কিন্তু ফিলাডেলফিয়ায় এ পর্যন্ত রাত আটটার চোরদের কোনও উপদ্রব হয়নি। তার বদলে ঘটতে লাগল অন্যরকম ঘটনা।
আদালতে যেদিন অ্যান্ডি ক্লিংয়ের মামলা, ঠিক সেই তারিখেই ফিলাডেলফিয়ার ডাক্তার গ্রুয়েস যখন নিজের ডিসপেনসারিতে বসে আছেন, তখন দুজন লোক এসে তার কাছে সর্দি কাশির ওষুধ চাইল।
ডাক্তার গ্রুয়েস তাদের সঙ্গে কথা কইছেন, হঠাৎ একটা লোক রিভলভার বার করে বললে, তোমার কাছে টাকাকড়ি কি আছে দাও।
ডাক্তার বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের ব্যাগটা (তার ভিতরে দুইশো টাকা ছিল) বার করে দিলেন। তবু অকারণেই তারা তাকে রিভলভারের দ্বারা নির্দয়ভাবে প্রহার না করে অদৃশ্য হল না।
পুলিশ ভাবলে, স্থানীয় অপরাধীর কীর্তি।
আরও দুই হপ্তা পরে ঠিক ওই ভাবেই নিজের ডিসপেনসারিতে বসেই আক্রান্ত ও প্রহৃত হলেন ডাক্তার আর্ভিং রোসেনবার্গ। চোরেরা তাঁর কাছ থেকে হস্তগত করলে এক হাজার সাতশো পঞ্চাশ টাকা।
গোয়েন্দারা বললেন, একই দলের কীর্তি।
দুই হপ্তা পরে স্থানান্তরে আবার সেই কাণ্ড। এবারে স্টার্লি বক্ নামে আর এক ডাক্তারের পালা।
প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আবির্ভূত হয়েছিল দুজন করে তোক এবং প্রত্যেক ডাক্তারের কাছ থেকেই পাওয়া গিয়েছিল তাদের চেহারার বর্ণনা। কিন্তু পুলিশ তবু কোনও অপরাধীরই নাগাল পেল না।
এদিকে অ্যান্ডি ক্লিং যখন বাস করছে ক্যামডেনের জেলখানায়, তখনও বন্ধ হল না রাত আটটার চুরিগুলি।
সত্যি কথা বলতে কি আদালতে যেদিন উঠল অ্যান্ডি ক্লিংয়ের মামলা, ঠিক সেদিনই রাত আটটার সময়ে চোরের দল হানা দিলে কলিংসউডের একখানা বাড়িতে এবং যাবার সময়ে পিছনে রেখে গেল নিজেদের বিখ্যাত ট্রেডমার্ক ও সেই ভাঙা জানালা, সেই খোলা খিড়কির দরজা।
কনলি বললেন, কিছুই বুঝতে পারছি না, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
মর্গ্যান বললেন, ক্লিংয়ের রাহাজানির সঙ্গে এই রাত আটটার চুরির কোনও সম্পর্ক নেই।
কনলি বললেন, ক্লিং ধরা পড়ার পরও তার জুড়িদার রাত আটটার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, এও হতে পারে তো?
মর্গ্যান বললেন, তাতে আর আমাদের কি সুরাহা হবে? ক্লিং তো তার জুড়িদারের নাম আমাদের কাছে ফাঁস করে দেবে না?
এদিকে চুরির পর চুরি, ওদিকে ডাক্তারের পর ডাক্তারের ওপরে আক্রমণ, দুই কাজই চলতে লাগল একসঙ্গে। এই দুই ব্যাপারের মধ্যে যে কোনও যোগাযোগ আছে, এমন সন্দেহ পুলিশের মনে ঠাঁই পেল না। কাগজওয়ালারা খাপ্পা হয়ে উঠল। কিন্তু পুলিশ নাচার।
ডাক্তার হোরোসিয়ো ক্যাম্পবেল ডিসপেনসারিতে উপবিষ্ট। বাহির থেকে দরজায় করাঘাত হল। তিনি উঠে দরজা খুলে দিয়ে দেখলেন, তিনজন লোক বাইরের বেঞ্চির ওপর পাশাপাশি বসে আছে।
একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললে, বড়ই ঠান্ডা লেগেছে ডাক্তারবাবু। ওষুধ-টষুধ দিতে পারেন?
ডাক্তার ক্যাম্পবেলের বুকটা ধড়াস করে উঠল। ডাক্তারদের ওপর আক্রমণের কাহিনি তার জানতে বাকি নেই। আততায়ীদের চেহারার বর্ণনাও তিনি খবরের কাগজে পাঠ করেছেন। তিন জনের মধ্যে দুইজনের চেহারা সেই বর্ণনার সঙ্গে অবিকল মিলে যায়।
কোনওরকমে বুকের কাঁপুনি থামিয়ে শান্ত ভাবেই তিনি বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, আমি এখনই সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
ঘরের ভিতরে ফিরে এসেই তিনি ধারণ করলেন টেলিফোন যন্ত্র। তার পরেই থানার লোক পেলে তার বিপদের খবর।
তারপর কাটল এক মিনিট…দুমিনিট..তিন মিনিট। প্রত্যেকটা মিনিট কি সুদীর্ঘ। প্রত্যেক মিনিটেই ডাক্তারের ভয় হয়, এই বুঝি ডাকাতের দল হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে রিভলভার হাতে করে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে! চার মিনিট..পাঁচ মিনিট।
অবশেষে ঘরের বাইরে শোনা গেল কাদের কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। ডাক্তার বাইরে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন পুলিশ কর্মচারী।
পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জানা গেল তিনজন সন্দেহজনক আগন্তুকের মধ্যে দুইজন হচ্ছে সহোদর নাম ওয়াল্টার ও ডানিয়েন গ্লেনন। তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছে তাদের শ্যালকম ওয়াল্টার স্যামসন।
গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এখানে কি করতে এসেছ?
স্যামসনের ঠান্ডা লেগেছে। আমরা ওষুধ নিতে এসেছি।
গোয়েন্দারা বললেন, স্যামসনের ঠান্ডা লাগার কোনও লক্ষণই তো দেখতে পাচ্ছি না।
স্যামসন বললে, ঠান্ডা লেগেছে আমার বুকের ভেতরে। আপনারা তা যদি দেখতে না পান সে জন্যে আমি দায়ী নই।
–বেশ, থানায় চল।
যে তিনজন ডাক্তার আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুজনের পাত্তা পাওয়া গেল। ডাক্তার বক্ কিছুক্ষণ লোক তিনজনের দিকে তাকিয়ে ওয়াল্টার গ্লেননকে সনাক্ত করলেন। এবং ওয়াল্টার স্যামসন সম্বন্ধে বললেন, ওকেও দ্বিতীয় ব্যক্তির মতো দেখতে বটে, কিন্তু আমি হলফ করে কিছু বলতে পারব না।
ডাক্তার রোসেনবার্গও ওয়াল্টার গ্লেননকে সনাক্ত করলেন; এবং ডানিয়েল গ্লেনন সম্বন্ধে বললেন, ওর সঙ্গে দ্বিতীয় ব্যক্তির মিল আছে বলে মনে হচ্ছে!
তিনজন আসামিই প্রবল প্রতিবাদ করে জানালে তারা সম্পূর্ণরূপেই নিরপরাধ এবং দুইজন ডাক্তারকে তারা জীবনে কখনও চোখেও দেখিনি।
তাদের ওপরে বিনা জামিনে হাজতবাসের হুকুম হল।
.
পাঁচ
ফিলাডেলফিয়ার ওয়াল্টার গ্লেনন ক্রমাগত প্রতিবাদ করছে–আমি নিরপরাধ। ডাক্তারদের আমি আক্রমণ করিনি।
