–হ্যাঁ তাই দিয়েছি বটে!
–ও কাগজ আমার হতে পারে না। আমি বলছি ও কাগজ আমার নয়।
মর্গ্যান গাত্রোত্থান করে বললেন, টিঙ্গো, তোমাকে এখন আমাদের সঙ্গেই যেতে হবে। দেখছি, আমরা কোনও সাধারণ চুরির মামলা হাতে পাইনি, এর ভিতরে আছে গভীর রহস্য।
মর্গানের কথাই পরে সত্য হয়ে দাঁড়ায়। ডেভিড টিঙ্গো বালক মাত্র, কৈশোর অতিক্রম করে সবে যৌবনে পা দিয়েছে বটে, কিন্তু এখনও তাহার মুখের ওপরে আছে বালকতার সুস্পষ্ট ছাপ। অথচ তারই চারিদিক ঘিরে রচিত হয়েছিল যে জটিল ও অদ্ভুত রহস্যের জাল, তা যেমন অসাধারণ তেমনি অভাবিত ও অতুলনীয়। আপাতত আমরাও টিঙ্গোকে পুলিশের জিম্মায় রেখে গোয়েন্দাদের সঙ্গে রহস্য জালের খেই খোঁজবার চেষ্টা করব।
.
চুরির হিড়িক শুরু হয় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ আগস্ট তারিখে। চোরেরা হানা দেয় কলিংস রোডের মিঃ উটো টপারকারের বাড়িতে। তারা একটা জানলা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেছিল। চুরির আগে ভারী ভারী আসবাবগুলো টেনে এনে এমনভাবে সদর দরজার ওপরে চাপিয়ে রেখেছিল যে, বাড়ির মালিক ভিতরে আসবার জন্যে ঠেলাঠেলি করলেই তারা সরে পড়বার সুযোগ পাবে। চুরির পর তারা বেরিয়ে গিয়েছিল খিড়কির দরজা দিয়ে।
তারপর থেকে শুরু হল চুরির পর চুরি ক্যামডেন, কলিংসউড, গ্লসেস্টার, পেনসকেন ওকলিন, অডুবন ও হ্যাডন হাইটস প্রভৃতি সাউথ ডারসির শহরে-শহরে। সর্বত্র তাদের একই পদ্ধতি। তারা জানলা ভেঙে ভিতরে ঢোকে, সদর দরজার ওপরে আসবাবগুলো চাপিয়ে রাখে এবং খিড়কির দরজা দিয়ে পলায়ন করে।
প্রত্যেকবারেই তাদের আবির্ভাব হয় রাত আটটার কাছাকাছি কোনও একটা সময়ে। সেইজন্যে তাদের নাম রাখা হল রাত আটটার চোরের দল। তারা যে সন্ধানী চোর সে। বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। কারণ প্রত্যেকবারেই চুরি সময়ে বাড়ির লোক থেকেছে অনুপস্থিত।
অনেকদিন পর্যন্ত জনপ্রাণী চোরেদের মুখদর্শন করবার সুযোগ পায়নি। একবার মাত্র। জনৈক ব্যক্তি একটি ঘটনা-ক্ষেত্রে দুইজন লোককে চলে যেতে দেখেছিল, কিন্তু সেও তাদের পিছন দিক ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি।
অবশেষে মিঃ জ্যাফার্টির বাড়িতে তাদের একজনের খানিকটা বর্ণনা পাওয়া গেল।
ডিটেকটিভ মর্গ্যান ও কনলির কাছে জ্যাফার্টি বললেন : বাড়ির অন্যান্য লোকেরা সিনেমা দেখতে গিয়েছিল, আমি সব আলো নিবিয়ে দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। রাত যখন আটটা পনেরো, তখন একতলায় কি একটা শব্দ হয়, আমারও ঘুম ভেঙে যায়। আমি বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে গিয়ে সিঁড়ির আলো জ্বেলে দিয়ে দেখি,নীচে একটা লোক দাঁড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখে তাকিয়ে আছে আমার পানে। সে আমাকে শাসিয়ে বললে, খবরদার টুঁ শব্দটি কোরো না। পরমুহূর্তে সে সাঁৎ করে নিজের পকেটে হাত চালিয়ে দিল–আমি ভাবলুম, এই রে, এইবারে বার করে বুঝি রিভলবার! তারপর সে রিভলভার বার করলে না বটে, কিন্তু পকেট থেকে নিজের হাত বার করে আমার দিকে একটা অঙ্গুলি নির্দেশ করে তালুতে জিভ লাগিয়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করলে। তার পরেই খিলখিল করে হেসে উঠে এক ছুটে বাড়ির বাইরে পালিয়ে গেল। আমি নীচে নেমে গিয়ে দেখি আমার আসবাবগুলো স্থানচ্যুত হয়েছে বটে, কিন্তু চোর সেগুলো সদর দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাবার সময় পায়নি। একটা জানলাও ভাঙা।
গোয়েন্দারা চোরের চেহারার বর্ণনা জানতে চাইলেন।
জ্যাফার্টি বললেন, তার বয়স উনিশ-বিশের মধ্যেই। মাথার উচ্চতা হবে আন্দাজ সাড়ে পাঁচ ফুট, দেহের ওজন দুই মণের বেশি হবে না। তার মাথায় লম্বা লম্বা চুল, সরু নাক। দুই গালের হাড় উঁচু। তার চোখ দুটো ছোট ছোট।
সব থানাতেই জেল খাটা বিখ্যাত বা অবিখ্যাত আসামিদের অসংখ্য ফটো সংগ্রহ করে রাখা হয়।
গোয়েন্দারা বললেন, লোকটার ছবি দেখলে আপনি চিনতে পারবেন?
–পারব।
জ্যাফার্টিকে ছবির বইগুলোর সামনে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেওয়া হল–গাদাগাদা বই। কয়েক ঘণ্টা পরে ছবি দেখা শেষ করে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার বাড়িতে যে অনাহূত অতিথি এসেছিল এর মধ্যে তার ছবি নেই।
.
তিন
গেল পরিচ্ছেদে বর্ণিত ঘটনার পরের দিনের কথা। গ্লসেস্টারের একখানা বাড়িতে গিয়ে হানা দিলে রাত আটটার চোরের দল। তার পরের দিনই কলিংসউডে হল আবার তাদের আবির্ভাব। এ পর্যন্ত তারা যে সব নগদ টাকা জড়োয়া গহনা রেডিয়ো ও ঘড়ি প্রভৃতি সরিয়ে ফেলতে পেরেছে তার মোট দাম হবে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার চেয়েও বেশি।
পুলিশের অবস্থা অত্যন্ত অসহায়। তারা উদভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করছে, প্রাণপণ চেষ্টার ও তদন্তের কিছুই বাকি রাখছে না, তবু নিয়মিতভাবেই চুরি হচ্ছে আজ এখানে, কাল ওখানে– যেখানে-সেখানে। পুলিশ অতঃপর কি করবে যেন তা জানতে পেরেই চোরের দল পুলিশের আগে-আগেই গিয়ে আবির্ভূত হয় যে-কোনও ঘটনাক্ষেত্রে।
পুলিশের খাতায় ছাড়া পাওয়া যত দাগী চোরের নাম আছে, তাদের ভিতর থেকে প্রত্যেক সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আবার ধরে এনে খোঁজখবর নেওয়া হলফল কিন্তু অষ্টরম্ভা। রাতে পথে পথে চৌকিদারের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হল। যেসব দোকানে লোক জিনিসপত্তর বাঁধা রাখে বা বিক্রি করে, সেখানে খানাতল্লাশ করেও একটিমাত্র চোরাই মাল পাওয়া গেল না।
কনলি একদিন মর্গ্যানকে ডেকে বললেন, চোরেরা যদি না চুরির পদ্ধতি বদলায় আর রাত আটটার চুরি করার অভ্যাস না ছাড়ে, তবে একদিন না একদিন আমাদের হাতের মুঠোর ভিতরে তাদের আসতে হবেই।
