এ সুযোগ আমি ছাড়লুম না। হঠাৎ বুকের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে জোরে তার গলা টিপে ধরলুম! দু-চারবার গোঁ-গোঁ করেই সে অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর
পূর্ণবাবু বিস্মিত স্বরে বলে উঠলেন, বল কি হে, তুমি অনায়াসেই বুড়োটার গলা টিপে ধরলে?
বিধু বললে, তখন তা ছাড়া আর কি উপায় ছিল বলো? যে অবস্থায় আমি পড়েছিলুম, আমাকে বাঁচতে হবে তো?
পূর্ণবাবু বিরক্ত ভাবে বললেন, তাহলে নিজেকে বাঁচাবার জন্যে অনায়াসেই তুমি অন্য কারুকে খুন করতে পারো? কি অন্যায়?
বিধু উত্তেজিত ভাবে উঠে দাঁড়িয়ে কর্কশ কণ্ঠে বললে, তা পারি। আত্মরক্ষা হচ্ছে জীবনের ধর্ম। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে নরহত্যা করা আমি অপরাধ বলে মনে করি না। এর ভেতরে তুমি অন্যায়টা দেখলে কোথায়?
পূর্ণবাবু খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, বিধু, তোমার স্বভাব ঢের বদলে গেছে দেখছি। কিন্তু সে-কথা থাক। তুমি যা বলছিলে বলো।
বিধু আবার আরম্ভ করলে–
খানিকটা দড়ি নিয়ে বুড়োর হাত-পা আমি বেঁধে ফেললুম। তার মুখে কতকগুলো ন্যাকড়া গুঁজে দিলুম, যেন হঠাৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে চেঁচিয়ে না ওঠে! তারপর নিজের মনের মতন পোশাক বেছে নিয়ে পরে ফেললুম। পরচুল, দাড়ি-গোঁফ, একখানা ঠুলি চশমা নিয়ে মুখের অদৃশ্য অংশ ঢাকা দিলুম! একটা মুখোশের নাক কেটে নিয়ে নিজের মুখের যথাস্থানে বসিয়ে দিলুম। তারপর মাথা থেকে গলা পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করে একখানা আরসির সামনে পরীক্ষা করে দেখলুম, আমার মুখখানা দেখতে অদ্ভুত হলেও অমানুষিক হয়নি! বুড়োর বাক্স হাতড়ে দুশো পঁচিশ টাকা পেলুম। নোট ও টাকাগুলো পকেটে পুরে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম।
পূর্ণবাবু আবার বললেন, পরের টাকা নিতে তোমার সংকোচ হল না?
বিধু বললে, কিছুমাত্র না! টাকা যার কাছে থাকে তারই হয়! লোকে তা বুঝলে এতদিনে পৃথিবীতে আর গরিব থাকত না! সেখান থেকে এক হোটেলে ঢুকে আগে পেটের ক্ষুধাকে শান্ত করলুম। তারপর কেমন করে আবার নিজের বাসায় ফিরে গিয়ে আমার পুঁথিপত্র ও ওষুধের শিশি-বোতলগুলো শ্রীপুরে পাঠাবার ব্যবস্থা করে নিজেও এখানে এসে হাজির হলুম, সে-সব কথা আর না বললেও চলবে।
শোনো পূর্ণ! আমি হচ্ছি অদৃশ্য মানুষ! কিন্তু নিরাকার হবার আগে অদৃশ্য হওয়ার যে সব আনন্দ মনে-মনে কল্পনা করেছিলুম, আজ সে-সব আকাশ কুসুমের মতো মিলিয়ে গিয়েছে! এখন আমার মতো অসহায় আর কেউ নেই! আমাকে সবাই ভয় করে, ভীষণ শত্রু বলে মনে করে! কোনও সাধারণ মানুষের সাহায্য না পেলে পৃথিবীতে আমার পক্ষে বেঁচে থাকাই অসম্ভব। সেই জন্যেই বংশীবদনকে আমার সঙ্গী করেছিলুম, কিন্তু সে হতভাগাও আমার পুঁথিপত্র ও টাকা চুরি করে আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে!
পূর্ণবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এখন কী করতে চাও?
বিধু বললে, মনে করছি এখন তোমার এখানেই কিছুদিন থাকব। ভগবান তোমার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিয়েছেন। মনে করলেই আমরা দুজনেই দুজনের অনেক উপকার করতে পারি। তুমি আমাকে আশ্রয় দেবে, আমাকে লুকিয়ে রাখবে, আর আমি দুনিয়ার ঐশ্বর্য লুটে নিয়ে এসে তোমার কাছে সঁপে দেব! তুমি আমাকে সাহায্য করবে পূর্ণ?
পূর্ণবাবু চুপ করে বসে রইলেন।
চুপ করে রইলে যে? পূর্ণ, তুমি কি আমার কথায় রাজি নও?
পূর্ণবাবু নীরবে যেন কি শুনতে লাগলেন।
পুর্ণ, নীচে যেন দরজা খোলার শব্দ হল না?
কই, আমি তো শুনতে পাইনি!
বিধু খানিকক্ষণ কান পেতে শুনলে? তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, উঁহু, সিঁড়ির উপরে নিশ্চয়ই কাদের পায়ের শব্দ হচ্ছে, কারা ওপরে আসছে?
পূর্ণবাবুও উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কে আবার আসবে?
কিন্তু বিধুর সন্দেহ দূর হল না! সে তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু পূর্ণবাবুও তাড়াতাড়ি এগিয়ে তার আগেই দরজার কাছে গিয়ে হাজির হলেন।
বিধু গর্জন করে বললেন, বিশ্বাসঘাতক!–এবং তার পরেই সে পূর্ণবাবুর উপরে লাফিয়ে পড়ল ও দুই হাতে সবলে তার গলা টিপে ধরে তাকে একটানে মেঝের উপরে আছড়ে ফেললে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে পূর্ণবাবু তখনি উঠে বসলেন এবং সেই অবস্থায় দেখলেন, তার চোখের সামনে জামাকাপড়গুলো টান মেরে খুলে ফেলে বিধু আবার নিরাকার হয়ে গেল!
থানার দারোগা পাহারাওয়ালাদের সঙ্গে সিঁড়ি বয়ে তাড়াতাড়ি উপরে আসছিলেন এমন সময় আচমকা তার দেহের উপরে হুড়মুড় করে একটা অদৃশ্য ভার এসে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনিও হলেন একেবারে কুপোকাত!
দারোগা-মশাই যখন আবার দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠতে পারলেন, তখন দেখলেন পূর্ণবাবু রক্তাক্ত মুখে বেগে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছেন।
তিনি দারোগাবাবুর সামনে এসে বললেন, অদৃশ্য মানুষ আবার আমাদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে!
.
দ্বাদশ । অদৃশ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
পূর্ণবাবু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, আপনারা বুঝি ঢাক-ঢোল বাজিয়ে চোর ধরতে যান?
দারোগাবাবু থতমতো খেয়ে বললেন, কেন বলুন দিকি?
পূর্ণবাবু আরও রেগে বললেন, কেন, এখনও তা বুঝতে পারছেন না? আপনারা এমন গোলমাল করে বাড়ির ভেতর ঢুকেছেন যে, সে আগে থাকতেই সাবধান হয়ে পালিয়ে গেল!
দারোগাবাবু অপ্রতিভভাবে বললেন, তাই তো, বড় ভুল হয়ে গেছে!
