মণিমোহন বললে, বেশ মজা তো! কোন অপরাধে আমাকে থানায় নিয়ে যাবেন, তাও আমি জানতে পারব না?
সব জেনেশুনে ন্যাকা সেজো না মণিমোহন। গেল পঁচিশ তারিখে রাত্রিবেলায় গড়ের মাঠে তুমি আর একজন লোকের সঙ্গে নন্দলাল মিত্রকে খুন করেছ। ঘটনাস্থলে তোমাদের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে।
মণিমোহন আবার হাসতে লাগল।
–ফের হাসছ?
–পুলিশের মুখে রূপকথা শুনলে কার না হাসি পায়?
–রূপকথা মানে?
–কে এই নন্দলাল? ডি এল রায়ের হাসির কবিতার সেই বিখ্যাত নন্দলাল নয় তো? কিন্তু কে তাকে খুন করলে? তার কথা পড়ে আমরাই তো হেসে খুন হতুম!
–আবার রসিকতার চেষ্টা হচ্ছে? সেপাই, এই রসিক ব্যক্তিকে আমার গাড়িতে টেনে গিয়ে যাও তো।
মণিমোহন বললে, টেনে নিয়ে যেতে হবে না। আমি জড়পদার্থ নই, সচল পদযুগলের সাহায্যে নিজেই গাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি।
–তাই চলো তবে। এসো জয়ন্ত, এসো মানিক।
জয়ন্ত বললে, আমরা যাব না। আমরা এখানকার খানাতল্লাশে যোগ দিতে চাই।
সুন্দরবাবু বিস্মিত স্বরে বলেন, এ আবার কি শখ?
–শখ নয়, খেয়াল। মণিমোহনবাবু, আপনার এখানে ফোন আছে?
–আছে। কিন্তু কেন?
হয়তো ব্যবহার করবার দরকার হবে।
মণিমোহনের মুখের ওপরে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল একটা দুর্ভাবনার ভাব। সে সহজ স্বরেই বললে, বেশ ব্যবহার করবেন। তবে কি না, যথামূল্যে।
–যথামূল্যে কেন, দ্বিগুণ দিতে রাজি আছি। অগ্রিম।
–পরে পেলে চলবে। আপাতত আমি সুন্দরবাবুর দ্বারা পরীক্ষিত হবার জন্যে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছি। আসুন সুন্দরবাবু, অকারণে বিলম্ব করছেন কেন?
সুন্দরবাবুর মাথা কেমন গুলিয়ে যেতে আরম্ভ করল। জয়ন্ত কেন এখানে থাকতে চায়– কাকে সে ফোন করতে চায়? আর মণিমোহনটা কি পাঁড়ঘুঘু রে বাবা, খুনের আসামি হয়েও থানায় যাবার জন্যে পুলিশকেই তাড়া লাগাচ্ছে!
এইসব ভাবতে-ভাবতে সুন্দরবাবু প্রস্থান করলেন।
পরের দৃশ্য থানায়। চেয়ারাসীন সুন্দরবাবু। দুইজন পাহারাওয়ালার মাঝখানে দণ্ডায়মান মণিমোহন।
মণিমোহন বললে, পরীক্ষা শুরু করতে আজ্ঞা হোক।
–হুম, ভারি ব্যস্ত যে! তোমার বাবার জন্যেও একটু অপেক্ষা করতে পাচ্ছ না?
আমার বাবা!
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখনি তোমার বাবা এখানে আসবেন।
–মশাই কি ভূত নামাতেও জানেন?
তার মানে?
–আমার বাবা স্বর্গে। সেখান থেকে কেমন করে তাকে এখানে আনবেন?
–একটু সবুর করলেই দেখতে পাবে। না, না, তার আগেও আর একটা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
করুন মশাই, করুন। একটা থেকে একশোটা পর্যন্ত পরীক্ষা করতে পারেন। কিন্তু তার বেশি পরীক্ষা আমি দিতে পারব না।
মনে-মনে উত্তপ্ত হয়েও সুন্দরবাবু মুখে কিছু বললেন না। একটা কাগজের মোড়ক খুলে এক জোড়া জুতো বার করে শুধোলেন, এই জুতোজোড়া চিনতে পারো?
উঁহু। আমার জুতো চেনা ব্যবসা নয়। আমি মিছরির ব্যাপারী।
–ঘটনাস্থলে তোমার পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। বাড়ি থেকেই এই জুতো এনেছি– এ জুতো তোমারই। একবার জুতো জোড়া পায়ে পরো দেখি।
মণিমোহন জুতোর ভিতর পা গলাবার চেষ্টা করে বললে, এ জুতো ছোট। এর মধ্যে পা ঢোকানো অসম্ভব!
সুন্দরবাবুর ইঙ্গিতে পাহারাওয়ালা দুজন মণিমোহনের পায়ে জোর করে জুতো পরাবার চেষ্টা করলে। তাদের চেষ্টাও সফল হল না।
সুন্দরবাবুর দুই ভ্রূ সঙ্কুচিত। মণিমোহনের কৌতুক-হাস্য।
ঠিক সেই সময়ে জগন্নাথের সঙ্গে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন মণিমোহনের পিতা মহেন্দ্রবাবু।
অকুলে যেন কুল পেয়ে সুন্দরবাবু শুধোলেন, মহেন্দ্রবাবু একে চেনেন?
মণিমোহনের দিকে তাকিয়ে মহেন্দ্রবাবুর চোখ উঠল চমকে। আরও দুই পা এগিয়ে তার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে তিনি বললেন, না, এঁকে আমি চিনি না!
–এ কি মণিমোহন নয়?
–এঁকে প্রায় মণিমোহনের মতো দেখতে বটে, কিন্তু ইনি আমার পুত্র নন।
সুন্দরবাবুর ভুড়ি যেন চুপসে ছাদা বেলুনের মতো। এবং ঠিক সেই সঙ্গেই বেজে উঠল টেলিফোন যন্ত্র। বিরক্তিভাবে রিসিভারটা তুলে নিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে সুন্দরবাবু বললেন, হ্যালো!
রিসিভারের ভিতর দিয়ে জয়ন্তের কণ্ঠ ভেসে এল–জাগ্রত হোন সুন্দরবাবু। আসল মণিমোহনকে দেখতে চান তো বায়ুবেগে আবার বাগানবাড়িতে ছুটে আসুন।
সুন্দরবাবুর চুপসে যাওয়া ভুঁড়ি আবার ফুলে উঠল। একসঙ্গে রিসিভার ও চেয়ার ত্যাগ করে তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন সেপাই! আসামিকে লক আপে নিয়ে যাও, এ বেটাও এক ঝকের আর-একটা ঘুঘু। খুব হুঁশিয়ার।
.
শালখের চন্দুরে
মানিক শুধোলে, জয়ন্ত এক যাত্রায় পৃথক ফল হল কেন? আমরাও তো সুন্দরবাবুর সঙ্গে ই যেতে পারতুম।
–যেতে তো পারতুমই, কিন্তু যাওয়া আর হল কই?
–তুমি কি নতুন কোনও সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছ?
–কিছুই আবিষ্কার করতে পারিনি।
তবে?
–মনে একটা সন্দেহ জাগছে!
কী সন্দেহ?
–মণিমোহন স্বেচ্ছায় ধরা দিলে কেন?
–স্বেচ্ছায়?
–নিশ্চয়! সে খুনের মামলার পলাতক আসামি। এ-বাড়িতে টেলিফোন আছে। তার বন্ধু চন্দ্রনাথ পুলিশের কার্যকলাপের কথা নিশ্চয়ই তাকে জানিয়েছে। এ-সময়ে তার কতটা সাবধান হয়ে থাকবার কথা। তুমি কি বিশ্বাস করো, দিনেরবেলায় বাগানের ভিতরে সদলবলে পুলিশের আবির্ভাব হল আর অতি-জাগ্রত খুনের আসামি মণিমোহন তা জানতে পারেনি? অম্লান বদনে ভেড়ার মতো সুড়সুড় করে এসে সে আত্মসমর্পণ করলে। কেবলই কি আত্মসমর্পণ? তাড়াতাড়ি থানায় যাওয়ার জন্যে তার বিপুল আগ্রহও লক্ষ করলে তো?
