সকলে বৈঠকখানায় গিয়ে আসন গ্রহণ করলে পর চন্দ্রনাথ বললে, আপনারা এমনকী জরুরি খবর দেবার জন্যে এতদূর ছুটে এসেছেন?
সুন্দরবাবু বললেন, আপনার বন্ধু মণিমোহনকে মনে আছে তো?
কিন্তু আপনাদের সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে তার সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি। জানি না সে কোথায় অজ্ঞাতবাস করছে।
–আমরা এত দিন পরে তাকে খুঁজে পেয়েছি, কিন্তু জীবন্ত অবস্থায় নয়।
কী বলছেন!
–হ্যাঁ, গতকল্য কে যেন তাকে খুন করেছে।
–শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হলুম। অপরাধীর কোনও সন্ধান পেয়েছেন?
–না। মণিমোহনের সঙ্গে শত্রুতা ছিল, এমন কোনও লোককে আপনি জানেন?
তার কোনও শত্রু বা বন্ধুকেই আমি চিনি না, কারণ তার সঙ্গে বেশিদিন আমার আলাপ হয়নি।
জয়ন্ত এবার মুখ খুললে। বললে, আপনার বাড়িতে কয়খানা ঘর আছে চন্দ্রনাথবাবু?
দশখানা।
–ঘরগুলো একবার দেখাবেন?
–আপনার কৌতূহল একটু অদ্ভুত নয় কি? –
-কেন, দেখাতে কোনও আপত্তি আছে? –
-কিছু না। আসুন।
একে একে সব ঘর দেখিয়ে চন্দ্রনাথ সবশেষে দোতলার একখানা ঘরে ঢুকে বললে, এখানা আমার শোবার ঘর।
জয়ন্ত একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলে। তারপর এক দিকে চেয়ে বললে, ওখানে রয়েছে পরপর সাত জোড়া জুতো। সব জুতোই আপনার?
শুকনো হাসি হেসে চন্দ্রনাথ বললে, হ্যাঁ। আমার কিঞ্চিৎ পাদুকাবিলাস আছে।
জয়ন্ত জুতোগুলোর সামনে গিয়ে বসে পড়ল। একে-একে সব জুতো হাতে করে তুলে নিয়ে উলটেপালটে পরীক্ষা করে বললে, বাঃ, বেশ জুতোগুলো! চন্দ্রবাবুর পছন্দ আছে বটে!
চন্দ্রনাথ ভাবহীন মুখে গম্ভীর স্বরে বললে, মশায়ের আর কিছু জ্ঞাতব্য বা বক্তব্য আছে?
জয়ন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললে–নীচেয় ফিরে যাই চলুন।
সকলে আবার বৈঠকখানায় এল।
সুন্দরবাবুর এক সহকারী কর্মচারী একটা লোককে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেইখানে। বললে, স্যার, এই লোকটা বাড়ির বাইরে যাচ্ছিল, আমরা যেতে দিইনি।
লোকটা বললে, আমি এই বাড়ির চাকর। বাজারে যাচ্ছি।
সহকারী বললে, কিন্তু ও বাজারে যাচ্ছে রেশন ব্যাগের ভিতরে একজোড়া জুতো নিয়ে!
জয়ন্ত সাগ্রহে বললে, জুতো! দেখি দেখি।
চন্দ্রনাথ বললে, কোথাকার একটা উটকো লোক আজ ভোরে রেশন ব্যাগসুদ্ধ ওই জুতোজোড়া আমার বৈঠকখানায় ফেলে গিয়েছিল। তাই চাকরকে আমি বলেছিলুম সে যেন বাজারে যাবারসময় জুতোজোড়া রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায়।
জয়ন্ত নিরুত্তর মুখে একখানা আতস কাচের সাহায্যে জুতোজোড়া খানিকক্ষণ পরীক্ষা। করে বললে, সুন্দরবাবু গাড়িতে ওঠবার সময় আপনাকে কী আনতে বলেছিলাম মনে আছে?
–সেই অপরিচিত ব্যক্তির পদচিহ্নের ছাঁচ তো? এনেছি।
তার সঙ্গে এই জুতোজোড়া মিলিয়ে দেখুন।
গাড়ি থেকে ছাঁচ আনানো এবং জুতোর সঙ্গে মেলানো হল। অবিকল মিলে গেল– একচুল এদিক-ওদিক হল না।
সুন্দরবাবু উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, হত্যাকারীর জুতো।
জয়ন্ত বললে, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। জুতোর তলার দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন জায়গায় জায়গায় শুকনো রক্তের দাগ। তার মানে হচ্ছে কাল মণিমোহনকে বধ করবার পরেও এই জুতোজোড়া ব্যবহার করা হয়েছিল। এই জুতো সংগ্রহ করবার জন্যেই আমার এখানে আগমন।
চন্দ্রনাথ চমকে উঠে বললে, কী বললেন? আপনি জানতেন যে, ওই জুতো আছে আমার এইখানেই?
–ঠিক জানতুম বলতে পারি না, তবে এইরকম একটা সন্দেহ করেছিলুম বটে!
চন্দ্রনাথ খাপ্পা হয়ে বলে উঠল, এতক্ষণ আমার ধারণা ছিল কোনও উটকো লোক জুতোজোড়া আমার বৈঠকখানায় ফেলে রেখে গিয়েছে। এখন বুঝতে পারছি, এ হচ্ছে পুলিশের কারসাজি। কিন্তু আপনাদের সমস্ত কূটকৌশলই ব্যর্থ হবে। দেখুন ওই জুতোর সঙ্গে আমার পা মিলিয়ে। আমি বলছি এ জুতো আমার নয়।
জয়ন্ত সহাস্যে বললে, আমি জানি ও-জুতোর মাপ আপনার পায়ের চেয়ে বড়। কিন্তু আমি কেবল জুতোর আসল গুপ্তকথাই জানি না, বোধ হচ্ছে আপনার ওই লাঠির গুপ্তকথাও আমার কাছে অবিদিত নেই। সুন্দরবাবু, আপনি এখন অনায়াসেই চন্দ্রনাথকে থানায় ধরে নিয়ে যেতে পারেন।
আচম্বিতে চন্দ্রনাথের মুখ হয়ে উঠল বীভৎস এক দানবের মতো। সঙ্গে সঙ্গে ফস করে সে লাঠিগাছা দুই হাতে কোমর-বরাবর উঁচু করে তুলে ধরলে–
এবং তৎক্ষণাৎ একটা রিভলভার গর্জন করে উঠল ও পরমুহূর্তে লাঠিগাছা তার হাত থেকে খসে মেঝের ওপরে পড়ে গেল সশব্দে। চন্দ্রনাথের ডান হাতের কবজির ওপরে ফুটে উঠল রক্তের রেখা।
চারদিকে তাকাতে-তাকাতে সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, রিভলভার ছুড়লে কে, রিভলভার ছুড়লে কে?
জয়ন্ত প্রশান্ত কণ্ঠে বললে, সে কথা পরে শুনবেন সুন্দরবাবু। এখন চট করে লাঠিগাছা তুলে নিন দেখি। কিন্তু খুব সাবধান বোধহয় ওটা লাঠি নয়–কোনও সাংঘাতিক ভয়াবহ অস্ত্র।
.
পদচিহ্ন রহস্য
চন্দ্রনাথের পরিত্যক্ত লাঠিগাছাটা মাটির ওপর থেকে তুলে নিয়ে সুন্দরবাবু আবার বললেন, কিন্তু রিভলভার ছুড়লে কে?
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, রিভলভার ছুঁড়েছি আমি সুন্দরবাবু।
সুন্দরবাবু মাথা নেড়ে বললেন, হতেই পারে না। যখন রিভলভারের আওয়াজ হয়। তখন তোমার ডান হাত ছিল জামার পকেটের ভিতরেই।
–ঠিক দেখেছেন। এখনও আমার ডান হাত জামার পকেটের ভিতরেই আছে।
তবে?
পকেটের ভিতর থেকেই আমি রিভলভার ছুঁড়েছিলুম।
–সে কী হে?
–এই দেখুন, আমার পকেট ছাদা করে রিভলবারের গুলিটা বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
