সবাই যা আন্দাজ করলে তা হচ্ছে এই অদৃশ্য মানুষ বোধ হয় সশস্ত্র হবার জন্যে কোনও বাড়ির জানলা থেকে এই লোহার গরাদটা খুলে নিয়েছিল। সে যখন মাঠের উপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাকে দেখা না গেলেও তার হাতের লোহার গরাদটা অদৃশ্য হয়নি। আর সেই উড়ন্ত গরাদ দেখে চন্দ্রবাবু বোধ হয় আশ্চর্য হয়ে তাকে নিজের হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করবার চেষ্টা করেছিলেন। অদৃশ্য মানুষ তাঁর হাত ছাড়াবার চেষ্টা করেও যখন মুক্তি পায়নি, তখন তাঁকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।
চন্দ্রবাবুকে হত্যা করে অদৃশ্য মানুষ যে-কোন দিকে গেল তাও ঠিক বোঝা গেল না। তবে ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে যে মস্ত একটা চক্রান্তের সৃষ্টি হয়েছে, এটা বোধহয় সে বুঝে নিয়েছিল! কারণ, চারিদিকে এমন সতর্ক পাহারা সত্ত্বেও কেউ তাকে আর আবিষ্কার করতে পারলে না।
তবে সন্ধ্যার পরে একদল কুলি যখন মাঠ পার হয়ে শ্রীপুরের দিকে আসছিল, তখন তারা নাকি শুনতে পেয়েছিল যে, মাঠের ভিতরে কোনও অদৃশ্য কণ্ঠ থেকে কখনও কান্নার, কখনও হাসির ও কখনও গর্জনের রোমাঞ্চকর শব্দ হচ্ছে! ভূত মনে করে কুলিরা প্রাণপণে ছুটে পালিয়ে এসেছিল!
.
চতুর্দশ । পূর্ণবাবুর বাড়ি আক্রমণ
সকালবেলায় পূর্ণবাবু একখানা অদ্ভুত পত্র পেলেন। চিঠিখানা বেয়ারিং। পত্ৰলেখক লিখছেঃ
পূর্ণ, তুমি খুবই চালাক আর সাধু লোক নয়? আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলুম। আর তুমি বন্ধু হয়েও আমাকে ধরিয়ে দিলে। আমার সঙ্গে এইরূপ বিশ্বাসঘাতকতা করে তোমার কি স্বার্থসিদ্ধি হবে, তা তুমিই জানো। তোমারই চক্রান্তে একটা দিন আমাকে হাটে-মাঠে-বাটে ঘেয়ো কুকুরের মতো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। যাতে আমি খেতে ও ঘুমোতে না পাই সেজন্যে তুমি কোনও সুব্যবস্থা করতেই বাকি রাখোনি। তবু আমি পেট ভরে খেয়েছি ও সারারাত প্রাণ ভরে ঘুমিয়েছি। এ খবর শুনে তুমি বোধহয় খুব খুশি হবে?
এইবারে আসল নাটক শুরু হবে–হাসির নাটক নয়, বিয়োগান্ত নাটক, অর্থাৎ তার মধ্যে পতন ও মৃত্যুর কোনওই অভাব হবে না।
এ চিঠি যখন তুমি হাতে পাবে, তখন থেকেই বিভীষিকা শুরু হবে। আজ থেকে শ্রীপুরের রাজা আর কেউ নয়–এখানে এখন কেবল আমারই একচ্ছত্র অধিকার! শ্রীপুরের সর্বশক্তিমান মহারাজা হচ্ছি আমি–অদৃশ্য মানব! কাকে রাখব আর কাকে মারব সে-কথা কেবল আমিই জানি।
তবে, প্রথম দিনে আমি কী করব, সে কথাটা তোমার কানে কানে চুপিচুপি আমি জানিয়ে রাখছি। আমার সঙ্গে শত্রুতা করলে কী হবে, তার একটা দৃষ্টান্ত দেখাবার জন্যে প্রথম দিনেই একজনের জন্যে আমি প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করব। আসামির নাম হচ্ছে, বাবু পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মৃত্যুর দূত এখনি তার দিকে অগ্রসর হয়েছে। সে ঘরের দরজায় চাবি বন্ধ করে বসে থাকতে পারে, বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে, নিজের চারিদিকে অগুন্তি সেপাই রাখতে পারে–সে যা খুশি করতে পারে, কিন্তু তবু মৃত্যু, অদৃশ্য মৃত্যু তাকে। গ্রহণ করবার জন্যে এগিয়ে আসছে। তাকে আমি খুব সাবধান হতে বলি, কারণ লোকে তাহলেই বুঝতে পারবে যে, সাবধান হলেও আমার হাত থেকে রক্ষা নেই। যে তাকে সাহায্য করবে তাকেই মরতে হবে। তুমি শুনে রাখো বন্ধু, আজকে পূর্ণের মৃত্যু-দিবস!
পূর্ণবাবু চিঠিখানা হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে বললেন, বিধু ঠাট্টা করে এ চিঠিখানা লেখেনি। সে তার মনের কথাই খুলে লিখেছে। তিনি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর সামনে যে গরম চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, সেদিকেও তার কোনও খেয়াল রইল না। আগে চাকরকে ডেকে তিনি বাড়ির ভিতরে ঢোকবার সব পথ বন্ধ করে দিতে বললেন। তারপর দেরাজের ভিতর থেকে একটা রিভলভার বার করে নিজের পকেটে পুরলেন। তারপর ঘরের ভিতরে পায়চারি করতে করতে নিজের মনেই বললেন, বিধু! তাহলে কাল আহার আর নিদ্রা থেকে তুমি বঞ্চিত হও নি? বেশ, বেশ! তাই মনের আনন্দে তুমি আমার প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করেছ? এও মন্দ কথা নয়। কিন্তু বিধু, তুমি যতই অদৃশ্য হও, টেক্কা মারব কিন্তু আমিই! বলতে বলতে তিনি টেলিফোনের কাছে গিয়ে হাজির হলেন এবং থানার দারোগাকে সকল কথা জানালেন। দারোগা বললেন, আমি এখনি আপনার বাড়িতে যাচ্ছি। টেলিফোনের কাছ থেকে তিনি একটা জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ রাজপথের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মনেই আবার বললেন, কে জানে বিধু এতক্ষণে আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কি না! হয়তো সে এখন পথে দাঁড়িয়ে আমার পানেই তাকিয়ে আছে!–একটা কি জিনিস ঝপ করে জানলার সার্সির উপরে এসে পড়ল।–পূর্ণবাবু আঁতকে উঠে তাড়াতাড়ি পিছু হটে এলেন এবং তারপরে উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললেন, চড়ুই পাখি! আমার মনে নিশ্চয় ভয় ঢুকেছে। নইলে সামান্য একটা চড়ুই পাখি আমাকে এমন চমকে দিতে পারে?
সদর-দরজায় কড়া-নাড়ার শব্দ হল। তিনি নিজে নেমে গেলেন। দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন–কে?
দরজার ওপাশ থেকে দারোগাবাবু সাড়া দিলেন।
পূর্ণবাবু খিল খুলে দরজাটা একটুখানি ফঁক করে আগে উঁকি মেরে দেখে নিলেন, সত্যই দারোগাবাবু কি না! তারপর নিঃসন্দেহ হয়ে দরজার এক পাটি খুব কম করে খুলে দারোগাবাবুকে ভিতরে এনে আবার খিল তুলে দিলেন।
