ক্যামডেনের অ্যান্ডি ক্লিংয়ের মুখেও ওই একই কথা? আমি নিরপরাধ। মি. ব্রাউনের ওপরে আমি হানা দিইনি।
অথচ আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের দুজনকেই নিশ্চিতরূপে সনাক্ত করতে পেরেছেন।
এদিকে রাত আটটার চোরের দল নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে পরিপূর্ণ উৎসাহে।
অবশেষে ক্যামডেনের মিসেস ক্যাথারাইন অ্যান্টনের কাছ থেকে টেলিফোনে থানায় খবর এল, তার প্রতিবেশীর এক শিশুপুত্র একটি বাক্স কুড়িয়ে পেয়েছে, তার মধ্যে আছে বন্দুক, জড়োয়া গয়না, ঘড়ি ও আরও হরেক রকম দামি জিনিস।
কনলি তখনই যথাস্থানে গিয়ে হাজির হতে দেরি করলেন না। শিশুর নাম ফ্রেডি টম, বয়স সাত বৎসর। সে একটা নয় পেয়েছে তিন-তিনটে বাক্স।
একটা বাক্স খুলে দেখা গেল, তার ভিতরে রয়েছে অনেক ঘড়ি, ফাউন্টেন পেন, রূপোের বাসন, আংটি, হীরকখচিত সোনার গহনা, একটা রিভলভার ও কতকগুলো কার্তুজ–
কনলির বুকের ভিতর উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল রক্তস্রোত! বিপুল আগ্রহে ও অন্য দুটোও তিনি খুলে ফেললেন তাড়াতাড়ি। সে দুটো বাক্সও ওই দামি জিনিসে ঠাসা।
এ যে রাজার ঐশ্বর্য।
দু-একখানা গয়না পরীক্ষা করেই বোঝা গেল, সেগুলো হয়েছিল রাত আটটার চোরের দলের করতলগত।
এ যে স্বপ্নতীত সৌভাগ্য!
শিশুর দিকে ফিরে কনলি শুধোলেন, খোকাবাবু, এগুলো তুমি কোথায় পেয়েছ?
নদীর ধারে। খুব ভোরবেলায় খেলা করতে গিয়েছিলুম। সেইখানে ছুটোছুটি খেলা করতে করতে আমি আর একটু হলেই বাক্সগুলোর উপরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলুম আর কি।
–তুমি বাক্সগুলো খুলে দেখেছিলে?
–তা আবার দেখিনি? আমি ভেবেছিলুম এগুলো হচ্ছে বোম্বেটেদের গুপ্তধন।
–তার পরই তুমি সোজা বাড়িতে ফিরে এলে বুঝি?
–উঁহুঁ। আমার যেসব বন্ধু বাক্সগুলোকে বাড়িতে তুলে আনবার জন্যে সাহায্য করেছিল, বাক্সের কিছু কিছু জিনিস নিয়ে আগে তাদের কিছু উপহার দিয়েছিলুম।
কী কী জিনিস বাছা?
–অত কি ছাই মনে আছে। যে যা চাইলে, তাই।
ফ্রেডি টমের মায়ের দিকে ফিরে কনলি বললেন, আপনি পেয়েছেন এক আশ্চর্য সৎপুত্র। বেশিরভাগ ছেলেই এরকম কিছু পেলে আর কারুর কাছে সেকথা প্রকাশ করত না।
থানায় যখন বাক্স তিনটে নিয়ে আসা হল সবাই তখন চরম বিস্ময়ে একেবারে হতবাক।
মর্গ্যান বললেন, এত ঐশ্বর্য নদীর ধারে পরিত্যক্ত হল কেন? যে এমন কাণ্ড করেছে তাকে আমরা খুঁজে বার করব যে-কোনও উপায়ে।
কনলি বললেন, আমিও ও-কথা ভেবে দেখেছি। আমার কি সন্দেহ হয় জানো? ক্লিং ধরা পড়াতে তার জুড়িদার ভয় পেয়ে এই কার্য করেছে।
জিনিসগুলো ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা যাক নতুন কোনও সূত্র পাওয়া যায় কি না।
রাত আটটার চোরের দল যেখান থেকে যেসব জিনিস চুরি করেছিল, পুলিশের কাছেই ছিল তার সুদীর্ঘ তালিকা।
পরীক্ষা কার্য যখন চলছে, সেই সময় মর্গ্যান বাক্স হাতড়ে বার করলেন একটা নকল চামড়ার ব্যাগ। একখানা ট্রলি হস্তান্তরপত্র ছাড়া তার ভিতরে আর কিছুই ছিল না।
মর্গ্যান বললেন, এই ব্যাগের ওপরে সম্ভবত কারুর নামের দুটো আদ্য অক্ষর লেখা আছে–ডি.টি। এরকম ব্যাগ তো ছোরারাই ব্যবহার করে। এর মানে কি?
–হ্যাঁ, এ ছোকরাদের উপযোগী বটে।
–এমন এক ছোকরা, যার নামের দুটো আদ্য অক্ষর হচ্ছে ডি. টি। যদিও তা হয়তো সম্ভবপর নয়, তবু একটা কথা আমার মনে হচ্ছে।
কী কথা?
–একটু আগেই গ্লসেস্টারের থানা থেকে ফোন এসেছিল, ডেভিড টিঙ্গো নামে এক ছোকরার খবরাখবর নেবার জন্যে। সে-ও না কি তার একটা চামড়ার ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছে। ডি. টি.-তো ডেভিড টিঙ্গোরও নামের আদ্য অক্ষর হতে পারে।
কনলি তৎক্ষণাৎ জাগ্রত হয়ে বললেন, চলো সেখানেই যাই।
.
তার আধ ঘণ্টা পরেই গ্লসেস্টারের থানায় গিয়ে মর্গ্যান ও কলির সঙ্গে ডেভিড টিঙ্গোর যেসব কথাবার্তা হল, আমরা তা বর্ণনা করেছি এই আখ্যায়িকার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই।
তবু এখানে একটু খেই ধরিয়ে দেওয়া দরকার।
টিঙ্গো স্বীকার করলে ব্যাগটা তারই। তিনদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল।
গোয়েন্দারা তাকে সেই ব্যাগের ভিতরে ট্রলি হস্তান্তরপত্রখানাও দেখালেন। প্রথমটা সেখানাও সে নিজের বলে মেনে নিলে। কিন্তু পরমুহূর্তেই রক্তহীন হয়ে গেল তার মুখ। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না–ওখানা আমার নয়। আমি কি বলতে কি বলে ফেলেছি। আপনারা আমার মাথা গুলিয়ে দিয়েছেন।
হস্তান্তরপত্রের ওপরে ছিল গতকল্যকার তারিখ। অথচ টিঙ্গো বলে তার ব্যাগ খোয়া গেছে তিনদিন আগে। তার মানে, গতকল্যও এই ব্যাগটি ছিল তার কাছেই।
কেন সে এই মিথ্যে কথাটা বললে? পুলিশের সন্দেহ হল তখন।
ডেভিড টিঙ্গোকে নিয়ে গোয়েন্দারা গেলেন তার বাড়িতে। তার বাবা তখন কর্মস্থলে। গিয়েছেন। বাড়িতে ছিলেন কেবল তার মা।
তাদের বাসা খানাতল্লাশ করে সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া গেল না, কেবল একটা রিভলভার ছাড়া। সেটা বেলজিয়ামে প্রস্তুত এবং লুকানো ছিল ডেভিড টিঙ্গোর শোবার ঘরের বিছানার তলায়।
তাকে জিজ্ঞাসা করা হল রিভলভারটা কোথা থেকে সে পেয়েছে? সে বেশ সপ্রতিভভাবেই বললে, রাস্তায় একখানা আরোহীহীন মোটরগাড়ি দাঁড় করানো ছিল, ওটা পড়েছিল তারই পিছনের আসনে। ছেলেবেলা থেকেই আমার মনে একটা রিভলবার পাবার প্রবল ইচ্ছা ছিল। তাই লোভ সামলাতে পারলুম না। রিভলভারটা চুপিচুপি তুলে নিয়ে সরে পড়লুম। তার আগে জীবনে আর কোনওদিন আমি চুরি করিনি।
