জয়ন্তের মুখে ফুটে উঠল দারুণ হতাশা, কিন্তু সহজ স্বরেই সে বললে, আমাকে খিড়কির পুকুরে নিয়ে চলো।
ছোট একটা পুকুর। নোংরা জল। ভাঙা ঘাট। চারপাড়েই আগাছার ভিড়। কিন্তু সেখানেও হরিদাসীর পাত্তা মিলল না।
জয়ন্ত কঠিন স্বরে বললে, এর পর তুমি কী বলতে চাও ভালোর মা?
ভালোর মা ভয়েভয়ে বললে, কী জানি বাবু, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!
জয়ন্ত তিক্ত স্বরে বললে, দেখছ মানিক, নিরেট পরেশটা বাড়ির চারদিকে এখনও পাহারা বসায়নি? সে-ই হচ্ছে যত অনিষ্টের মূল। তার ওপরে নির্ভর করেই আমি হরিদাসীকে ছেড়ে ফোন করতে গিয়েছিলুম।
কিন্তু হরিদাসী কে?
–সে কথার জবাব একটু পরে দেব। আপাতত ভালোর মাকে তোমার জিম্মায় রেখে আমি একটু উদ্যান-ভ্রমণ করে আসি। জয়ন্ত চলে গেল দ্রুতপদে।
অনতিবিলম্বে ব্যস্তভাবে এসেই সুন্দরবাবু বলে উঠলেন, মানিক, তুমি একা কেন?
জয়ন্ত উদ্যান-ভ্রমণে গিয়েছে।
–এই কি উদ্যান-ভ্রমণের সময়?কোথায় তোমাদের আসল মণিমোহন?
–ওই যে জয়ন্ত আসছে, ওকেই জিজ্ঞাসা করুন।
–জয়ন্ত, মণিমোহন কোথায়?
একখানা শাড়ি আর একটা সেমিজ মাটির ওপরে নিক্ষেপ করে জয়ন্ত বললে, জামাকাপড় আমাদের উপহার দিয়ে মণিমোহন এখান ছেড়ে প্রস্থান করেছে।
–আরে হুম! এ তো দেখছি স্ত্রীলোকের জামা-কাপড়!
–হ্যাঁ সুন্দরবাবু, মণিমোহন স্ত্রীলোকের ছদ্মবেশেই বাড়ির ভিতর লুকিয়েছিল। তারপর নারীর খোলস ত্যাগ করে বাগানের পাঁচিল ডিঙিয়ে লম্বা দিয়েছে। এর জন্য দায়ী হচ্ছেন। আপনাদের পরেশবাবু। তিনি সেপাইদের সরিয়ে নিয়ে না গেলে এ বিপত্তি ঘটত না।
রাগে ফুলতে-ফুলতে সুন্দরবাবু বললেন, বটে, বটে! আচ্ছা, তার সঙ্গে পরে বোঝাঁপড়া করব। কিন্তু তুমি মণিমোহনকে চিনতে পারলে কেমন করে?
জয়ন্ত বললে, মণিমোহন এখানে দাসী হরিদাসী সেজেছিল। সে নাকি পাড়াগেঁয়ে মেয়ে, সবে কলকাতায় এসেছে, এখনও লজ্জা ভাঙেনি, বাইরের লোক দেখলেই ঘোমটা টেনে বোবা হয়ে থাকে। আমাদের দেখে ও চট করে ঘোমটা টেনে দিলে, আমিও কিন্তু তার আগেই চট করে হরিদাসীর মুখ দেখে নিলুম। সে মুখ হরিদাসীর মুখ নয়, সে মুখ দেখতে প্রায় ভদ্রেশ্বর ভদ্রের মতো।
সুন্দরবাবু বললেন, মহেন্দ্রবাবু বলেছেন, ভদ্রেশ্বরের মুখ নাকি প্রায় তার ছেলে মণিমোহনেরই মতো দেখতে। এই জন্যেই জগন্নাথ তাকে মণিমোহন বলে ভ্রম করে আমাদের নাকানি-চোবানি খাইয়ে মেরেছে।
–হ্যাঁ সুন্দরবাবু, জগন্নাথের ভ্রমের কথা আমি আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলুম। হরিদাসীর পুরুষত্বের দ্বিতীয় প্রমাণ পেলুম তার পা লক্ষ করে। জানেন তো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনাবৃত পা দেখলেই খুব সহজেই ধরা যায় যে, কে নারী আর কে নয়? তার ওপরে হরিদাসীর আঙুলে আর গোড়ালিতে ছিল বড় বড় কড়া। পাড়াগাঁয়ে গরিবের মেয়ে জুতো পরে না, পায়ে কড়া পড়বে কেন? সে কথা কয় ফিশফিশ করে, এও সন্দেহজনক। লজ্জার ছুতো বাজে, সে নিজের পুরুষকণ্ঠ চাপা দিতে চায়। সুন্দরবাবু, আপনার সহকারী পরেশবাবু নিশ্চয় খুব হুঁশিয়ার ব্যক্তি, নইলে এতগুলো প্রমাণ তার নজর এড়িয়ে যায়?
সুন্দরবাবু দুঃখিতভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, সবই আমার অদৃষ্ট ভাই! জাল ছিঁড়ে মাছ পালিয়ে যাবে বার বার! তার ওপরে দেখ না, মন বলছে, শালখের ওই চন্দুর ব্যাটাই হচ্ছে এই দলের মোড়ল, অথচ তার বিরুদ্ধে একটা প্রমাণও জোগাড় করতে পারছি না।
জয়ন্ত মুখ টিপে একটু হেসে বললে, বিলাতি প্রবাদে বলে, শয়তানের কথা ভাবলেই শয়তানের উদয় হয়! ওই দেখুন, কে আসছে!
সুন্দরবাবু ফিরে বিস্ফারিত চক্ষে দেখলেন, হাতের মোটা লাঠিগাছা ঘোরাতে-ঘোরাতে, হেলতে-হেলতে, দুলতে-দুলতে এবং হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে শালিখার চন্দ্রনাথ রায়।
.
দুজন বেপরোয়া লোক
আগতপ্রায় চন্দ্রনাথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মাথা চুলকোতে-চুলকোতে সুন্দরবাবু বললেন, হুম!
চট করে কী ভেবে জয়ন্ত তাড়াতাড়ি বলে উঠল, সুন্দরবাবু, হুম বলে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। শিগগির বাড়ির ভিতর যান।
–কেন বল দেখি? চন্দুরের ভয়ে?
ভয়ে নয়, আপনাকে থানায় একটা ফোন করতে হবে।
কী জন্যে?
–সেপাইদের জিম্মায় ভদ্রেশ্বরকে একবার এখানে নিয়ে আসুন, আমি তাকে গুটিকয় প্রশ্ন করব।
–উত্তম।
দাঁড়ান। আর একটা কথা। সেই সঙ্গে মণিমোহনের জুতোর ছাঁচও পাঠিয়ে দিতে বলবেন।
–এখানে? কেন হে?
–সে কথা বলবার সময় নেই। ওই চন্দ্রনাথ এসে পড়েছে।
সুন্দরবাবুর প্রস্থান। চন্দ্রনাথ বুক ফুলিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল। মুখ টিপে হাসতে-হাসতে শুধোলে, সুন্দরবাবু সরে পড়লেন কেন? আমার চন্দ্রবদন দেখতে রাজি নন?
মানিক হেসে উঠে বললে, মশাই কি নিজের বদনকে চন্দ্রবদন বলে সন্দেহ করেন?
চন্দ্রনাথ আরও জোরে হেসে উঠে বললে, না মশাই, তা করি না। পিতার ভ্রমে নামেই আমি চন্দ্রনাথ। আর সত্য কথা বলতে কি চন্দ্রবদনের মালিক হলে আমি সুখী হতুম না।
দুঃখিত হতেন?
–ঠিক তাই। পূর্ণচন্দ্রের বদন আকাশেই মানায়। ও-রকম অখণ্ডমণ্ডলাকার বদন কোনও মানুষকেই সুখী করতে পারে না। যাক সে কথা। এখন আপনারা কে বলুন দেখি? মানিকজোড়ের মতো সর্বদাই সুন্দরবাবুর আশেপাশে বিরাজ করেন?
–ঠিক ধরেছেন। আমার নাম মানিকই বটে, আর জয়ন্তও আমার জোড়াই বটে।
