আলমারিটা পরীক্ষা করে জয়ন্ত বললে, বোঝা যাচ্ছে, অপরাধীরা কাজ করে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। তারা নিশ্চয়ই সঙ্গে করে এনেছিল একটা পোর্টাবল অক্সিজেন ট্যাঙ্ক। আগুনের শিখায় ইস্পাত গলিয়ে আলমারির পাল্লা খুলে ফেলা হয়েছে।
সুন্দরবাবু বললেন, একেবারে ঝানু অপরাধী। এত কাণ্ডকারখানার মধ্যে কোথাও আধখানা আঙুলের ছাপ পর্যন্ত রেখে যায়নি।
মানিক একটু বিস্মিত স্বরে বললে, অথচ আপনি বলছেন, তারা তাদের পায়ের ছাপ রেখে গিয়েছে।
ছাপ বলে ছাপ! স্পষ্ট ছাপ।
জয়ন্ত মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, বড়ই সন্দেহজনক, বড়ই সন্দেহজনক?
সন্দেহজনক? কেন?
–কেন তা জানি না। এখন বাইরে চলুন।
বারান্দায় পড়েছিল রক্তাক্ত কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা মূর্তি। হতভাগ্য দ্বিজদাসের মৃতদেহ। কাপড় সরিয়ে দেহটার ওপরে দৃষ্টিপাত করে জয়ন্ত বললে, বেশ বোঝা যাচ্ছে ছোরার এক আঘাতেই ভদ্রলোক মারা পড়েছেন।
সুন্দরবাবু বললে, বিয়োগান্ত দৃশ্যের কতকটা আমি আন্দাজ করতে পারছি। খুব সম্ভব অপরাধীরা যখন রামবাবুর ঘরের দরজা খোলবার চেষ্টা করেছিল, সেই সময়ে দ্বিজদাসের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি ব্যাপার কী জানবার জন্যে তাড়াতাড়ি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন আর সেই সঙ্গে-সঙ্গেই আক্রান্ত হন।
জয়ন্ত দুই পা এগিয়ে বললে, এই পদচিহ্নগুলোর কথাই বলছেন?
–হ্যাঁ।
ছয়জোড়া পদচিহ্ন–তার মধ্যে তিনজোড়া খুব স্পষ্ট। দুইজন লোকের কর্দমাক্ত জুতোর ছাপ। চিহ্নগুলো আরম্ভ হয়েছে বারান্দার একটা নদৰ্মার কাছ থেকে।
হেঁট হয়ে দেখতে-দেখতে জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, গতকল্য রাত্রে এ অঞ্চলে কি বৃষ্টি পড়েছিল?
–নিশ্চয়ই নয়।
–আজ সকালের কাগজে আমি আবহাওয়ার রিপোর্ট দেখেছি। কাল কলকাতার কোথাও একফেঁটা বৃষ্টিও হয়নি।
হয়নি তো হয়নি। তা নিয়ে তোমার মাথাব্যথা কেন?
–মাথা থাকলেই মাথার ব্যথা হওয়া সম্ভব।
তার মানে তুমি বলতে চাও, আমার মাথা থেকেও নেই?
–আমি ও-সব কিছুই বলতে চাই না। আমি খালি এই কথাই আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আগুন না থাকলে যেমন ধোঁয়া দেখা যায় না, তেমনি জল না পড়লে মানুষের জুতোও কর্দমাক্ত হয় না।
চমৎকৃতভাবে সুন্দরবাবু কেবলমাত্র উচ্চারণ করলেন–হুম!
জয়ন্ত বললে, বাড়ির কোনও বেয়ারাকে ডাকুন।
একজন বেয়ারা হাজির হল।
জয়ন্ত শুধোলে, নদৰ্মার কাছে দেখছি একটা মগ আর একটা খালি বালতি রয়েছে।
বেয়ারা বললে, আজ্ঞে, ব্যবহার করবার জন্যে সবসময়েই জলভরা বালতি থাকে।
কাল রাত্রেও ছিল?
আজ্ঞে হা হুজুর। কাল সন্ধের সময়ে আমি নিজের হাতে জলভরা বালতি রেখে গিয়েছি।
–কিন্তু বালতিতে জল নেই।
–তাহলে কাল রাতে কারুর জলের দরকার হয়েছিল।
–আচ্ছা, তুমি যাও। সুন্দরবাবু!
কী ভাই?
নর্দমার কাছটা পরীক্ষা করে দেখুন। ওখানে রয়েছে পাতলা কাদার প্রলেপ।
–এ থেকে কী বুঝব?
–এই পদচিহ্নগুলো হচ্ছে প্রদর্শনীর জন্যে।
–প্রদর্শনী?
–হ্যাঁ। অপরাধীরা এই পদচিহ্নগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চায়।
কারণ?
কারণ বোঝবার চেষ্টা করুন আপনি। এসো মানিক, এখানে আমাদের আর কোনও কাজ নেই।
জয়ন্ত ও মানিকের একসঙ্গে প্রস্থান। সুন্দরবাবু হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথার টাক চুলকাতে লাগলেন।
.
পরের দিন সকালবেলায় মানিক এসে দেখলে, কী যেন ভাবতে-ভাবতে জয়ন্ত তার পুস্তকাগারের মেঝের ওপরে পদচারণা করছে।
মানিক বললে, তোমার মুখ দেখে বোধ হচ্ছে তুমি যেন কিছু মনে করবার চেষ্টা করছ, কিন্তু মনে করতে পারছ না!
–ঠিক তাই। একখানা বইয়ের নাম কিছুতেই স্মরণে আসছে না।
কীরকম বই?
সেইটেই তো প্রশ্ন। বইখানা কিনে পড়েছিলুম অনেকদিন আগে। আর একটা বিশেষ ঘটনার কথাও মনে আছে। কিন্তু বইখানার নাম মনে আনতে পারছি না বলে বুঝতে পারছি না, ঘটনাটা কাল্পনিক না সত্য কাহিনি।
–ঘটনাটা কাল্পনিক হলে কিছু ক্ষতি আছে?
–আছে বইকী, খুব আছে। সেটা কাল্পনিক ঘটনা হলে আমার অনুমানও অমূলক বলে প্রমাণিত হবে।
–অনুমানটা কি শুনতে পাই না?
–ভদ্রেশ্বরের বাগানে আমার প্রতি নিক্ষিপ্ত বুলেটটা এসেছিল কীরকম আগ্নেয়াস্ত্রের ভিতর থেকে, সেইটেই আমি বোঝবার চেষ্টা করছি।
মানিক অত্যন্ত বিস্মিত হল, কিন্তু মুখে কিছু বললে না। জয়ন্ত বইয়ের আলমারিগুলোর ভিতরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করতে করতে বারংবার এদিক-ওদিক আনাগোনা করতে লাগল। মানিক একখানা চেয়ারের ওপর বসে সেদিনের খবরের কাগজখানা টেনে নিলে। এইভাবে কেটে গেল প্রায় বিশ মিনিট।
হঠাৎ জয়ন্ত সানন্দে চিৎকার করে বলে উঠল, পেয়েছি।
কী পেয়েছ হে?
–সেই বইখানা।
কী বই?
–জোসেফ গোলামসাহেবের মাস্টার ম্যান-হান্টারসঅর্থাৎ ওস্তাদ মনুষ্য শিকারি। বইখানা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে।
–ওখানা কি উপন্যাস?
–মোটেই নয়! ওর আগাগোড়াই আছে কেবল সত্য ঘটনার পর সত্য ঘটনা। দস্তুরমতো অপরাধবিজ্ঞানের বই, কাল্পনিক কথা একটাও নেই।
–তাহলে তোমার অনুমান ভুল নয়?
–খুব সম্ভব তাই।
কীরকম আগ্নেয়াস্ত্র থেকে তোমাকে গুলি করা হয়েছিল? জয়ন্ত জবাব দেবার আগেই বেজে উঠল টেলিফোনের ঘণ্টা।
–হ্যালো!..আ-রে, আজ সকালেও ফোনে সুন্দরবাবু! ব্যাপার কী? এখনি আমাকে আপনার কাছে ছুটতে হবে? কেন? কাল রাত্রেও আবার একটা নরহত্যা হয়েছে? আঁ,–কে খুন হয়েছে বললে? এবারে স্বয়ং মণিমোহন? এবারের ঘটনাস্থলেও সেই পরিচিত পদচিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। আচ্ছা, আমরা এখনি যাচ্ছি।
