলে আমার বাংলোয় তোমাদের স্থানাভাব হবে না।
অতএব আশা করছি, অবিলম্বেই তোমরা সশরীরে এসেই আমার পত্রের উত্তর দেবে। ইতি– তোমাদের বিনয়বাবু
.
কুমার বললে, বিমল, তোমার মত কী?
বিমল সহাস্যে বললে, তাও আবার জিজ্ঞাসা করছ? এক্ষেত্রে তোমাতে আমাতে মতের অমিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
কুমার বললে, তাহলে তল্পিতল্পা বাঁধবার চেষ্টা করি?
নিশ্চয়ই।
.
দুই
জায়গাটি চমৎকার। যেখানে পাহাড়, নদী আর অরণ্যের মিলন হয় সেখানে প্রকৃতির রূপে কেউ খুঁত ধরতে পারে না।
আকাশের নীলিমা আছে পৃথিবীর সর্বত্রই, কিন্তু আসলে তার সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়, নদী আর অরণ্যের ওপরে চাদোয়া হবার জন্যেই।
বিনয়বাবু বললেন, দ্যাখো বিমল ওই সেই শিশু পাহাড়!
বিমল ও কুমার দেখলে, ব্রহ্মপুত্রের স্বচ্ছ জলে ছায়া ফেলে ছোট্ট একটি পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে।
বিমল বললে, ওরই তলায় গুহা আছে?
–হ্যাঁ। এখন ভাটা পড়েছে, তাই গুহার উপরদিকটা দেখা যাচ্ছে।
কুমার বললে, বিনয়বাবু, আপনি কোনওদিন ওই গুহার কাছে যাননি?
না। এতদিন যাবার দরকার হয়নি। আমার বিশ্বাস ওই গুহার ভিতরটা একবার পরীক্ষা করা উচিত।
বিমল বললে, বেশ তো, এখনি সে চেষ্টা করা যাক না! ঘাটে অনেকগুলো নৌকো বাঁধা রয়েছে, একখানা ভাড়া করে গুহার কাছে গেলেই চলবে।
সকলে ঘাটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু কোনও মাঝিই তাদের গুহার কাছে নিয়ে যেতে রাজি হল না।
বিমল বললে, আচ্ছা, তোমরা নৌকো ছেড়ে নেমে দাঁড়াও, আমরাই দাঁড় বেয়ে গুহার কাছে যাব। তোমরা পুরো ভাড়াই পাবে।
এ বন্দোবস্তো তাদের আপত্তি হল না। বিনয়বাবু ধরলেন হাল এবং দাঁড় নিয়ে বসল বিমল ও কুমার।
নৌকো ভেসে চলল ছোট পাহাড়ের দিকে।
প্রথমে তারা পাহাড়টাকে একবার প্রদক্ষিণ করলে, তার চারিদিকেই রোদে উজ্জ্বল নদীর জল নেচে নেচে খেলা করছে। পাহাড়টা একেবারে ন্যাড়া, তার রুক্ষ কালো গায়ে সবুজের আঁচটুকু পর্যন্ত নেই। তারি টঙের ওপর স্থির হয়ে বসে আছে একটা শকুন।
একদিকে রয়েছে সেই গুহাটা। এখন জোয়ার নয় বলে গুহার ওপর দিকটা খিলানের মতো জলের ওপরে জেগে রয়েছে। গুহার মুখ চওড়ায় দশ-বারো ফুটের বেশি নয়।
