সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কী বলতে চাও, চন্দ্রনাথ ওই রকম সর্বনেশে লাঠি তৈরি করেছে।
–সে নিজে হয়তো তৈরি করেনি, হয়তো ইউরোপ থেকেই অস্ত্রটা আমদানি করেছে।
–তাহলে চন্দ্রনাথকে বড় জোর তোমাকে খুন করবার চেষ্টা করেছে বলে আমরা চালান দিতে পারি। কিন্তু আমাদের আসল মামলা তো এখনও রয়ে গেল যে তিমিরে সেই তিমিরেই!
রুপোর নস্যদানি বার করে নস্য নিতে-নিতে জয়ন্ত বললে, মোটেই নয়! চন্দ্রনাথের বাড়িতে আজ যে জুতোজোড়া খুঁজে পেয়েছি, আসল মামলার কিনারা হবে তার সাহায্যেই।
–সে কী হে, ও জুতোর মাপ যে চন্দ্রনাথের পায়ের মাপের চেয়ে বড়!
–হ্যাঁ, কিন্তু কোনও ঘটনাস্থলে যাবার সময়ে চন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই ওই জুতোর ভিতরে কাগজের নুটি বা প্যাড গুঁজে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে কোনওরকমে জুতোজোড়া ব্যবহার করত।
–কেন?
–পুলিশকে ভোলাবার জন্যে।
–কেমন করে এটা জানতে পেরেছ?
রামময়বাবুর বাড়িতে যে চুরি আর হত্যাকাণ্ড হয়, সেদিন বৃষ্টি হয়নি তবু ঘটনাস্থলে পাওয়া গিয়েছিল মণিমোহনের আর এই জুতোজোড়ার কাদামাখা ছাপ। তারপর দেখা গেল, নদর্মার কাছে গিয়ে বালতির জল ঢেলে ধুলোমাখা জুতো ভিজিয়ে কারা ইচ্ছে করেই সেই পদচিহ্নগুলো সৃষ্টি করেছে। মনে আছে সুন্দরবাবু, তখনি আপনাকে আমি বলেছিলুম, অপরাধীরা। এই পদচিহ্নগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চায়!
হুম্।
তারপর যেখানে মণিমোহন খুন হয় সেখানেও এই জুতোজোড়ার ছাপ পাওয়া যায় রক্তমাখা মাটির উপরে, অথচ সেখানে রক্ত থাকবার কথা নয়, কারণ লাশটাকে হত্যাকাণ্ডের অনেক পরে সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। আসলে সে রক্তও আমদানি করা। সেখানেও হত্যাকারী এই জুতোজোড়ার ছাপ দেখিয়ে আমাদের ভোলাতে চেয়েছিল। এখন ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন?
–খানিক খানিক, সবটা নয়।
–গোড়া থেকে ভেবে দেখুন। চন্দ্রনাথের কুকর্মের সহকারী হল মণিমোহন। প্রথমেই কে সরকারের জুয়েলারি ফার্মে চুরি। তারপর নন্দলালকে হত্যা করে তাকে মণিমোহন বলে চালাবার চেষ্টা। সেখানেও নন্দলালের, মণিমোহনের আর অজ্ঞাত ব্যক্তির জুতোজোড়ার ছাপ পাওয়া যায়। তারপর ধরা পড়ে মণিমোহন খুন হয়নি, মারা পড়েছে নন্দলালই। পুলিশের সন্দেহ যায় মণিমোহন আর এক অজ্ঞাত ব্যক্তির দিকে। চন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যই ছিল তাই।
তারপর রামময়বাবুর বাড়িতে খুন, পঞ্চাশ হাজার টাকা আর ত্রিশ হাজার টাকার জড়োয়া গহনা চুরি। সেখানেও পাওয়া গেল মণিমোহনের আর সেই অজ্ঞাত ব্যক্তির জুতোর ছাপ। তারপর ভিতরের ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারছি না বটে, কিন্তু খুব সম্ভব চোরাই টাকা গহনার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মণিমোহনের সঙ্গে চন্দ্রনাথের ঝগড়া হয়, যার ফলে মণিমোহনের অকালমৃত্যু। লাশ অন্যত্র পাঠিয়ে সেখানে আবার পুলিশের অজ্ঞাত সেই ব্যক্তির জুতোর ছাপ রেখে আসা হল। ফলে চন্দ্রনাথ ভেবেছিল সে নিজে থাকবে নিরাপদে, আর পুলিশ খুঁজে মরবে এমন কোনও ব্যক্তিকে পৃথিবীতে যার অস্তিত্ব নেই।
চন্দ্রনাথ ঝাঁঝালো গলায় বললে, ও জুতো যে আমার, সেটা প্রমাণ করবে কে?
জয়ন্ত বললে, সে ভার পুলিশের হাতে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারো। এই জুতোজোড়া পাওয়া গিয়েছে তোমার বাড়িতে। পুলিশ দেখেই জুতোজোড়া তুমি সরিয়ে ফেলতে গিয়েছিলে। তার ওপরে এমন আরও অনেক সারকামস্ট্যানসিয়াল এডিভেন্স বা অবস্থাঘটিত প্রমাণও আছে, তোমাকে ফাঁসিকাঠে দোলাবার পক্ষে যা হবে যথেষ্ট।
সুন্দরবাবু বললেন, যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল। যেমন কুকুর তেমনি মুগুর। হুম, জয়ন্তের মতো রোজা না হলে চন্দুরের মতো ভূতকে শায়েস্তা করতে পারে কে?
গুপ্তধন (উপন্যাস)
এক
রাত সাড়ে তিনটে। রাস্তার একপাশে একখানা মোটরগাড়ি। সামনের আসনে মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে আছে একটা লোক। কনস্টেবল লুইস শিলি নিজের ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নজর রাখছিল গাড়িখানার উপরে। এইভাবে কেটে গেল ঘণ্টা খানেক। তারপর শিলি এগিয়ে এসে গাড়ির ভিতরে ফেলল নিজের টর্চের আলো। ড্রাইভারের আসনে বসে বসেই ঘুমোচ্ছে একটি ছোকরা। দুই চোখ মোদা, মাথাটি এলিয়ে পড়েছে কাঁধের উপরে। শিলির প্রথম ধাক্কায় ছোকরা নড়েচড়ে উঠল বটে কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। দ্বিতীয় ধাক্কা দিয়ে শিলি হাঁকলে, এই! কে তুমি? উঠে পড়ো।
ধড়মড় করে ছোকরা জেগে উঠল। তার চোখে-মুখে আতঙ্ক। তারপর ভালো করে চেয়ে দেখে একটা অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সে বললে, তবু ভালো, পুলিশ! আমি ভেবেছিলুম ডাকাত যা ভয় পেয়েছিলুম।
শিলি শুধাল, কে তুমি বাপু? এখানে কি করছিলে?
–ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
নাম কী?
–ডেভিড টিঙ্গো।
বয়স?
সতেরো।
বাড়ি কোথায়?
ক্যামডেনে।
–এত রাত্রে বাড়িতে না গিয়ে রাস্তায় শুয়ে ঘুমোচ্ছিলে কেন?
–সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরছিলুম। হঠাৎ চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে এল।
ছোকরা জবাবগুলো দিচ্ছিল বেশ সপ্রতিভ মুখেই। তার ভাবভঙ্গিও সন্দেহজনক নয়। কিন্তু শিলি ভাবলে তবু বলা তো যায় না, দিনকাল যা খারাপ! চারিদিকেই চুরির পর চুরি হচ্ছে; ছোকরাকে একটু বাজিয়ে দেখা যাক।
–টিঙ্গো, তোমার গাড়ির লাইসেন্স দেখি।
–একটা চামড়ার ব্যাগে পুরে লাইসেন্সখানা পকেটে রেখে দিয়েছিলাম। আজ দুদিন হল ব্যাগটা হারিয়ে গিয়েছে।
