তারপর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের দোসরা জানুয়ারি তারিখে সাতষট্টি বৎসরের বৃদ্ধ জর্জ ব্রাউন রাজপথ দিয়ে যেতে যেতে আক্রান্ত হলেন দুইজন গুন্ডার দ্বারা।
একটা গুন্ডা রিভলভার দেখিয়ে টাকা দাবি করে। ব্রাউন প্রতিবাদ করাতে সে রিভলভারের বাড়ি মেরে তার মাথা ও মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এবং তিনি মাটির ওপরে পড়ে যান প্রায় অচৈতন্যের মতো।
পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে ব্রাউনের কাছ থেকে আততায়ীর যে বর্ণনা সংগ্রহ করলে, তার সঙ্গে হুবহু মিলে গেল গত পরিচ্ছদে জ্যাফার্টির দ্বারা বর্ণিত চোরের চেহারা।
অধিকতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ঘটনাটা ঘটেছিল প্রায় রাত আটটার সময়েই।
মর্গ্যান বললেন, একই লোকের কীর্তি বলে সন্দেহ হচ্ছে।
কনলি মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু আচমকা এই নতুন পদ্ধতিটা আমার ভালো লাগছে না। কোথায় বাড়িতে বাড়িতে চুরি, আর কোথায় রাজপথে রাহাজানি। চোরেরা সাধারণত নিজেদের এক এক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলে মনে করে, সহসা তারা নিজেদের পদ্ধতি বদলায় না। তবু বর্তমান ক্ষেত্রে সময় আর চেহারার যে মিল দেখেছি, তাও উপেক্ষা করা চলে না।
চুরির পর চুরি চলতে লাগল, একটানা চলতে লাগল চুরির পর চুরি। চোরেদের হাত যেন দম-দেওয়া ঘড়ির কাঁটা, নির্দিষ্ট সময়ে করে নির্দিষ্ট কর্তব্যপালন।
হ্যাডন হাইটের একখানা বাড়ি থেকে রাত আটটার চোরেরা নিয়ে গেল সাত লক্ষ টাকার জড়োয়া গহনা।
মর্গ্যান ও কনলি থানায় বসে চোরেদের নব নব কীর্তি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, হঠাৎ এল টেলিফোনের আহ্বান।
স্ত্রীলোকের কণ্ঠস্বর। সে মার্কেট স্ট্রিটের এক রেস্তোরাঁর পরিবেশিকা। উত্তেজিত কণ্ঠে বললে, শিগগির আসুন, শিগগির। এখানে একটা লোক এসেছে।
–কে লোক? কি বলছ তুমি?
–এখানে একটা লোক কোথায় রাহাজানি করে এসেছে বন্ধুদের কাছে সেই গল্প করছে। শীগগির আসুন, নইলে সে চলে যাবে।
তখন দুই গোয়েন্দা মোটর ছুটিয়ে দিলেন সেই রেস্তোরাঁর দিকে।
পরিবেশিকা রেস্তোরাঁর দরজাতেই দাঁড়িয়ে পুলিশের জন্যে অপেক্ষা করছিল। এক ব্যক্তিকে সে দেখিয়ে দিলে অঙ্গুলি নির্দেশে। সে তখন বাইরে বেরিয়ে পথের ওপরে এসে দাঁড়িয়েছে।
তার পথ রোধ করলে গোয়েন্দারা।
সচমকে সে বললে, কি চান আপনারা?
আমরা পুলিশ!
সে ভয়ে-ভয়ে বললে, তাই নাকি?
মর্গ্যান বললেন তুমি কোথায় গিয়ে রাহাজানি করেছ, এতক্ষণ সেই গল্প বলছিলে? আমরাও গল্পটা শুনতে চাই।
–রাহাজানি?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, রাহাজানি। এতক্ষণ তাই নিয়ে যে খুব মুখশাবাশি করছিলে।
–মুখশাবাশি? হা মশাই, ঠিক তাই। বন্ধুবান্ধবের কাছে অনেকেই মুখের কথায় রাজা উজির মারতে চায়, তা কি আপনারা জানেন না? আমি যা বলছিলুম সব বাজে বানানো কথা।
–তোমার নাম?
–অ্যান্ডি ক্লিং।
–আমাদের সঙ্গে থানায় চল।
ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় বৃদ্ধ জর্জ ব্রাউনকে থানায় ডেকে আনা হল।
ক্লিংকে আরও কয়েকজন লোকের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসা করলেন, মি. ব্রাউন, দোসরা জানুয়ারিতে যে লোকটা আপনাকে রিভলভার দিয়ে মেরে আহত করেছিল, সে কি এই দলের মধ্যে আছে?
ব্রাউন মিনিট কয়েক ভালো করে লক্ষ করে দেখিয়ে দিলেন অ্যান্ডি ক্লিংকে।
ক্লিং যেন একেবারেই স্তম্ভিত! তারপর সে আর্তকণ্ঠে বলে উঠল, না, না, এ সত্য নয়। উনি ভুল করেছেন।
ব্রাউন বললেন, অসম্ভব। আমি যদি আরও দশ লক্ষ বৎসর বাঁচি তাহলেও তোমার মুখ জীবনে ভুলতে পারব না।
কনলির জামার হাত চেপে ধরে ক্লিং বললে, আমার কথায় বিশ্বাস করুন। এ ভদ্রলোক কি বলছেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
কনলি বললেন, উনি তোমাকে শনাক্ত করেছেন। তবু তুমি দোষ স্বীকার করছ না কেন? ক্লিং বললে, যে দোষ করিনি তাই আমাকে স্বীকার করতে হবে?
–সেদিন তোমার সঙ্গে আর একজন লোক ছিল। কে সে?
–কেউ নয়। আমিই যখন ঘটনাস্থলে হাজির ছিলুম না, তখন আমার সঙ্গে থাকবে কে?
–এই যে রাত আটটায় চুরি, এর সম্বন্ধে তুমি কি জানো?
–আপনি কি বলতে চান? আমার বিরুদ্ধে আরও সব চুরির মামলা আছে নাকি?
গোয়েন্দারা এমনি সব প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলেন, কিন্তু ক্লিংয়ের কাছ থেকে কোনও স্বীকার-উক্তিই আদায় করতে পারলেন না। তার এক কথা–সে ব্রাউনকে আক্রমণ করেনি, রাত আটটার চুরি সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ জানে না।
গোয়েন্দারা বুঝলেন, ব্রাউনের মামলায় ক্লিংকে দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে বটে, কিন্তু রাত আটটার চুরির মামলায় তার বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণিত হয়নি। তাই জ্যাফার্টিকে ডেকে আনা হল, সর্বপ্রথমে যাঁর সঙ্গে রাত আটটার চোরদের একজনের মুখোমুখি দেখা হয়ে গিয়েছিল।
তিনিও কয়েকজন লোকের ভিতর থেকে ক্লিংকে বেছে নিয়ে বললেন, এই লোকটিকে সেই চোরটার মতন দেখতে বটে, কিন্তু এ ভিন্ন লোকও হতে পারে!
তাহলে আপনি ঠিক শনাক্ত করতে পারছেন না?
–প্রায় তাই-ই বটে। চোরের চেহারার সঙ্গে এর অনেক মিল আছে, এর বেশি আর কিছু আমি বলতে পারব না।
ক্লিংকে রাহাজানির মামলায় বিনা জামিনে ধরে রাখা হল।
মর্গ্যান বললেন, ক্লিং বন্দি, এখন দেখা যাক এর পরেও রাত আটটার চুরি বন্ধ হয়। কিনা! তা যদি হয়, তবে বুঝতে হবে ক্লিং সত্য সত্যই ওই চুরিগুলির সঙ্গে জড়িত আছে।
.
চার
এপারে ক্যামডেন, ওপার ফিলাডেলফিয়া এবং দুই শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যায় ডেলিওয়ার নদী। নদী পার হয়ে অপরাধীরা দুই শহরে গিয়েই উৎপাত করে এবং নদী পার হয়ে গোয়েন্দাদেরও দুই শহরে গিয়েই কাজ করতে হয়।
