আজ্ঞে হ্যাঁ। চন্দ্রনাথ রায়।
সুন্দরবাবু বাঘের মতো লাফিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, হুম!
.
অভিনেতা চন্দ্রনাথ
সত্য-সত্যই কল্পনাতীত। পলাতক আসামি চন্দ্রনাথ নিজেই দেখা করতে এসেছে তাদের সঙ্গে। মামলাটার গোড়াতেই কোনও গলদ নেই তো? অবাক হয়ে ভাবতে লাগল জয়ন্ত ও মানিক।
সুন্দরবাবু খুশি-ভরা গলায় বললেন, আমাদের ভাগ্য ভালো। শিকার নিজেই জালে পড়তে চায়।
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু এখন চন্দ্রনাথকে নিয়ে কী করবেন?
–আগে করব গোটা কয় প্রশ্ন। তারপর তাকে থানায় নিয়ে গিয়ে ঘটনাস্থলে পাওয়া তৃতীয় ব্যক্তির পদচিহ্নের সঙ্গে তার জুতো মিলিয়ে দেখব।
জয়ন্ত বললে, মধু, বাবুকে এখানে নিয়ে এসো। মধুর প্রস্থান।
অনতিবিলম্বেই ঘরের ভিতরে চন্দ্রনাথের আবির্ভাব।
সুন্দরবাবু লক্ষ করে দেখলেন মণিমোহনের পিতার বর্ণনার সঙ্গে তার চেহারা মিলে। যায় অবিকল। প্রায় ছয় ফুট লম্বা বলিষ্ঠ ও ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দেহ। নাক খাদা, কুকুতে চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মুখে গোফদাঁড়ি নেই। পরনে প্যান্ট-কোট, হাতে বেজায় মোটা লাঠি। বাঁ-হাতে আধখানা কাটা কড়ে আঙুল।
দিব্যি নিশ্চিন্তভাবে ও সপ্রতিভ মুখে ঘরে ঢুকেই চন্দ্রনাথ বললে, আমি সুন্দরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
–আমার সঙ্গে? কিন্তু এখানে কেন? এটা কি আমার ডেরা?
–মোটেই নয়, মোটেই নয়। কে না জানে বাঘ থাকে বনে, আর পুলিশ থাকে থানায়? আমি থানাতেও ধরণা দিয়েছিলুম। সেখান থেকেই পেয়েছি এখানকার ঠিকানা।
লোকটার প্রগলভতা দেখে সুন্দরবাবুর মনে ক্রোধের সঞ্চার হল। কিন্তু সে ভাব দমন করে তিনি শুধোলেন, আপনার নাম চন্দ্রনাথ রায়?
–তাই তো আমি জানি, লোকেও আমাকে ওই বলেই ডাকে বটে।
তার কথাবার্তার ধরন-ধারণ বাড়িয়ে তুললে সুন্দরবাবুর ক্রোধের মাত্রা। বেশ একটু ঝাঝালো গলায় বললেন, মহাশয়ের পিতৃদেব কি অন্ধ ছিলেন?
উঁহুঁ।
–তবে মশাইকে কি স্বচক্ষে দেখে তিনি আপনার নাম রাখেননি?
চন্দ্রনাথ নীরসকণ্ঠে হেসে উঠল-হা-হা-হা-হ্যাঁ। বললে, ঠিক কথা। আমার গায়ের রংটা চাঁদের মতো নয় বটে! হাঁ, বাবার যে ভ্রম হয়েছিল সে কথা অস্বীকার করা চলে না। কিন্তু কী করব বলুন, পিতা হচ্ছেন দেবতাস্থানীয়, পুত্র হয়ে তার ভ্রম আর শোধরাবার চেষ্টা করিনি।
–বেশ, তাহলে বাপের সুপুত্রের মতো ওই চেয়ারখানার ওপরে একটু বসুন দেখি, আমি গোটাকয় প্রশ্ন করতে চাই।
চেয়ারখানা হড়-হড় করে সুন্দরবাবুর খুব কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে চন্দ্রনাথ বসে পড়ল। তারপর মোটা লাঠিগাছা পদযুগলের মাঝখানে রেখে তার ওপরে দুই হস্ত স্থাপন করে বললে, আপনার প্রশ্নগুলো শ্রবণ করবার জন্যে আমার দুই কর্ণ অতিশয় ব্যগ্র হয়ে উঠেছে।
এ কীরকম ঢ্যাঁটা অপরাধী, পুলিশ দেখে দূরে সরে দাঁড়ানো দূরের কথা, পুলিশের গা ঘেঁষে বসতে ভয় পায় না। ভালো কথা নয় তো, যা দিনকাল পড়েছে, সাবধানের মার নেই। সুন্দরবাবু নিজেই তফাতে সরে গিয়ে দখল করলেন অন্য একখানা চেয়ার।
চন্দ্রনাথ হাসতে লাগল মুখ টিপে টিপে।
সুন্দরবাবু বললেন, হঠাৎ আমার সঙ্গে আপনার দেখা করবার শখ হল কেন?
–শুনলুম, সেদিন আমার বাড়িতে আপনি বেড়াতে গিয়েছিলেন!
–বেড়াতে নয়, আপনাকে খুঁজতে।
–বেশ তাই! কিন্তু কেন?
নন্দলাল মিত্র খুন হয়েছে জানেন?
–কে নন্দলাল?
–একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন যে। মণিমোহন বসুর বিশেষ বন্ধু নন্দলালকে চেনেন নাকি?
–না, আমি কেবল মণিমোহনকেই জানি।
–বটে। গেল পঁচিশ তারিখে মণিমোহনের সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?
না।
ওই তারিখে আপনি কোথায় ছিলেন?
–সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসাতেই ছিলুম। তারপর হঠাৎ এক আত্মীয়ের মারাত্মক অসুখের খবর পেয়ে তাড়াতাড়ি দেশে চলে যেতে হয়।
–চাকর-বামুন-দারোয়ান সবাইকে নিয়ে?
নিশ্চয়ই! একলা মানুষ, আমাকে দেখবে কে?
আপনার দেশ কোথায়?
–এখান থেকে চল্লিশ মাইল দুরে ভজনপুর গ্রামে।
আপনার সট গান আছে?
আছে! অন্যরকম বন্দুকও আছে।
–মণিমোহন আপনার বন্ধু?
–হ্যাঁ। নতুন বন্ধু।
–তাকে আপনি একখানা চিঠি লিখেছিলেন, পঁচিশ তারিখে আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে?
হ্যাঁ।
–সে আপনার সঙ্গে দেখা করেছিল?
না।
–ওই তারিখের পর তার সঙ্গে আপনার আর দেখা হয়েছে?
না।
–সে এখন কোথায় আছে?
জানি না।
তার আর কোথায়-কোথায় আসা-যাওয়া আছে?
ভগবান জানেন।
ঘটনাস্থলে তিনজন লোকের পদচিহ্ন পাওয়া গেছে। মণিমোহনের আর নন্দলালের। কিন্তু তৃতীয় পদচিহ্নের অধিকারী কে, তা আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি।
শুনে দুঃখিত হলুম।
–আপনার দুঃখ নিয়ে আপনি চুলোয় গেলেও আমি দুঃখিত হব না! হুম! আমি এখন ভাবছি, কে এই তৃতীয় ব্যক্তি?
–বলতে পারব না, আমি গনকার নই।
–আরে গেল, এ-প্রশ্ন কি আপনাকে করছি? আমি কথা কইছি নিজের সঙ্গেই। নিজের মনের ভিতরেই আমি উত্তর খোঁজবার চেষ্টা করছি।
–চেষ্টা করুন। আপনার আর কোনও প্রশ্ন আছে?
–আপাতত নাই।
–তাহলে আমি গাত্রোত্থান করতে পারি?
নিশ্চয়ই! এইবারে আপনাকে গাত্রোত্থান করতে হবেই।
তবে এই গাত্রোত্থান করলুম।
সুন্দরবাবুও আসন ত্যাগ করে বললেন, এইবারে আপনাকে আমার সঙ্গে যাত্রা করতে হবে।
–কোথায়?
–থানায়।
চন্দ্রনাথ সভয়ে বলে উঠল, থানায় কেন?
যথাসময়েই সেটা জানতে পারবেন!
–আপনার সব কথারই জবাব তো দিলুম। আবার আমাকে থানায় টেনে নিয়ে যাবার কারণ কী?
