কারণ? জলখাবার খাওয়াবার জন্যে নয়! ধরুন অকারণেই।
এতক্ষণ পরে চন্দ্রনাথ যেন হারিয়ে ফেলল নিজের সমস্ত দৃঢ়তা ও নিশ্চিন্ত। কাতর কণ্ঠে বললে, অকারণে আমাকে থানায় নিয়ে গিয়ে লাভ কী সুন্দরবাবু?
সুন্দরবাবু নিজের বাহু বিস্তার করে সবলে ধারণ করলেন চন্দ্রনাথের দক্ষিণ বাহুঁ। তারপরে বললেন, হুম! এখন সুড়সুড় করে আমার সঙ্গে চলুন তো। পরে ভাবা যাবে লাভ-লোকসানের কথা। আসি জয়ন্ত, আসি মানিক। খানিক পরেই ফোনে তোমাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করব। আসুন, অমাবস্যার দৃশ্যমান চন্দ্র।
চন্দ্রনাথ কলের পুতুলের মতো চলে গেল সুন্দরবাবুর সঙ্গে।
জয়ন্ত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, মানিক, এইবারে আমরা মতামত বিনিময় করি এসো। চন্দ্রনাথ লোকটাকে তোমার কেমন লাগল?
ভালো লাগল না।
–ঠিক। একেবারে পয়লা নম্বরের অপরাধীর চেহারা! আর একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ?
কী।
চন্দ্রনাথ যতক্ষণ এখানে ছিল, একবারও সোজাসুজি তোমার আর আমার দিকে তাকায়নি। অথচ সে ছিল আমাদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন। কারণ মাঝে মাঝে ওই বড় আয়নাখানার দিকে আড়চোখে চেয়ে দেখে নিচ্ছিল আমাদের।
–কিন্তু সে এখানে এসেছিল কেন?
–অভিনয় করতে।
অভিনয় করতে?
–হ্যাঁ। আর সেই সঙ্গে নিজেকে নিরপরাধ বলে প্রমাণিত করতে।
কিন্তু এ ভয়ও তো তার থাকা স্বাভাবিক যে ঘটনাস্থলে পাওয়া তৃতীয় ব্যক্তির পদচিহ্নের সঙ্গে তার নিজের পদচিহ্নও মিলে যেতে পারে?
তা পারে! এইখানেই আমার কেমন খটকা লাগছে। এমন সম্ভাবনার কথা যে তারও মাথায় জাগেনি, তাকে তো দেখে এতটা নির্বোধ বলে মনে হল না! সুন্দরবাবু তো ওই জন্যেই তাকে থানায় ধরে নিয়ে গেলেন।
–আর থানায় যাবার নামেই সে ভয়ে কীরকম জড়োসড়ো হয়ে পড়ল, লক্ষ করেছ তো?
–তা আবার করিনি? কিন্তু তা হচ্ছে অভিনয়, অভিনয়, অভিনয়। আসলে সে একটুকুও ভয় পায়নি।
কেমন করে জানলে?
–এখানে আসবার আগে সে নিজেই সুন্দরবাবুর খোঁজে থানায় গিয়ে হাজির হয়েছিল। সুতরাং থানায় যাবার নামে তার ভয় পাবার কোনওই কারণ থাকতে পারে না। সে ভয় পায়নি, ভয়ের অভিনয় করছিল।
–কেন?
–বোধহয়, সুন্দরবাবুকে সে একেবারে অপদস্থ করতে চায়। আমার মনে হয়, সে ভালো করেই জানে যে, থানায় গিয়ে সুন্দরবাবু তার পদচিহ্ন পরীক্ষা করবেন।
বল কী হে?
হ্যাঁ। শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে জানো? ঘটনাস্থলের পদচিহ্নের সঙ্গে মিলবে না তার পদচিহ্ন। পুলিশ বনবে বোকা। সে হবে সমস্ত সন্দেহ থেকে মুক্ত। নিশ্চয় এই উদ্দেশ্য নিয়েই সে আজ সুন্দরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। নইলে তার এই অভাবিত আবির্ভাবের কোনও অর্থই হয় না, যাকগে ও-সব কথা। সুন্দরবাবু তো এখনও ফোন করলেন না দেখছি। আপাতত আমরা কী করি বলো তো? দু-এক চাল দাবা বোড়ে খেলবে নাকি?
–আপত্তি নেই।
চলল খেলা। চল্লিশ মিনিট পরে প্রথম চাল খেলা শেষ হল। আর এক চালের জন্যে। তারা খুঁটি সাজাচ্ছে, এমন সময়ে বেজে উঠল টেলিফোন।
রিসিভারটা তুলে নিয়ে জয়ন্ত বললে, হ্যালো?
–আমি সুন্দরবাবু।
–খবর কী?
হুম, সব গুলিয়ে গেল।
তা তো যাবেই।
–মানে?
–মানে চন্দ্রনাথের পদচিহ্ন পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হয়নি।
–কেমন করে জানলে?
–খুব সহজে। দুইয়ে-দুইয়ে যোগ দিয়ে দেখলুম, চার হল।
–ধেৎ, হেঁয়ালি ভালো লাগে না! দস্তুরমতো অপদস্থ হয়েছি।
ব্যাপারখানা কী?
–ঘটনাস্থলে তৃতীয় ব্যক্তির যে জুতোর ছাপ পাওয়া গিয়েছে, চন্দ্রনাথের জুতোর ছাপের চেয়ে তা বড়। চন্দুরে রাসকেলটা আমার মুখের ওপরে কলা দেখিয়ে হাড় জ্বালানো হাসি হাসতে-হাসতে চলে গেল।
–এটুকু তো তিন-চার মিনিটের ব্যাপার। আমাকে ফোন করতে আপনার এত দেরি হল কেন?
–হঠাৎ আরও দুটো খবর পেলুম। দ্বিতীয় খবরটা বিশেষরূপে উল্লেখযোগ্য।
–যথা
–আমার সহকারী সুনীলকে নন্দলালের পাড়ায় তদন্ত করতে পাঠিয়েছিলুম। সে জানালে, ও-পাড়ার এক মণিহারি দোকানের মালিক হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যাবেলায় দেখেছিল, নন্দ পথ। দিয়ে যাচ্ছে, এমন সময়ে একখানা মোটরগাড়ি তার কাছে এসে থামে। গাড়ির ভিতর থেকে মণিমোহন মুখ বাড়িয়ে নন্দকে ডাকে। নন্দ গাড়িতে ওঠে, গাড়িখানা চলে যায়।
সুন্দরবাবু, আমার আন্দাজের সঙ্গে অনেকটা মিলছে না?
–তা মিলছে।
তারপর?
–গাড়ির ভিতর দুইজন লোক ছিল, মণিমোহন আর চালক। দোকানি কিন্তু চালকের দিকে নজর দেয়নি, তাকে শনাক্ত করতে পারবে না।
কালো রঙের বুইক-সিডান গাড়ি?
–দোকানি বললে, কালো রঙের সিডান গাড়ি বটে, কিন্তু বুইক, কি ফোর্ড, কি অস্টিন, তা বোঝবার মতো জ্ঞান তার নেই।
–গাড়ির নম্বর?
–দোকানি দেখেনি।
সুন্দরবাবু, এ খবরে এইটুকু জানা গেল, আমার অনুমান নিতান্ত মিথ্যা নয়। এর ওপর নির্ভর করে আমরা চন্দ্রনাথের কিছুই করতে পারব না, কিন্তু ধাবমান হতে পারব মণিমোহনের পিছনে।
–আরও একটা উপায় হয়েছে।
কীরকম?
–দ্বিতীয় খবরটা শুনলেই বুঝতে পারবে। আমাদের এক চর এসে খবর দিলে, খিদিরপুর ছাড়িয়ে গঙ্গার ধারে একখানা বাগানবাড়ির ভিতরে স্বচক্ষে সে মণিমোহনকে প্রবেশ করতে দেখেছে।
কবে?
–আজই ভোরবেলায়।
–এখন কী করতে চান?
বাড়িটাকে চারদিকে থেকে পাহারা দেবার জন্য জনকয় লোক পাঠিয়েছি। আমি সদলবলে যাত্রা করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি। তোমরাও আসছ তো?
