জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ ভালোর মা, হরিদাসী কি রাতে তোমার সঙ্গেই শুত?
ভালোর মা বললে, না বাবু, সে শুত একলা অন্য ঘরে।
–বেশ, সে ঘরখানা একবার আমরা দেখতে চাই।
ভালোর মা তাদের ভিতর-মহলে নিয়ে গিয়ে একখানা ঘর দেখিয়ে দিল।
ঘরের ভিতরে ঢুকে মানিক বললে, জয়ন্ত, কী উদ্দেশ্যে তুমি এ ঘরখানা দেখতে চাও?
জয়ন্ত বললে, মানিক কায়ার পিছনে ছায়ার মতো কেবল আমার সঙ্গে সঙ্গে থেকে কোনই লাভ নেই। যা সচক্ষে দেখছ আর স্বকর্ণে শুনছ, তা নিয়ে তোমারও স্বাধীন চিন্তাশক্তি ব্যবহার করা উচিত। এ ঘরে যে একবার আমাদের আসতেই হবে, আমি তা আগে থাকতেই জানতুম। আর সেই জন্যেই থানা থেকে মণিমোহনের পদচিহ্নের ছাঁচ এখানে আনিয়ে রেখেছি।
মানিক বললে, তুমি কি এই ঘরের মেঝেতে মণিমোহনের নতুন পদচিহ্ন আবিষ্কার করতে চাও?
–সে চেষ্টা বোধহয় সফল হবে না!
তবে?
-হরিদাসী যে পুরুষ, এটা আমার সন্দেহ মাত্র। কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে, পুরুষ হলেও সে সত্য সত্যই মণিমোহন কি না? এই ঘরে এই প্রশ্নের উত্তর পাবার সম্ভাবনা আছে।
যুক্তিটা মাথায় ঢুকছে না।
নিরেটদের মাথায় পেরেকও ঢোকে না। সুন্দরবাবুর সঙ্গগুণে তুমি একটি নিরেট হয়ে উঠছ। নির্বোধ, হরিদাসী যদি ছদ্মবেশী পুরুষ হয় তাহলে এই ঘরে নিশ্চয়ই তার পুরুষ-বেশ ধারণের উপকরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। পুলিশের ভয়ে তাড়াতাড়ি পালাবার সময়ে সেগুলো যে সে নিয়ে যেতে পারেনি, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। হ্যাঁ, যা ভেবেছি তাই। টেবিলের ওপরে রয়েছে রুপোর সিগারেট কেস আর দেশলাই। আলনায় দু-খানা শাড়ি, একটা সেমিজ আর একটা ব্লাউজ ঝুলছে বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে রয়েছে দুখানা ধুতি আর দুটো পাঞ্জাবিও। মানিক, হরিদাসী পুরুষই বটে!
সিগারেট-কেসটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়ে মানিকের সামনে ধরে জয়ন্ত বললে, দেখ। এর ওপরে ইংরাজিতে খোদাই রয়েছে এম। ওটা মণিমোহনের নামের আদ্য অক্ষর বলে গ্রহণ করা যেতে পারে কি না?
মানিক সায় দিয়ে বললে, হ্যাঁ, এটা একটা বড় প্রমাণ।
এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে ও এটা-ওটা-সেটা নিয়ে নাড়ানাড়ি করতে করতে জয়ন্ত বললে, তবু আমি যা খুঁজছি তা পাচ্ছি না। তারপর হেঁট হয়ে পড়ে খাটের তলায় দৃষ্টিচালনা করে জয়ন্ত উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল, পেয়েছি মানিক, পেয়েছি।
কী?
–খাটের তলায় রয়েছে এক জোড়া জুতো। ব্যস, আপাতত আমাদের খোঁজাখুঁজি শেষ। মানিক জুতোজোড়া খাটের তলা থেকে টেনে নিয়ে আমার সঙ্গে চলে এসো।
বাগানে নেমে এসে তারা দেখলে, ভদ্রেশ্বর তখনও সুন্দরবাবুর সঙ্গে কথা কাটাকাটি করছে এবং চন্দ্রনাথ আপন মনে পায়চারি করছে সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবেই।
সুন্দরবাবু অধীর স্বরে বললেন, ভাই জয়ন্ত, এই ঠোঁটকাটা ভদ্রেশ্বরের লেকচার আর আমি সহ্য করতে পারছি না। এর মুখ বন্ধ করবার কোনও উপায় পেয়েছ কি?
মৃদু হাস্য করে জয়ন্ত বললে, বোধহয় পেয়েছি। মণিমোহনের জুতোের ছাঁচ কোথায়?
–এই যে ভাই, এই যে।
খিলখিল করে হেসে উঠে ভদ্রেশ্বর বললে, আবার ওই ছাঁচের সঙ্গে আমার জুতো মেলানো হবে নাকি?
জয়ন্ত বললে, মোটেই নয়। মণিমোহনের জুতোর ছাঁচের সঙ্গে আমি এই জুতো জোড়া মিলিয়ে দেখব।
ভদ্রেশ্বর সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বললে, ও কার জুতো?
ছাঁচের সঙ্গে জুতো মেলাতে-মেলাতে জয়ন্ত বললে, বাঃ, অবিকল মিলে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এ হচ্ছে মণিমোহনের জুতো, পাওয়া গিয়েছে হরিদাসীর ঘরে।
সুন্দরবাবু সহর্ষে এবং সদম্ভে বলে উঠলেন, হুম! হুম! বার বার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান–
চন্দ্রনাথ সহসা বললে, ভদ্রেশ্বরবাবু এখন আমি চললুম। ভাড়ার টাকার জন্যে পরে আর একদিন দেখা করব।–সে হন হন করে ফটকের দিকে এগিয়ে চলল।
সুন্দরবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, আরে গেল, চন্দুরেটা পালায় যে!
জয়ন্ত বললে, ওকে যেতে দিন সুন্দরবাবু! চন্দ্রনাথকে গ্রেপ্তার করতে পারি, এমন কোনও প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।
ভদ্রেশ্বর বললে, আপনারা আমাকেও গ্রেপ্তার করতে পারেন না।
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, মণিমোহনের জুতো আবিষ্কারের পরেও!
–ও জুতো নিশ্চয়ই হরিদাসীর ঘরে ছিল না। এসব হচ্ছে পুলিশের কারসাজি।
ভদ্রেশ্বরকে সজোরে একটা ধাক্কা মেরে সুন্দরবাবু বললেন, পাজি, ছুঁচো এখনও বকবকানি। চুপটি মেরে থানায় চল, তোর যা বলবার আদালতে গিয়ে বলবি!
আচম্বিতে গুড়ুম করে একটা শব্দ হল এবং সঙ্গে সঙ্গে জয়ন্ত দুই হাতে নিজের বুক চেপে ধরে মাটির ওপরে বসে পড়ল।
.
পকেট বুকের মহিমা
সুন্দরবাবু প্রথমটা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যস্তভাবে জয়ন্তর দিকে ছুটে গেলেন। মানিক তার আগেই জয়ন্তের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছে।
সুন্দরবাবু বললেন–জয়ন্ত, জয়ন্ত তোমার কোথায় লাগল?
জয়ন্ত টপ করে উঠে পড়ে একটুখানি হেসে বললে, বুকে।
–অ্যাঁ, বলো কী! বুকে গুলি লেগেছে, আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছ।
কান্নার চেয়ে হাসিই আমি পছন্দ করি।
–না, ঠাট্টা রাখো। দেখি কোথায় লেগেছে?
–এই যে বাঁ-দিকের বুক পকেটের উপরে।
সুন্দরবাবু দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে সভয়ে বলে উঠলেন, ও বাবা, এ যে একেবারে মোক্ষম আঘাত! গুলি পকেট ছাদা করে ভিতরে চলে গিয়েছে।
মানিক উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললে, জয়ন্ত, কী করে তুমি এখনও পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছ? চলো, আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই।
