হুম!
চন্দ্রনাথকে আমি বিশ্বাস করিনি, আর আমার সবচেয়ে বেশি সন্দেহ ছিল ওর ওই মোটা লাঠিগাছার উপরে। আমি জানতুম, সে যদি হঠাৎ কোনও চালাকি খেলে বসে, তাহলে পকেট থেকে আর রিভলভার বার করবার সময় পাব না। তাই পকেটের ভিতরেই রিভলভার ধরে আমি আগে থাকতে তৈরি হয়েছিলুম।
ধন্যি ছেলে যা হোক!
–না সুন্দরবাবু, ব্যাপারটায় নতুনত্ব নেই কিছু। চোখের পলক পড়বার আগেই কাজ সারবার জন্যে মার্কিন গুন্ডাদের মধ্যে এই নিয়মই প্রচলিত আছে। এখন ও কথা থাক। লাঠিগাছটা আমার হাতে দিয়ে আগে চন্দ্রনাথকে গ্রেপ্তার করুন।
সুন্দরবাবুর হুকুমে তখনই পাহারাওয়ালা এসে চন্দ্রনাথকে ঘিরে দাঁড়াল।
দাঁতে দাঁতে ঘষতে ঘষতে চন্দ্রনাথ বললে, বটে, বটে! আমার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ পেয়েছ তোমরা?
জয়ন্ত জবাব না দিয়ে চন্দ্রনাথের লাঠিগাছা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। তারপর সকলের দিকে পিছন ফিরে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে লাঠিগাছা আকাশের দিকে উঁচু করে তুলে ধরলে। তারপরেই ঘরের সবাইকে চমকে দিয়ে গুডুম করে একটা আওয়াজ হল।
সুন্দরবাবু আঁতকে বলে উঠলেন, বন্দুক ছুড়লে কে, বন্দুক ছুড়লে কে?
জয়ন্ত ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, আমি।
সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বললেন, মানে? বন্দুকটাও তোমার পকেটের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছ নাকি?
তখন ধূমায়মান লাঠিগাছা দেখিয়ে জয়ন্ত বললে, না। আমি ছুঁড়েছি এই লাঠি-বন্দুকটা।
লাঠি আবার বন্দুকে পরিণত হতে পারে নাকি! গুপ্তির কথা শুনেছি বটে, লাঠির ভিতরে লুকানো থাকে ছোট তলোয়ার। কিন্তু লাঠি-বন্দুক আবার কী চীজ, বাবা!
হ্যাঁ সুন্দরবাবু, আমার হাতে যা দেখছেন তা লাঠির ছদ্মবেশে বন্দুক ছাড়া আর কিছুই নয়। এই দেখুন লাঠির রুপোবাঁধানো মণ্ডি। তার তলার এই যে দেখছেন সোনার ব্যান্ড বা বন্ধনী, আঙুল দিয়ে এটা একটু সরানো যায়। কিন্তু সরাবার সঙ্গে সঙ্গেই লাঠির ভিতরে যে টিগার বা টিপকল আছে, সেটা পড়ে যাবে আর ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়বে বুলেটটা। কী হে চন্দ্রনাথ তাই নয় কি?
চন্দ্রনাথ ক্রুদ্ধ মুখে গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কোনও উত্তর দিল না।
সুন্দরবাবু চমৎকৃত হয়ে বললেন, এমন আজব বন্দুকের কথা কখনও তো শুনিনি।
জয়ন্ত বললে, না শোনবারই কথা! এ দেশে এ রকম বন্দুক থাকতে পারে আমিও আগে তা জানতুম না।
–তবে তুমি লাঠির গুপ্তকথা আবিষ্কার করলে কেমন করে?
বলছি শুনুন। এই মোটা লাঠিগাছা দেখলেই অসাধারণ বলে মনে হয় না কি? এ রকম লাঠি নিয়ে কোনও শৌখীন বাবুই হাওয়া খেতে বেরোয় না। লাঠির ওই অসাধারণত্ব প্রথম দিনেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু আমি তখন ওটাকে ভেবেছিলুম সাধারণ গুপ্তি জাতীয় কোনও অস্ত্র। তারপর আমার প্রথম সন্দেহ জাগ্রত হয় ভদ্রেশ্বরের বাগানে গিয়ে।
–কেন, সেখানে তো আমরাও ছিলুম, আমরা তো চন্দ্রনাথের লাঠিকে তখনও সন্দেহজনক বলে মনে করতে পারিনি।
–গুটিকয় কথা ভেবে দেখুন। ভদ্রেশ্বরের বাগানে আমাদের কোনওই বন্দুকধারী শত্রু ছিল না। মণিমোহন পলাতক, ভদ্রেশ্বর বন্দি, যেদিক থেকে আমাকে লক্ষ্য করে গুলি নিক্ষিপ্ত হয় সেদিকে দাঁড়িয়েছিল কেবল চন্দ্রনাথ। কিন্তু তার হাতে ছিল মাত্র এই লাঠিগাছা। বাগান তল্লাশ করেও অন্য কোনও লোক বা বন্দুক খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বন্দুক ছুড়লে কে? একমাত্র উত্তর হতে পারে, চন্দ্রনাথ। কিন্তু তার কাছেও ওই লাঠি ছাড়া আর কোনও অস্ত্রই ছিল না। গুলি তো আকাশ থেকে খসে পড়েনি, তাই সর্বপ্রথম আমার মনে সন্দেহ জাগে, তবে কি চন্দ্রনাথের ওই লাঠির ভিতরেই কোনও রহস্য নিহিত আছে? বাড়িতে ফিরে এসে এই নিয়ে ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, অনেকদিন আগে কী একখানা ইংরেজি কেতাবে অদ্ভুত একটা লাঠির কথা পাঠ করেছিলুম। কিন্তু বইখানার নামটা প্রথমে মনে পড়েনি। তারপর আমার লাইব্রেরির আলমারিগুলোর ভিতরে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ যখন বইখানা চোখে পড়ে গেল, তখন মানিকও সেখানে হাজির ছিল। কী হে মানিক বইখানার নাম তুমি এর মধ্যে ভুলে যাওনি তো।
মানিক বললে, নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি! বইখানা হচ্ছে জোসেফ গোল্লামসাহেবের মাস্টারম্যান হান্টার্স।
–ঠিক। ওখানা উপন্যাস নয়, সত্য ঘটনায় পরিপূর্ণ অপরাধ বিজ্ঞানের বই। তারই পাতা ওলটাতে-ওলটাতে দ্বাদশ পরিচ্ছেদে প্যারিসের অপরাধ জাদুঘর-এর বর্ণনার মধ্যে খুঁজে পেলুম চন্দ্রনাথের এই লাঠির জুড়ি।
সুন্দরবাবু আগ্রহভরে বললেন, কীরকম, কী রকম?
সম্পূর্ণ ঘটনায় কথা পরে আপনি বিস্তৃতভাবে বইখানা পাঠ করলেই জানতে পারবেন, আপাতত আমি সংক্ষেপেই তার কথা বলব। ফ্রান্সে একবার একটা গার্ডেন-পার্টিতে জনৈক ব্যক্তি কোনও অজানা আততায়ীর দ্বারা নিক্ষিপ্ত গুলিতে নিহত হয়। তখনি ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে আর সারা বাগান আর প্রত্যেক নিমন্ত্রিত ব্যক্তির জামা-কাপড় তল্লাশ করে, কিন্তু বন্দুক বা কোনওরকম আগ্নেয়াস্ত্রই খুঁজে পায় না। অন্য কোনও সূত্র না পেয়ে গোয়েন্দারা খোঁজ নিতে লাগল, নিহত ব্যক্তির সঙ্গে কারুর বিশেষ শত্রুতা আছে কি না! ফলে এক ব্যক্তির ওপরে পুলিশের সন্দেহ হয়। তারপর তার বাড়ি খানাতল্লাশ করে আবিষ্কৃত হয় এমন একগাছা লাঠি, যা অবিকল চন্দ্রনাথের এই লাঠি গাছারই মতো।
