কিন্তু আপনি আরও কিছুদূর অগ্রসর হতে পেরেছেন। পদ চিহ্নের ছাপ বিশেষভাবে প্রমাণিত করেছে দুটো সত্য। প্রথমত, ঘটনাস্থলে মণিমোহনের উপস্থিতি। দ্বিতীয়ত, হত ব্যক্তি নন্দ ছাড়া আর কেউ নয়। মামলাটা অনেকখানি হালকা হয়ে এল নাকি?
সুন্দরবাবু বললেন, কিন্তু মামলাটার আর-এক দিক আরও ভারী হয়ে উঠছে।
কীরকম?
–বলেছি তো, নন্দ ছিল কে সরকারের বিখ্যাত জুয়েলারি ফার্মের ক্যাশিয়ার। সেখানে এক নতুন কাণ্ড হয়ে গিয়েছে।
বুঝেছি। চুরি।
সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বললেন, কেমন করে বুঝলে?
জয়ন্ত রুপোর ডিবে বার করে এক টিপ নস্য গ্রহণ করলে। মানিক কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাল। সে জানে, এই নস্য গ্রহণটা হচ্ছে তার বন্ধুর বিশেষ আনন্দের লক্ষণ।
সুন্দরবাবু আবার বললেন, কেমন করে বুঝলে তুমি?
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, এটা আমার আন্দাজ মাত্র।
বা রে, এমন যুক্তিহীন আন্দাজের কোনও কারণ নেই!
কারণ আছে বইকী। আমার আন্দাজ মোটেই যুক্তিহীন নয়। লোকে অকারণে নরহত্যা করে না। কিন্তু গোড়া থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আমি উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখন বেশ বোঝা যাচ্ছে যে, নন্দ মারা পড়েছে ওই টাকার জন্যেই। যদিও হত ব্যক্তি বিখ্যাত এক জুয়েলারি ফার্মের ক্যাশিয়ার শুনে একটা সন্দেহ আমার মনে উঁকি মারছিল! এখন জানা গেল, আমার সন্দেহ অমূলক নয়। সুন্দরবাবু, আন্দাজে আমি আরও একটা কথা বলতে পারি।
–পারো নাকি? বলে ফ্যালো।
–কে সরকারের ফার্ম থেকে মোটারকম চুরি হয়ে গিয়েছে, আর চুরির জন্যে দায়ী ওই হত নন্দলাল।
সুন্দরবাবু বিস্ফারিত চক্ষে তালে-তালে তিনবার তালি দিয়ে বললেন, ঠিক! ঠিক! বা রে আন্দাজ! বা রে জয়ন্ত!
জয়ন্ত বললে, এখন আসল ব্যাপারটা খুলে বলুন দেখি! কে সরকার নিজে থানায় অভিযোগ করে এসেছিল?
–কিসের অভিযোগ?
–চুরি বলেই ধরে নাও! চুরিটা হয়েছে হত্যাকাণ্ডের দিনেই। কে সরকারের বসতবাড়ি আর দোকান এক জায়গায় নয়। তার দোকান বন্ধ হত সন্ধ্যার মুখে। সেদিন দোকান বন্ধ হবার আগেই জরুরি কাজের জন্য তাকে বাড়িতে ফিরতে হয়েছিল। কথা ছিল, দোকানের ক্যাশ নিয়ে দোকান বন্ধ করে নন্দ তাঁর বাড়িতে জমা দিয়ে আসবে। কিন্তু নন্দ সেদিন ক্যাশ নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়েই একেবারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
টাকার পরিমাণ কত?
–তেরো হাজার পাঁচশো পঞ্চাশ।
নন্দের সম্বন্ধে কে সরকারের ধারণা কী?
–অত্যন্ত উচ্চ। বললে, নন্দ অতিশয় বিশ্বাসী আর সৎচরিত্র। তার দ্বারা কোনওরকম অসৎ কাজ হওয়া অসম্ভব।
–ঠিক। আমারও ওই বিশ্বাস।
জয়ন্ত, আরও একটা এমন ব্যাপার জানা গিয়েছে, যা তুমি কিছুতেই আন্দাজ করতে পারবে না।
–পদে-পদে আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার অভ্যাস আমার নেই।
লাশের পরনে যে গেঞ্জি আর কাপড় ছিল তা নন্দের নয়, মণিমোহনের।
–শুনে বিস্মিত হলুম না। নন্দের পরনে কোট বা অন্য কোনওরকম জামাও ছিল না, অপরাধীরা তা খুলে নিয়ে গিয়েছে, প্রথমদিনেই আন্দাজে এ কথাটা আপনাকে বলেছিলুম। সুন্দরবাবু, দোকান থেকে নন্দ সেদিন বাসায় ফিরে এসেছিল?
হ্যাঁ, তার বাসা দোকান থেকে কে সরকারের বাড়িতে যাবার পথেই পড়ে। বাসায় এসে হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খাবার খেয়ে আবার সে বেরিয়ে যায়–
–হ্যাঁ, মালিকের বাড়িতে টাকাগুলো পৌঁছে দেবার জন্যে। তার পরের ঘটনাগুলোও আমি কিছু কিছু আন্দাজ করতে পারছি।
–হুম, আবার আন্দাজ!
নন্দ পথ দিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ মণিমোহনের সঙ্গে দেখা। আমার বিশ্বাস, সে ছিল শালিখার চন্দ্রনাথের কালো রঙের বুইক-সিডান গাড়িতে, আর গাড়ি চালাচ্ছিল চন্দ্রনাথ নিজেই। মণিমোহনের আহ্বানে নন্দ গাড়িতে এসে ওঠে। নন্দের কাছে কত টাকা আছে প্রকাশ পায়। তারপরের ব্যাপারগুলো ঠিক আন্দাজ করতে পারছি না। নন্দ গাড়িতে ওঠে সন্ধ্যার সময়ে, কিন্তু মারা পড়ে অন্তত রাত দুটোর পরে! মাঝের কয়েক ঘণ্টার হিসাব হত্যাকারী ধরা না পড়লে জানা যাবে না! নন্দকে হত্যা করে চন্দ্রনাথ আর মণিমোহন। আমার বিশ্বাস আসল। হতাকারী হচ্ছে চন্দ্রনাথই, মণিমোহন বোধহয় স্বহস্তে বন্ধু-হত্যা করেনি। তারপর মৃতদেহের জামাকাপড় খুলে পরিয়ে দেওয়া হল মণিমোহনের জামাকাপড়। লাশের মুখ নিশ্চিহ্ন, তার দৈর্ঘ্য, রং আর গড়নপিটন প্রায় মণিমোহনের মতোই, তার পরনেও রইল মণিমোহনের জামাকাপড়। সুতরাং সেটা মণিমোহনের দেহ বলেই শনাক্ত হওয়া স্বাভাবিক, সকলে বুঝবে, কোনও অজানা। ব্যক্তি অজানা কারণে মণিমোহনকে হত্যা করেছে। ওদিকে পুলিশ ভাবত নন্দ জুয়েলারি ফার্মের টাকা চুরি করে পলাতক হয়েছে। অপরাধীরা খুব মাথা খেলিয়ে প্ল্যান তৈরি করেছিল বটে, কিন্তু সব ব্যর্থ করে দিলে তুচ্ছ একটা জডুল আর কতগুলো পায়ের দাগ। সুন্দরবাবু এইবার
আপনার মামলাটা পরিষ্কার হয়ে গেল তো?
সুন্দরবাবু বললেন, তা তো গেল দেখছি। কিন্তু জয়ন্ত বাধা দিয়ে বলল, কিন্তু আমার আর একটা আন্দাজ, এই কাজ হাসিলের পর চন্দ্রনাথ হয়তো মণিমোহনকেও হত্যা করেছে।
হুম, আন্দাজেই তুমি কেল্লা ফতে করবে দেখছি। এখন চন্দ্রনাথকে হস্তগত করবার উপায়টাও আন্দাজে বাতলে দিতে পারো?
এমন সময় মধু ঘরে ঢুকে বললে, শালখে থেকে একটি বাবু দেখা করতে এসেছেন।
জয়ন্ত সচমকে বললে, শালখে থেকে? নাম বলেছে?
