–সে কথা আবার বলতে।
.
ভদ্রেশ্বর ভদ্র
খিদিরপুর। গঙ্গার ধার। বেলা প্রায় বারোটা, কিন্তু সূর্যকে ঢাকা দিয়ে রেখেছে মেঘলা আকাশ। মাঝে-মাঝে পৃথিবীকে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে দু-এক পশলা বৃষ্টি।
সদলবলে সুন্দবাবু একখানি বাগানবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। পিছনে জয়ন্ত ও মানিক।
পাঁচিল ঘেরা প্রকাণ্ড এক বাগানের মাঝখানে সেকেলে বাড়ি। সেকেলে বাড়ি বটে, কিন্তু নিয়মিত সংস্কারের গুণে এখনও অব্যবহার্য হয়ে পড়েনি। বাগানের অংশটা নামেই বাগান, কোথাও ফুলগাছের কোনও চিহ্নও নেই। মধুলোভী মৌমাছি আর প্রজাপতিরা সেখানে উড়ে আসে বটে, কিন্তু হতাশ হয়ে আবার উড়ে পালায়। এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছে মোটা মোটা গুঁড়িওয়ালা বুড়ো-বুড়ো গাছ–আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল, তাল, নারিকেল প্রভৃতি। আর আছে। অগুনতি কলাগাছের ভিড়। আর শাকসবজির ছোট-বড় খেত।
মানিক বললে, বাগানের মালিক যে শৌখিন নন, ফুলগাছের অভাবই তা প্রমাণিত করছে। কিন্তু তিনি যে আমাদের সুন্দরবাবুর মতোই উদরপরায়ণ তাতে আর একটুও সন্দেহ নেই।
সুন্দরবাবু দুই চক্ষে ফুটল বিস্ফোরণের লক্ষণ। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, একটুও সন্দেহ না থাকার কারণ?
–এখানে ফুলগাছ নেই, খালি ফলগাছ। এখানে শাক-সবজির খেতে তেমন সুগন্ধ না থাকতে পারে, রন্ধনশালার মাল-মশলা আছে যথেষ্ট। আপনি কি রন্ধনশালাকে দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো জায়গা বলে মনে করেন না!
সুন্দরবাবু বললেন, আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না। ওই যে জগন্নাথ আসছে। আমি এখন ওর সঙ্গেই কথা কইতে চাই।
জয়ন্ত শুধোলে, জগন্নাথ কে?
আমাদের চর। সেই-ই তো মণিমোহনকে এই বাড়িতে ঢুকতে দেখেছে। জগন্নাথ কাছে এসে নমস্কার করে বললে, বড়বাবু, মণিমোহন এখনও ওই বাড়ির ভিতরেই আছে।
সুন্দরবাবু বললে, দ্যাখো জগন্নাথ, আজ সকালেই এক বেটা চন্দুরে আমাকে যে ঠকানটা ঠকিয়ে গিয়েছে তা আর বলবার নয়। একদিনে আমি দু-দুবার ঠকতে চাই না। তুমি মণিমোহনকে ঠিক দেখেছ তো?
–আজ্ঞে মণিমোহনকে আগে আমি অনেকবার দেখেছি, তার চেহারা কি ভুলতে পারি? তবে আগে তাকে কোনওদিন কোট পরতে দেখিনি, আজ সে কোট পরে আছে।
–হুম! পুলিশের চোখে ধোঁকা দেবার চেষ্টা আর কি? আরে বাবা, এত সহজে কি পুলিশকে ফাঁকি দেওয়া যায়?
মানিক বললে, বিশেষ করে আমাদের সুন্দরবাবুকে!
সে কথা সুন্দরবাবু গায়ে মাখলেন না।
হঠাৎ জগন্নাথ চমকে চাপা-গলায় বলে উঠল, বড়বাবু, বড়বাবু, ওই দেখুন মণিমোহনকে। আমাদের দিকেই আসছে!
সুন্দরবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, সবাই গাছ কিম্বা ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দাও। এত সহজে কেল্লা ফতে! বরাত ভালো!
মণিমোহন নতমুখে অসঙ্কোচে এগিয়ে এল, কোনও সন্দেহ করতে পারলে না। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, একহারা কিন্তু বলিষ্ঠ দেহ। মুখশ্রীও মন্দ নয়।
হঠাৎ চারদিক থেকে পুলিশের দল তাকে ঘিরে ফেলল। ভ্যাবাচাকা খেয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সুন্দরবাবু বললেন, বাবাজি, এখন ভিজে বেড়ালের মতো আমাদের সঙ্গে সুড়সুড় করে আসবে কি?
–কোথায়?
–আমাদের পোশাক দেখে বুঝতে পারছ না, আমরা তোমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই?
–আপনারা তো পুলিশ।
–আর তুমি তো মণিমোহন বসু?
–আজ্ঞে না, এ-নাম আমি জীবনে শুনিনি।
জগন্নাথ এগিয়ে এসে বললে, না, তুমিই মণিমোহন। তোমাকে আমি খুব চিনি।
আমার নাম ভদ্রেশ্বর ভদ্র।
–হুম্! আবার নাম ভাড়ানো হয়েছে? কিন্তু ও-পাঁচটা খুবই পুরোনো, ধোপে টাকে । ভদ্রেশ্বর ভদ্র! কোনও আধুনিক ভদ্রলোকই ও-রকম নাম ধারণ করতে পারে না। যাক ও কথা। এখন আমার প্রশ্নের জবাব দাও দেখি। এ বাগানবাড়ির মালিক নিশ্চয়ই তুমি নও?
না। আমি ভাড়াটে। বাগানবাড়ির মালিক হচ্ছেন চন্দ্রনাথবাবু।
–কে?
–বাবু চন্দ্রনাথ রায়। তিনি শালখেয় থাকেন।
সুন্দরবাবু একটি ছোটখাটো লাফ মেরে বললেন, শুনছ জয়ন্ত? এখানেও আবার সেই অলক্ষুণে চন্দুরে। বাবু ভদ্রেশ্বর, তাহলে তুমি মণিমোহন ছাড়া আর কেউ নও!
–আমি ভদ্রেশ্বর ভদ্র।
–বেশ তোমার ভদ্রতার দৌড় কত বুঝতে দেরি লাগবে না। বাড়িখানা তুমি ভাড়া নিয়েছ কেন?
আমার মিছরির কারখানা আছে। আর আছে আমার এক বন্ধুর মোটরের গ্যারেজ। সেখানে মোটর মেরামত হয়। আমি তার অংশীদার।
তাই নাকি মণিমোহন? তুমি এখন একজন বিজনেসম্যানের ভূমিকায় অভিনয় করতে চাও।
মণিমোহন হাসতে লাগল।
সুন্দরবাবু খেপে গিয়ে বললেন, কে তোমাকে অমন করে হাসতে শিখিয়ে দিলে? আজ সকালে চন্দুরেটাও ঠিক ওইরকম হাড় জ্বালানো হাসি হেসে আমাকে ঠাট্টা করেছে। আর তুমি হাসবেই বা কেন? পুলিশ কি হাস্যকর জীব?
মণিমোহন বললে, ভদ্রেশ্বরের ঘাড়ে মণিমোহন নাম চাপিয়ে দিলে ভদ্রেশ্বরের হাসি পাবে না কেন?
তুমি যে মণিমোহন সেটা থানায় গিয়ে আমিই প্রমাণ করে দেব। এই বাড়িতে আরও কত লোক আছে?
মণিমোহন বললে, আজ রবিবার, কারখানা বন্ধ। বাড়ির ভিতর ঝি চাকর রাঁধুনি ছাড়া আর কেউ নেই।
সুন্দরবাবু তার সহকারী ইনস্পেক্টরকে ডেকে বললেন, তুমি লোকজন নিয়ে খানাতল্লাশি করো। বাড়ির ভিতর থেকে কাউকে বাইরে বেরুতে দিও না। আর জগন্নাথ
আজ্ঞে!
–তুমি দশ নম্বর বলাই শীল স্ট্রিটে মণিমোহনের বাড়িতে যাও। মণির বাবা মহেন্দ্রবাবুকে গিয়ে বলবে তার ছেলেকে পাওয়া গিয়েছে। তাঁকে সঙ্গে করে থানায় ফিরে যাবে। চলো মণিমোহন, তুমি কত বড় ঘুঘু এইবার সেই পরীক্ষাই হবে। এসো জয়ন্ত, এসো মানিক।
