–রাইফেলও পেতে পারি।
–আপনার অন্বেষণ সফল হলে খুশি হব।
–আপনার হাতে অমন মোটা লাঠি কেন?
আমার শখ।
–ওরকম শখ ভালো নয়। ভবিষ্যতে রোগা লাঠি নিয়ে আমার সামনে আসবেন।
উপদেশের জন্যে ধন্যবাদ।
খানিক পরে পরেশ ফিরে এসে জানালে, কোথাও কোনওরকম আগ্নেয়াস্ত্রের সন্ধান মিলল না।
চন্দ্রনাথ সকৌতুকে বললে, তাহলে সুন্দরবাবু অতঃপর আমি সসম্মানে বিদায় গ্রহণ করতে পারি?
–হুম!
নমস্কার!
সুন্দরবাবু প্রতি নমস্কার করলেন না। চন্দ্রনাথ চলে গেল।
সুন্দরবাবু বললেন, ভাই জয়ন্ত, এই চন্দুরে আর ওই ভদুরেটা দেখছি আমাকে সাত ঘাটের জল না খাইয়ে ছাড়বে না।
জয়ন্ত বললে, খাওয়ায় যদি তো খেতে হবে। আপাতত কী করবেন?
–আরও ভালো করে খানাতল্লাশি করে দেখি, মণিমোহন কোথাও ঘাপটি মেরে আছে কিনা!
আমি আর মানিক এইবার প্রস্থান করতে চাই।
.
–পরদিন প্রভাতে বেজে উঠল জয়ন্তের টেলিফোন ঘণ্টা।
রিসিভার নিয়ে জয়ন্ত বলল, হ্যালো!
–আমি সুন্দরবাবু।
–আপনার কণ্ঠস্বর উত্তেজিত কেন?
–আবার খুন! আবার চুরি–যে-সে চুরি নয়, নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা আর ত্রিশ হাজার টাকার জড়োয়া গয়না উধাও। আবার পদচিহ্ন।
–পদচিহ্ন?
–হ্যাঁ, মণিমোহন আর সেই অজ্ঞাত ব্যক্তির পদচিহ্ন–যাকে আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি শীঘ্র এসো।
–আপনি কোথায়?
–ঘটনাস্থলে।
ঠিকানা?
সাতাশ নম্বর সতীশ বসু স্ট্রিট।
.
অপরিচিতের সুপরিচিতের পদচিহ্ন
সাতাশ নম্বর সতীশ বসু স্ট্রিট। নতুন ঘটনাস্থল। একখানা রেলিংঘেরা মাঝারি আকারের বাড়ি। ফটক পার হলেই পাওয়া যায় খানিকটা খোলা জমি। এইখানে কয়েকজন পুলিশকর্মচারী ও অন্যান্য লোকের সঙ্গে চেয়ার পেতে বসেছিলেন সুন্দরবাবু।
জয়ন্ত ও মানিকের আবির্ভাব।
সুন্দরবাবু বললেন, এসো ভায়া এসো। আগে গোড়ার কথা শুনবে, না একেবারেই বাড়ির ভিতরে যাবে?
জয়ন্ত বললে, আগে গৌরচন্দ্রিকাটা হয়ে যাওয়াটা ভালো।
–হুম, উত্তম! এই বাড়ির মালিকের নাম রামময় মণ্ডল। লোহার ব্যাপারী, ধনী ব্যক্তি, স্ট্র্যান্ড রোডে গদি। সংসার খুব বড় নয়–স্ত্রী, দুই মেয়ে এক ছেলে ও এক ভাই। বহুদিন রোগ-ভোগের পর স্ত্রীর দেহ ভেঙে যাওয়াতে ডাক্তাররা বায়ু পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। কাজের চাপের জন্যে রামবাবু নিজে কলকাতা ছাড়তে পারেননি, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে পরিবারবর্গকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন শিমুলতলায়। হঠাৎ পরশু রাত্রে তার ভাইয়ের কাছ থেকে এক টেলিগ্রাম আসে? বউদি মৃত্যুশয্যায়। অবিলম্বে চলে এসো। কিন্তু টেলিগ্রাম পাবার পর ট্রেন ছিল না বলে রামবাবু পরশু রাত্রে শিমুলতলায় যেতে পারেননি। তিনি গতকল্য সকালের ট্রেনে কলকাতা ত্যাগ করেছেন, বাড়ির অতি পুরাতন ও অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী দ্বিজদাসের জিম্মায় রেখে।
বাধা দিয়ে জয়ন্ত শুধোলে, দ্বিজদাস ছাড়া বাড়ির ভিতরে আর কেউ ছিল না?
–ছিল। তিন জন বেয়ারা আর দুই জন দ্বারবান। বাড়িখানায় দুটো মহল, সদর আর অন্দর। বেয়ারা আর দারোয়ানের ঘর সদরের একতলায়। দ্বিজদাস ছিল অন্দরের দোতলার একখানা ঘরে রামবাবুর শয়নগৃহের ঠিক পাশেই। আজ সকালে দেখা যায় দোতলার বারান্দার ওপরে পড়ে আছে দ্বিজদাসের মৃতদেহ, কে তার বুকের ওপরে ছোরার আঘাত করেছে। রামবাবুর ঘরের দরজার কুলুপ ভাঙা, ঘরের ভিতরকার লোহার সিন্দুক থেকে অদৃশ্য হয়েছে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা আর ত্রিশ হাজার টাকার জড়োয়া গয়না।
–অত টাকা ব্যঙ্কে জমা না দিয়ে বাড়ির ভিতরে রাখা হয়েছিল কেন?
টাকাটা রামবাবুর হাতে এসেছিল পরশু বৈকালেই। রাত্রে টেলিগ্রাম পেয়ে রামবাবু দুশ্চিন্তায় পাগলের মতন হয়ে যান। কাল সকালে উঠেই তাকে তাড়াতাড়ি স্টেশনে ছুটতে হয়েছিল বলে তিনি টাকার কোনও ব্যবস্থা করে যেতে পারেননি।
অপরাধীরা কি দলে ভারী ছিল?
জানি না। তবে পদচিহ্ন পেয়েছি দুইজনের। ফোনেই তো বলেছি, দুই পদচিহ্নই আমাদের পরিচিত। এক চিহ্নের মালিক মণিমোহন, অন্য চিহ্নের মালিক আজও অজ্ঞাতবাস করছে।
–তারা বাড়ির ভিতরে ঢুকল কেমন করে?
–খিড়কির দরজা দিয়ে।
–ওখানকার দরজা কি বন্ধ ছিল না?
–ছিল বলেই তো শুনেছি।
তবে?
জয়ন্তের কাছে এসে সুন্দরবাবু তার কানে কানে বললেন, বাড়ির ভিতরে নিশ্চয়ই অপরাধীদের সহকারী আছে। হয়তো কোনও দ্বারবান বা বেয়ারা! সে খোঁজ পরে নেওয়া যাবে। আপাতত তাদের সবাইকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে।
–আপনার গৌরচন্দ্রিকা শেষ হল?
–একটু বাকি আছে। কিন্তু সে যে একটু নয়, দস্তুরমতো গুরুতর একটু।
–অর্থাৎ?
–মিনিট পঁচিশ আগে আজ শিমুলতলা থেকে দ্বিজদাসের নামে রামবাবুর এই জরুরি টেলিগ্রাম এসেছে। পড়ে দেখো।
টেলিগ্রামখানা নিয়ে জয়ন্ত পাঠ করলে ও স্ত্রীর পীড়ার সংবাদ মিথ্যে। তার স্বাস্থ্য যথেষ্ট উন্নত। অবিলম্বেই কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি।
জয়ন্ত মৌন মুখে ভাবছে, সুন্দরবাবু বললেন, রামবাবুকে কলকাতা থেকে যথাসময়ে সরাবার জন্যে কেউ তাকে মিথ্যে ভয় দেখিয়ে টেলিগ্রাম করেছিল। কে সে! নিশ্চয়ই অপরাধীদের কেউ!
জয়ন্ত বললে, আপনার অনুমানই সত্য বলে মনে হচ্ছে। দেখছি অপরাধীরা রীতিমতো আটঘাট বেঁধে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে।
সুন্দরবাবু অগ্রসর হয়ে বললেন, এইবারে বাড়ির ভিতরে চলো।
প্রথমেই তারা গিয়ে ঢুকল রামবাবুর শয়নগৃহে। যার ভিতর থেকে টাকা ও গহনা চুরি গিয়েছে সেটা লোহার সিন্দুক নয় স্টিলের আলমারি।
