–নাম তো শুনলুম, এখন পরিচয়টাও দিতে আজ্ঞা হয়।
–ওই সুন্দরবাবু আসছেন। আমাদের পরিচয় ওঁর মুখেই শুনতে পারেন।
কিন্তু সুন্দরবাবুর কাছ থেকে জয়ন্ত ও মানিকের পরিচয় জানবার জন্য চন্দ্রনাথ কোনও আগ্রহই প্রকাশ করলে না। হাত জোড় করে নমস্কার করে যেন ব্যঙ্গের স্বরেই বললে, আসুন সুন্দরবাবু।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রতি নমস্কার করে সুন্দরবাবু অপ্রসন্ন স্বরে বললেন, হুম্ এই আমি এসেছি। কিন্তু আপনি এখানে এসেছেন কেন?
কী আশ্চর্য প্রশ্ন!
আশ্চর্য প্রশ্ন?
–কেবল আশ্চর্য নয়, যুক্তিহীন প্রশ্ন।
–মানে?
–আমি এখানে আসব না তো, আসবে কে? আপনি বোধহয় জানেন না, এ বাড়ির মালিক হচ্ছি আমি।
–খুব জানি বাবা, খুব জানি! আর জানি বলেই তো আজ আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করব?
–গ্রেপ্তার করবেন? আমি এই বাড়ির মালিক বলে আমাকে আপনি গ্রেপ্তার করবেন?
–হ্যাঁ, হা, হ্যাঁ!
–না, না, না। বাড়ির মালিক হওয়াও অপরাধ নাকি?
–যে বাড়ির ভিতরে খুনি আসামি আশ্রয় পায় তার মালিক হওয়া অপরাধ বইকী!
–কে খুনি আসামি?
–আপনার স্যাঙাত মণিমোহন।
তার সঙ্গে এ বাড়ির সম্পর্ক কী?
–সে এখানে ছদ্মবেশে লুকিয়েছিল।
–আমি এ কথা বিশ্বাস করি না। আর একথা সত্য হলেও আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারেন না।
–পারি না নাকি!
–না। আমি এই বাড়ির মালিক বটে, কিন্তু এখানা ভাড়া দিয়েছি ভদ্রেশ্বরবাবুকে। আজ তার কাছে আমি ভাড়ার টাকা আদায় করতে এসেছি। ভদ্রেশ্বরবাবুর বাড়ির ভিতর কে থাকে, আর না থাকে, তার কোনও খবরই আমি রাখি না। কোন আইন অনুসারে আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করবেন? চুপ করে রইলেন কেন, বলুন? কোন আইন অনুসারে আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করবেন সুন্দরবাবু? এখনও বোবা হয়ে রইলেন? হা হা হা হা হা! গ্রেপ্তার করবেন। গ্রেপ্তার করলেই হল!
সুন্দরবাবুর হতাশ ভাব। অসহায়ের মতো তিনি তাকালেন জয়ন্তের মুখের পানে।
জয়ন্ত বললে, না চন্দ্রবাবু আপনাকে কেউ গ্রেপ্তার করতে পারে না, সুন্দরবাবু বলেছিলেন কথার কথা মাত্র। ওকথায় আপনি কান দেবেন না। ওই দেখুন, আর একখানা জিপগাড়ি বাগানের ভিতরে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে কে নামছে? ভদ্রেশ্বরবাবু না?
সুন্দরবাবুর মুখ কিঞ্চিৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু ওদিকে তাকিয়ে অনুচ্চস্বরে তিনি বললেন, ভদ্রেশ্বর বেটাও আসছে ঠিক চন্দুরের মতো বুক ফুলিয়ে বেপরোয়াভাবে। এমন দুজন বেপরোয়া লোককে সচরাচর একসঙ্গে দেখা যায় না। এ আমি কোথায় এসে পড়েছি বাবা!
কাছে এসে এক গাল হেসে ভদ্রেশ্বর বললে, আরে সুন্দরবাবু! মশাই, এত তাড়াতাড়ি আপনি যে আমাকে বাসায় ফিরতে দেবেন, আমি ভাবতেই পারিনি। তারপর? আপাতত এদিককার খবর-টবর সব ভালো তো?
সুন্দরবাবু গুম হয়ে গিয়ে বললেন, মোটেই ভালো নয়–অন্তত তোমার পক্ষে।
ভদ্রেশ্বর চক্ষু বিস্ফারিত করে যেন সভয়েই বললে, অ্যাঁ, বলেন কী! খবর আমার বিপক্ষে?
–হুম, তাই। খবর তোমার বিপেক্ষই বটে।
–হায় হায়! কেন এমনটা হল?
–তুমি খুনি আসামি মণিমোহনকে এই বাড়ির ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিলে।
বটে, বটে, বটে! মণিমোহন নামধেয় সেই কাল্পনিক ব্যক্তিটি এখনও আপনার ঘাড় ছেড়ে নামতে রাজি হয়নি? একটু আগে আমিই ছিলুম মণিমোহন। এখন স্থির করেছেন, মণিমোহন এই বাড়ির ভিতর লুকিয়ে আছে।
না, এখন সে বাড়ির ভিতর নেই। সে লম্বা দিয়েছে।
–আপনার চোখে ধুলো দিয়ে?
–এ জন্যেও তুমি দায়ী! মণিমোহনের সঙ্গে তোমার চেহারার খানিকটা মিল আছে। সেই সুযোগ গ্রহণ করে তুমি যদি আমাকে ভুলিয়ে এখান থেকে সরিয়ে না নিয়ে যেতে, তাহলে মণিমোহন কখনওই পালাতে পারত না।
যত দোষ নন্দ ঘোষ। মশাই, আমার আর রূপকথা শোনবার বয়স নেই। পথ দেখুন কিংবা পথ ছাড়ুন। আমাকে বাড়ির ভিতরে যেতে দিন।
বাড়ির ভিতরে যাবে মানে! মামারবাড়ির আবদার নাকি! তোমাকে আমাদের সঙ্গে আবার থানায় যেতে হবে।
–কেন?
কতবার বলব? খুনি আসামিকে তুমি লুকিয়ে রেখেছিলে।
–কোথায় সে? প্রমাণ দেখান।
–সে এখানে হরিদাসী নাম নিয়ে স্ত্রীলোকের ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল।
ভদ্রেশ্বর আগে হা হা করে খুব খানিকটা হেসে নিলে। তারপর বললে, বাহবা কী বাহবা! মণিমোহন আগে ছিল শ্রীমান ভদ্রেশ্বর, কিন্তু এখন সে হয়েছে শ্রীমতী হরিদাসী? চমৎকার! মশাই গাঁজা-টাজা খান না তো?
–চোপরাও বদমাইস?
–মোটেই চুপ করব না। হরিদাসীকে আগে এখানে নিয়ে আসুন।
–পুলিশ দেখে সে পালিয়ে গিয়েছে কেন?
–পালিয়ে গিয়েছে বলেই ধরে নিতে হবে যে স্ত্রীলোক নয় পুরুষ, হরিদাসী নয়, মণিমোহন? এটা কোন দেশের যুক্তি? হরিদাসী পাড়াগেঁয়ে ভিতু মেয়ে, নতুন শহরে এসেছে, পুলিশ দেখে সে তো ভয়ে পালিয়ে যাবেই।
সুন্দরবাবুর অবস্থা আবার অসহায় হয়ে পড়ল। জয়ন্তকে একটু তফাতে নিয়ে গিয়ে নিম্নস্বরে বললে, ভায়া, যেমন ওই চন্দুরেটা, তেমনি এই ভদ্রেশ্বরবটাই মাছের মতো পিছল, ধরলেও হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে যায়। তোমার কথাতেই ওকে এখানে নিয়ে এসেছি, এখন তুমিই ওর মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করো।
জয়ন্ত বললে, বেশ তাই করছি। আমি আর একবার বাড়ির ভিতরে যাব। ততক্ষণে আপনি মণিমোহনের জুতোর ছাঁচ গাড়ি থেকে আনিয়ে রাখুন। এসো মানিক।
দোতলার দালানে দাস-দাসীরা তখনও দাঁড়িয়েছিল।
