রিসিভারটা রেখে দিয়ে জয়ন্ত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল গম্ভীর মুখে। তারপর ধীরে ধীরে বললে, মানিক সব শুনলে তো! ঘটনার স্রোত যে এমনি কোনও দিকেই ছুটবে, আমি তা কতকটা আন্দাজ করতে পেরেছিলুম। যবনিকা পড়তে আর বেশি দেরি নেই! নাও, এখন ওঠো।
.
সুপরিচিত অপরিচিত
তখন মর্গে স্থানান্তরিত হয়েছিল মণিমোহনের দেহ। জয়ন্ত ও মানিককে নিয়ে সুন্দরবাবু সেইখানে গিয়ে হাজির হলেন।
জয়ন্ত চমৎকৃত হয়ে লক্ষ করলে, ভদ্রেশ্বরের সঙ্গে মণিমোহনের আকৃতিগত সাদৃশ্য। একরকম দীর্ঘত, একরকম গঠন এবং প্রায় একরকম মুখ-চোখ-নাক। কেবল ভদ্রেশ্বরের জোড়া ভুরু মণিমোহনের জোড়া নয়। ভদ্রেশ্বরের চেয়ে মণিমোহনের রং একটু বেশি ফরসা। এবং মণিমোহনের চেয়ে ভদ্রেশ্বরের কপাল বেশি প্রশস্ত কিন্তু এই অল্পসল্প পার্থক্য চেষ্টা করলে খুব সহজেই ঢেকে ফেলা যায়।
জয়ন্ত বললে, দেখছি মণিমোহন মারা পড়েছে ছোরার আঘাতে।
সুন্দরবাবু বললেন, হ্যাঁ, ঠিক বুকের ওপরে মোক্ষম আঘাত। ডাক্তারের মতে, আঘাতের সঙ্গে-সঙ্গেই মৃত্যু হয়েছে, মণিমোহন হয়তো ছটফট করবারও সময় পায়নি!
–কোন সময়ে এর মৃত্যু হয়েছে, ডাক্তার সে সম্বন্ধে কোনও মত প্রকাশ করেছেন কি?
ডাক্তারির হিসাবে প্রকাশ, মণিমোহনের মৃত্যু হয়েছে অন্তত গতকল্যকার সন্ধ্যার আগে।
মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে কখন?
আজ ভোরবেলায়।
–আপনার মুখে শুনলাম, বালির কাছে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পাশে একটা সরু গলির ভিতরে মৃতদেহটা পাওয়া গিয়েছে। সে কীরকম গলি? সেখান দিয়ে কি লোক চলাচল হয় না?
–এ কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন?
কাল সন্ধ্যার আগে খুন হয়েছে, অথচ লাশ পাওয়া গেছে আজ সকালে? জায়গাটা নিশ্চয়ই অত্যন্ত নির্জন।
না, জায়গাটা মোটেই নির্জন নয়। স্থানীয় লোকেরা বলে, কাল রাতদুপুরেও গলির ভিতরে লাশ-টাস কিছুই ছিল না।
–তাহলে মণিমোহন মারা পড়েছে অন্য কোনও জায়গায়। হত্যার অনেক পরে, গভীর রাতে তার দেহটা ওই গলির ভিতরে ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জয়ন্ত, আগে আমিও ওই সন্দেহ করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলুম, খুনটা হয়েছে। ওই গলিতেই। কিন্তু তারপর ডাক্তারের রিপোর্ট পেয়ে মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু কিন্তু বলতে-বলতে সুন্দরবাবু ভুরু কুঁচকে মাথা চুলকোতে লাগলেন।
–থামলেন কেন? ভাবছেন কী?
–হুম! আমি ভাই একেবারেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছি।
–কেন?
সন্ধ্যার আগেই যদি মণিমোহনের মৃত্যু হয় থাকে, তবে রাত বারোটার পরেও তার মৃতদেহ থেকে কি রক্তের ধারা বইতে পারে?
–আপনার কথার অর্থ কী?
–মৃতদেহ যেখানে পাওয়া গিয়েছে সেখানকার মাটি ভিজে গিয়েছে রক্তের ধারায়।
–মুখ টিপে হেসে জয়ন্ত বললে, না, অতক্ষণ পরে মৃতদেহ থেকে রক্ত বেরুতে পারে না।
–তবে। ডাক্তার কি ভুল রিপোর্ট দিয়েছেন?
–উঁহু, সম্ভবত ডাক্তার ভুল করেননি। সুন্দরবাবু, আমি আর একটা ব্যাপার আন্দাজ করতে পারছি।
কী আন্দাজ?
–ফোনে আমাকে বললেন না ঘটনাস্থলে পাওয়া গিয়েছে সেই নিরুদ্দেশ অপরিচিত ব্যক্তির সুপরিচিত পদচিহ্ন?
হ্যাঁ। সেই পদচিহ্নগুলো।
–পাওয়া গিয়েছে রক্তমাখা মাটির উপরে? কেমন এই তো?
চরমবিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে সুন্দরবাবু বলে উঠলেন, কী আশ্চর্য, কেমন করে জানলে তুমি?
বললুম তো আন্দাজে।
–এ কীরকম আন্দাজ বাবা? এ যে মন্ত্রশক্তিকে হার মানায়!
–আমার আন্দাজ প্রায়ই সত্য হয়ে দাঁড়ায়, কারণ যুক্তি থেকেই তার উৎপত্তি।
ধন্য ভায়া। দাদা হয়েও তোমার পায়ে গড় করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আচ্ছা, এখন কী করবে? ঘটনাস্থলটা একবার দেখে আসবে নাকি?
না সুন্দরবাবু, প্রয়োজন নেই। আমি মনে-মনে মামলাটা প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছি, কেবল একটু তদন্ত বাকি আছে। বিলম্বে কার্যহানির সম্ভাবনা, শুভস্য শীঘ্রম।
–আমাকে কী করতে বলো?
জনকয়েক লোক নিয়ে এখনি আমার সঙ্গে চলুন।
–কোথায় হে?
–এখনি দেখতে পাবেন।
.
জয়ন্তের নির্দেশে পুলিশের জিপগাড়ি এসে থামল শালিখার চন্দ্রনাথ রায়ের বাড়ির সামনে। সবিস্ময়ে সুন্দরবাবু শুধোলেন, জয়ন্ত তুমি কি চন্দুরের কাছেই এসেছ?
হ্যাঁ।
–তুমি কি ওর বিরুদ্ধে নতুন কোনও প্রমাণ পেয়েছ?
–কোনও প্রমাণই পাইনি।
–তবে?
–আমি চন্দ্রনাথের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা করতে চাই।
আর আমরা কী করব?
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কথোপকথন শ্রবণ করবেন।
এমন সময়ে বোধহয় গাড়ি থামার শব্দ শুনেই চন্দ্রনাথ স্বয়ং বেরিয়ে এসে দাঁড়াল দোতলার বারান্দায়। তারপর ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখে বললে, আরে! আবার আমার দ্বারে সুন্দরবাবুর দল!
সুন্দরবাবু বললেন,আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনাকে একটা খবর দিতে এসেছি। নেমে আসুন।
মিনিট দুই পরে চন্দ্রনাথ নীচে নেমে রাস্তায় বেরিয়ে এল। হাতে তার সেই মোটা লাঠিগাছা।
জয়ন্ত বললে, মশাই কি বাড়িতেও ওই বাঘ-মারা লাঠিছাড়া হয়ে থাকেন না?
চন্দ্রনাথ বললে, কোমরে হঠাৎ লাম্বেগোর ব্যথা হয়েছে। লাঠি ছেড়ে চলতে কষ্ট হয়। সুন্দরবাবু, কী একটা খবরের কথা বলছিলেন না?
সুন্দরবাবু বললেন, আমাদের রাস্তায় দাঁড়িয়েই কথাবার্তা কইতে হবে নাকি? আপনি কি আমাদের ধুলোপায়েই বিদায় করতে চান?
চন্দ্রনাথ নাচারের মতো বললে, বেশ, তবে বাড়ির ভিতরে আসুন।
