জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, না।
না মানে?
–না মানে, না। হাসপাতালে যাব না।
–সে কী হে?
বন্ধু, শিকারির লক্ষ্য অব্যর্থ বটে, কিন্তু সে লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি।
সুন্দরবাবু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললেন, হুম, ও আবার কীরকম কথা?
জয়ন্ত বুক-পকেট থেকে একখানা হৃষ্টপুষ্ট পকেট বই বার করে বললেন, দেখুন।
কী দেখব?
–আততায়ীর বুলেট জামার পকেট ভেদ করে পকেট বইয়ের মলাট আর অনেকগুলো পাতা ফুড়ে আর বেশি এগুতে পারেনি। আমি অক্ষত, আপনি নিশ্চিন্ত হোন।
মানিক উৎফুল্ল কণ্ঠে বললে, জয়ন্ত, ভগবানই তোমাকে বাঁচিয়েছেন।
হ্যাঁ ভাই। কিন্তু কেবল আমাকে নয়, গত মহাযুদ্ধের সময়ে ভগবান এই উপায়ে বহু সৈনিকেরই প্রাণরক্ষা করেছেন।
সুন্দরবাবু খানিকক্ষণ চমৎকৃতের মতো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর যেন নিজের মনেই বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার।
মানিক চারিদিকে তাকাতে-তাকাতে বললে, কিন্তু বন্দুক ছুড়লে কে?
দুজন পাহারাওয়ালার মাঝখানে এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল ভদ্রেশ্বর। যে মুখ টিপে হেসে বলল, বন্দুকটা যে আমি ছুড়িনি অন্তত এ সম্বন্ধে আপনাদের নিশ্চয়ই কোনও সন্দেহ নেই?
সুন্দরবাবু ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, এই চোপ। বন্দুক তুই না ছুঁড়ে থাকিস তোর স্যাঙাত ছুঁড়েছে!
–আমার স্যাঙাত?
-হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই পাজি ছুঁচো-উল্লুক মণিমোহন ব্যাটা!
সুন্দরবাবু, আপনাদের ওই মণিমোহন পাজি কিনা জানি না, কিন্তু সে এক সঙ্গে ই ছুঁচো আর উল্লুক হাত পারে না। ওরা হচ্ছে দু-জাতের দুরকম জীব।
–চোপরাও, চোপরাও! তাহলে ছুঁচো হচ্ছিস তুই আর উল্লুক হচ্ছে মণিমোহন।
–মহাশয়, আর-একবার ভ্রম সংশোধন করবার আজ্ঞা হোক।
ভ্রম সংশোধন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। মণিমোহন উল্লুক কি না জানি না কিন্তু আমি যে ছুঁচো নই–এ বিষয়ে আপনারা সকলে একমত হতে বাধ্য। আমি মানুষ।
–হুম, হুম! তোর মতো বক্কেশ্বর জীবনে আমি আর দেখিনি। তুমি যদি ফের বক বক করিস তাহলে তোর দুই গালে মারব দুই ধাবড়া।
অতি বিনীতভাবে মাথা কাত করে ভদ্রেশ্বর বললে, দয়াময়, এই আমি গাল পেতে দিলাম। থাবড়া মারবেন তো অনুগ্রহ করে ঝটিতি এগিয়ে আসুন।
সুন্দরবাবু হার মেনে ভদ্রেশ্বরের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধ ক্রোধে ফুলতে লাগলেন।
ভদ্রেশ্বর তবু নাছাড়বান্দা। টিটকারি দিয়ে বললে, বেশি ফুলবেন না মশায়, আপনার দোদুল্যমান ভূঁড়ির অসুখ হতে পারে।
সুন্দরবাবু আর পারলেন না, গর্জন করে বলে উঠলেন, সেপাই সেপাই! ভদ্দরেটাকে টানতে-টানতে বাগানের বাইরে নিয়ে যাও। একেবারে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোলো গে।
ভদ্রেশ্বর বললে, টানাটানি হানাহানির দরকার নেই বাবা! সেপাই অগ্রসর হও! আমি পোষ-মানা ভেড়ার মতো তোমাদের সঙ্গে কুইক মার্চ করব।
ভদ্রেশ্বর বিদায় হলে পর জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু তাহলে আপনার বিশ্বাস মণিমোহন আমার প্রতি গুলি নিক্ষেপ করেছে?
–সে নয় তো আর কে এ কাজ করতে পারে? ব্যাটা নিশ্চয়ই আড়ালে আড়ালে কোথায় লুকিয়ে আছে? আমার ভয় হচ্ছে, সে যদি আবার গুলি ছোড়ে?
জয়ন্ত বললে, আমি ফটকের দিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলুম। গুলিটা এসেছে ওই দিকের কোন ঝোপঝাড় থেকেই।
তাই নাকি, তাই নাকি? তাহলে তো এখনি ওদিকটা ভালো করে খুঁজে দেখতে হয়।
–হ্যাঁ, তাই দেখুন। বাগানের বাইরে পুলিশের কড়া পাহারা আছে, আততায়ী নিশ্চয়ই এখনও বাগান থেকে বেরিয়ে যেতে পারেনি।
হঠাৎ সুন্দরবাবু একেবারে থ। দূরে দেখা গেল, মোটা লাঠিগাছা ঘোরাতে-ঘোরাতে ফটকের দিকে হন হন করে এগিয়ে যাচ্ছে চন্দ্রনাথ।
মানিক সবিস্ময়ে বললে, চন্দ্রনাথ এখনও বাগানের ভিতরে কী করছে?
সুন্দরবাবু চিৎকার করে নিজের সহকারীকে ডেকে বললেন, পরেশ! লোকজন নিয়ে দৌড়ে যাও, চন্দুরেকে আমার কাছে টেনে নিয়ে এসো।
অনতিবিলম্বে পাহারাওয়ালাদের সঙ্গে চন্দ্রনাথের পুনরাগমন। তার চেহারার ভয়-সঙ্কোচের চিহ্নমাত্র নেই, ভাবভঙ্গি অতীব সপ্রতিভ।
–সুন্দরবাবু রুক্ষ স্বরে শুধোলেন, আপনি এতক্ষণ ওখানে কী করছিলেন?
–হাওয়া খাচ্ছিলুম না নিশ্চয়ই।
–পষ্টাস্পষ্টি জবাব দিন। আপনি এতক্ষণ ওখানে কী করছিলেন?
–হঠাৎ শ্রবণ করলুম বন্দুকের শব্দ। পরমুহূর্তে দর্শন করলুম আপনার বন্ধুর পতন। তাই শুনে আর দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা কী তলিয়ে বোঝবার চেষ্টা করছিলুম। সেটাও কি বে-আইনি?
সুন্দরবাবু বুলেট বিদ্ধ পকেট-বইখানা চন্দ্রনাথের সামনে ধরে বললেন, দেখুন।
–দেখছি।
–এই পকেট-বই আজ জয়ন্তকে বাঁচিয়েছে।
–বুঝেছি।
–এইবার আমরা আপনার জামাকাপড় খুঁজে দেখব।
–কেন?
–দেখব, জামাকাপড়ের মধ্যে আপনি কোনও আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রেখেছেন কি না?
কীরকম আগ্নেয়াস্ত্র? রাইফেল?
–জামাকাপড়ের ভিতরে রাইফেল লুকিয়ে রাখা চলে না।
–তবে কী খুঁজতে চান? রিভলভার?
ধরুন তাই।
কিন্তু যে বুলেট দেখালেন, ওটা তো রাইফেলের বুলেট। কোনও ছোট আকারের রাইফেলের বুলেট।
–তবু খুঁজে দেখব।
–দেখুন।
খোঁজাখুঁজি ব্যর্থ। বিপজ্জনক কিছুই পাওয়া গেল না।
সুন্দরবাবু বললেন, পরেশ, লোকজন নিয়ে ফটকের ওই দিকে যাও। ঝোপঝাড় খুঁজে রিভলভার টিভলভার কিছু পাও কি না, দেখ।
সদলবলে পরেশের প্রস্থান।
চন্দ্রনাথ হেসে বললে, পাওয়া গেছে রাইফেলের বুলেট, আপনি খুঁজছেন রিভলভার।
