হ্যাঁ, এ-ভুল আর শোধরাবার উপায় নেই! অদৃশ্য মানুষকে হাতে পেয়েও ছেড়ে দিলেন। তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, সে বদ্ধ পাগল! সে মানুষের টাকা কেড়ে নেবে, নরহত্যা করবে, পৃথিবী তার অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে উঠবে! আমি তার সমস্ত মনের কথা শুনেছি, সে সমস্ত মানুষকে ঘৃণা করে, আজকের ব্যাপারের পর সে আর কারুকেই ক্ষমা করবে না! ছি, ছি, কি সর্বনাশটাই করলেন বলুন দেখি!
দারোগাবাবু স্রিয়মান মুখে বললেন, তাকে কি ধরবার আর কোনওই উপায় নেই?
পূর্ণবাবু বললেন, উপায় থাক আর না থাক, আমাদের চেষ্টা করতে হবে তো!…দাঁড়ান, হয়েছে! শুনুন, শ্রীপুরের চারিদিকে চৌকিদার রাখুন–তারা সব পথ-ঘাট আগলে থাক। পথে ঘাটে কুকুরেরা ঘেউ ঘেউ করলেই খোঁজ নিন! তার মুখেই আমি শুনেছি, সে অদৃশ্য হলেও কুকুররা তার অস্তিত্ব টের পায়! শ্রীপুরের সমস্ত লোককে সশস্ত্র আর সাবধান হয়ে থাকতে বলুন! কেউ যেন তার বাড়ির ভিতরে ঢোকবার পথ খোলা না রাখে! সর্বদাই খাবার-দাবার যেন লুকিয়ে রাখা হয়,–যেন সে খাবার চুরি করতে না পারে, যেন সে অনাহারে থাকে!
দারোগাবাবু বললেন, তাহলে আপনিও আসুন, এ-বিষয়ে চটপট একটা ব্যবস্থা করে ফেলা যাক!
পূর্ণবাবু বললেন, যাচ্ছি। কিন্তু আর একটা কথা জেনে রাখুন। তার অদৃশ্য দেহের ভিতরে হজম না হওয়া পর্যন্ত খাবার দেখা যায়। খাবার হজম করবার জন্যে তাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। এখানকার প্রত্যেক বনেজঙ্গলে আর ঝোপে-ঝাপে পাহারা দেবার জন্যে লোক রাখতে হবে। যদি দরকার হয়, পথে-ঘাটে কাচের টুকরোও ছড়িয়ে রাখতে হবে। তার পা আহত হলে রক্ত পড়ে, আর সে রক্ত অদৃশ্য নয়! জানি, এ-ব্যবস্থা নিষ্ঠুর। কিন্তু উপায় কি? সে একে অদৃশ্য, তার ওপরে পাগল আর হিংস্র জন্তুর মতো ভয়ংকর!
দারোগা বললেন, এত তো আটঘাট বেঁধে কাজ করতে বলছেন, কিন্তু তার আগেই সে যদি এ-মুল্লুক ছেড়ে লম্বা দেয়?
পূর্ণবাবু বললেন, সে এখনি এখান থেকে নড়বে বলে মনে হয় না। বংশী বলে কে একটা লোক তার দরকারি পুঁথিপত্র নিয়ে পালিয়েছে। আমার বোধহয় সেগুলো সে আগে ফিরে পাবার চেষ্টা করবে।
দারোগা বললেন, তাহলে আর দেরি নয়। আসুন, বেরিয়ে পড়া যাক।
দুজনে দ্রুতপদে নীচে নেমে গেলেন।
ত্রয়োদশ। দৃশ্যে ও অদৃশ্যে
অদৃশ্য মানুষ নিশ্চয় দুর্জয় ক্রোধে অন্ধের মতো হয়ে পূর্ণবাবুর বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। কারণ সেই বাড়ির দরজার সামনে তখন একটি ছোট শিশু নিজের মনে খেলা করছিল, আচম্বিতে কোনও অদৃশ্য শক্তি তাকে শূন্যে তুলে ছুঁড়ে দূরে ফেলে দেয় এবং বেচারির একখানা পা ভেঙে যায়।
তারপর ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে আর তার কোনওই সন্ধান পাওয়া গেল না। হয়তো পূর্ণবাবুর বিশ্বাসঘাতকতায় ও নিজের আশায় নিরাশ হয়ে খানিকক্ষণের জন্যে সে অত্যন্ত দমে গিয়েছিল এবং কোনও নির্জন স্থানে নিশ্চেষ্ট ভাবে বসে ভবিষ্যতের কর্তব্য স্থির করে নিয়েছিল।…
কিন্তু সে জানতে পারলে না, ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে সমস্ত পৃথিবী কীরকম জাগ্রত হয়ে উঠেছে। শ্রীপুরের ঘরে-ঘরে প্রত্যেক সদর-দরজা আজ বন্ধ। কোনও স্কুল, কলেজ ও আপিসও আজ খোলা নেই। খাবারওয়ালারা পর্যন্ত তাদের দোকানে ঝপ তুলে দিয়েছে। এবং পথে পথে সেপাইরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে।
শ্রীপুর শহরের প্রান্তে নদীর ঘাটে খেয়া পারাপার আজ বন্ধ। এবং শ্রীপুর স্টেশনে সমস্ত রেলগাড়িরই কামরার দরজা আর জানলা আজ বন্ধ! শ্রীপুর থেকে মালগাড়ি যাওয়াও আজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কি জানি, ভোলা মালগাড়ি পেয়ে অদৃশ্য মানুষ পাছে তার উপরে চড়ে সকলের অজান্তে পলায়ন করে!
মাঠে মাঠে বনে-জঙ্গলে আনাচ-কানাচে মোটা মোটা লাঠি-সোটা, রামদা, তরোয়াল ও সড়কি নিয়ে দলে দলে লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং হাওয়ায় কোথাও একটা পাতা নড়লেই হাঁ হাঁ করে সেই দিকে ছুটে যাচ্ছে।
অদৃশ্য মানুষ যে শ্রীপুরের মায়া এখনও ত্যাগ করেনি, শীঘ্রই সে প্রমাণ পাওয়া গেল।
শ্রীপুরের এক পাটকলের ম্যানেজার ছিলেন চন্দ্রভূষণবাবু। সন্ধ্যার কিছু আগে নদীর ধারের মাঠের ভিতরে হঠাৎ তার মৃতদেহ পাওয়া গেল। চন্দ্রবাবুর সর্বাঙ্গে ভয়ানক প্রহারের দাগ এবং তার মাথাটাও কে ভেঙে গুঁড়ো করে দিয়ে গেছে। চন্দ্রবাবুর মৃতদেহের পাশে তার নিজের মোটা বেতের লাঠিটা দু-টুকরো হয়ে পড়েছিল এবং তারই খানিক তফাতে ছিল একটা মোটা লোহার রক্তমাখা গরাদ! বেশ বোঝা গেল, ওই গরাদের সাহায্যেই চন্দ্রবাবুকে কেউ হত্যা করে গিয়েছে।
এই ব্যাপারে শহরময় অত্যন্ত হইচই পড়ে গেল। চন্দ্রবাবু ছিলেন নির্বিরোধী ভালোমানুষ লোক–শ্রীপুরে কেউ তার শত্রু ছিল না। সুতরাং সকলেরই ধারণা হল, অদৃশ্য মানুষ ছাড়া এ-কাজ আর কেউ করেনি। কিন্তু চন্দ্রবাবুকে খামোকা সে খুন করতে যাবে কেন? এ খুন। যে টাকার জন্যে নয় তার প্রমাণ, চন্দ্রবাবুর পকেট থেকে মানিব্যাগটা হারায়নি! তবে?
অনেক খোঁজাখুঁজির পর সঠিক ব্যাপারটা জানা না গেলেও, একটা হদিস পাওয়া গেল। মাঠের ধারের একখানা বাড়ি থেকে একটি ছোট মেয়ে যা দেখেছিল, তাই নিয়ে সকলে। অনেকরকম জল্পনা-কল্পনা করতে লাগল। মেয়েটি বলে, মাঠের উপর দিয়ে একটা লোহার গরাদ ঠিক পাখির মতোই নাকি উড়ে যাচ্ছিল, আর তার পিছনে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ছুটছিলেন চন্দ্রবাবু। মেয়েটি তার পরের কথা আর কিছু বলতে পারলে না।
