হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কি বলতে চাও?
–এসব অস্বাভাবিক ব্যাপার। আমার দৃঢ় ধারণা, মণিমোহনের ইচ্ছা ছিল তাকে প্রেপ্তার করেই আমরা এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যাই।
–এমন অদ্ভুত ইচ্ছা তার হবে কেন?
–সে জানে, পুলিশ গ্রেপ্তার করেও তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
–ধেৎ, তাও কি সম্ভব! চন্দ্রনাথের কাছ থেকে সে নিশ্চয়ই শুনেছে পুলিশের কাছে। তার পায়ের ছাপ আছে।
খুব সম্ভব তার জুতোর সঙ্গে সে ছাপ মিলবে না।
–কি যে বলছ জয়ন্ত!
–খুব সম্ভব সে মণিমোহন নয়, অন্য কেউ।
–তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি? পুলিশের চর জগন্নাথ আগে থাকতেই মণিমোহনকে চেনে। সে নিজে তাকে শনাক্ত করেছে।
–সে মণিমোহন হলে কিছুতেই যেচে ধরা দিত না। যে খুনের আসামি পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে থাকে, সে কখনও হাসতে হাসতে যেচে ধরা দেয়? অসম্ভব মানিক, অসম্ভব!
কিন্তু জগন্নাথ তাকে শনাক্ত করেছে।
–সে মণিমোহন নয় বটে, কিন্তু হয়তো প্রায় মণিমোহনেরই মতো দেখতে!
মানিক বিস্ময়ে হতবাক।
জয়ন্ত বললে, এ ছাড়া এমন ব্যাপারের আর কোনও অর্থই হয় না। এই বাড়ির ভিতর নিশ্চয়ই কোনও রহস্য আছে! তাই জাল মণিমোহন আমাদের বিপথে চালনা করে এই বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে যেতে চায়।
–কিন্তু সুন্দরবাবু বিপদগামী হলেও এখনও আমরা যথাস্থানেই বর্তমান আছি।
–হ্যাঁ মানিক। রহস্যভেদের ভার গ্রহণ করব আমরাই।
–কেমন করে?
–তা জানি না। ওই যে সাব-ইনস্পেকটার পরেশবাবু আমাদের দিকেই আসছেন। ওঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে খানাতল্লাশির ফল সন্তোষজনক হয়নি।…কি পরেশবাবু কতখানি অগ্রসর হলেন?
পরেশবাবু হতাশভাবে বললেন,–অগ্রসর কি মশাই, এখন আমাদের সুন্দরবাবুর পশ্চাদগামী হতে হবে।
–খানাতল্লাশ করে সন্দেহজনক কিছুই পেলেন না বুঝি?
–কিছু না, কিছু না।
–তাই থানায় ফিরে যেতে চান?
তা ছাড়া আর কি! এখানে বসে আর অশ্বডিম্বে তা দিয়ে কি হবে? এর চেয়ে বাড়িতে ফিরে ভেরেণ্ডা ভাজা ভালো।
বাড়ির লোকজনদের পরীক্ষা করেছেন?
করেছি। লোকজন তো ভারি! দুটো বেহারী চাকর, একটা উড়িয়া বামুন, একটা বুড়ি, আর একটা ছুঁড়ি ঝি। ঘুড়িটা দেশ থেকে নতুন এসেছে। এত লজ্জা যে কথা কইবে কি, মুখের ঘোমটা খুলতেও নারাজ।
–আপনার লোকজনরা কোথায়?
–তাদের গাড়িতে গিয়ে বসতে বলে আমি আপনাদের ডাকতে এসেছি।
জয়ন্ত হঠাৎ সক্রোধে গর্জন করে উঠল, পরেশবাবু!
মানিক চমকে উঠল। জয়ন্ত তো সহজে এমন বিচলিত হয় না। পরেশও হতভম্ব!
–পরেশবাবু, আপনি অত্যন্ত অন্যায় করেছেন–এসো মানিক, শিগগির। মানিকের হাত ধরে টেনে জয়ন্ত দ্রুতপদে অগ্রসর হল এবং যেতে যেতে মুখ ফিরিয়ে পরেশবাবুকে বলে গেল, তাড়াতাড়ি বাড়ির চারদিকে আবার পাহারা বসান।
পরেশবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে নিজের মনেই বললে, বড়বাবু বলেন জয়ন্তবাবুর মাথায় ছিট আছে। কথাটা মিথ্যা নয়! শখের গোয়েন্দা হয়ে কিনা আসল পুলিশকে ধমক দেয়। কি আর করব, বড়বাবুই ওঁকে মাথায় তুলেছেন।
জয়ন্ত ও মানিক বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। কয়েক পদ অগ্রসর হয়ে দেখল দালান ও উঠান এবং দালানের কোণে দ্বিতলে ওঠবার সিঁড়ি।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে তারা দোতলার দালানের ওপরে গিয়ে দাঁড়াল। দালানের এক পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ জটলা করছিল। তাদের দেখেই তারা একেবারে চুপ মেরে গেল। একটি অল্পবয়স্কা স্ত্রীলোক তাড়াতাড়ি মুখে ঘোমটা টেনে দিয়ে জড়সড়ো হয়ে রইল।
প্রায় মিনিটখানেক স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে থেকে জয়ন্ত বললে, তোমাদের কেউ একবার এদিকে এগিয়ে এসো তো।
একটি বুড়ি এগিয়ে এল পায়ে-পায়ে।
জয়ন্ত শুধোল, তুমি কে?
–আমি এ বাড়ির পুরোনো ঝি।
–তোমার নাম কী?
–ভালোর মা।
–আর ওই মেয়েটি?
–ও আমাদের নতুন ঝি। দিন তিনেক হল দেশ থেকে এসেছে।
–হ্যাগো বাছা নতুন ঝি, তোমার নাম কী?
সে ফিশফিশ করে কী বললে শোনা গেল না।
ভালোর মা বললে, ওর বড় নজ্জা বাবু। ওর নাম হরিদাসী।
আচ্ছা ভালোর মা, তোমাদের টেলিফোন আছে কোন ঘরে?
ভালোর মা দেখিয়ে দিলে অঙ্গুলি নির্দেশে। সিঁড়ির ডান পাশে টেলিফোনের ঘর।
দ্যাখো ভালোর মা, তোমরা সবাই এইখানে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি টেলিফোনের কাজ সেরে তোমাদের সঙ্গে কথা কইব।
জয়ন্তের সঙ্গে মানিক টেলিফোনের ঘরে গেল। পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে, জয়ন্ত সুন্দরবাবুকে এই কথাই জানিয়ে দিলে যে–জাগ্রত হোন সুন্দরবাবু! আসল মণিমোহনকে দেখতে চান তো বায়ুবেগে আবার বাগানবাড়িতে ছুটে আসুন।
মানিক বিস্মিত কণ্ঠে বললে, কোথায় আছে আসল মণিমোহন?
–এই বাড়িতেই।
–তাকে তুমি দেখেছ?
–হ্যাঁ, তুমিও দেখবে এসো।
দুজনে আবার দালানে গিয়ে উপস্থিত। ভালোর মা প্রভৃতি তখনও দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জয়ন্ত বললে, ভালোর মা, তোমাদের সকলকেই আমি এইখানেই হাজির থাকতে বললুম না।
–আমরা তো হাজির আছি বাবু!
–কিন্তু হরিদাসী কোথায়?
–সেও আছে।
–কোথায় আছে? আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?
–সে বাসন মাজতে গিয়েছে।
–কোথায়? কলতলায়?
–না, খিড়কির পুকুরে।
–তোমাদের আবার খিড়কির পুকুর আছে বুঝি? কিন্তু কোন দিক দিয়ে সে গেল? ফোন করতে করতে আমি সিঁড়ির ওপরে চোখ রেখেছিলাম, ওখান দিয়ে কেউ যায়নি।
আমাদের অন্দরমহলে আর একটা সিঁড়ি আছে।
