যুবক হাত জোড় করে মিনতি করে বললে, দয়া করুন, একটিবার দেখতে দিন।
সুন্দরবাবু নাচারভাবে বললেন, আপনি তো ভারি ছিনেজোঁক দেখছি। বেশ চলুন; নয়ন সার্থক করুন।
মৃতদেহের ওপরে অর্ধ মিনিট কাল চক্ষু বুলিয়েই যুবক চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
সুন্দরবাবু বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, আরে গেল, খামোখা কান্নাকাটি কেন?
–এই তো আমার ভাই নন্দলালের দেহ! যা ভেবেছি তাই, আমাদের সর্বনাশ হয়েছে!
–আরে আপনি পাগল না কী!
–আমি পাগল নই মশাই, পাগল নই! বিশ্বাস না হয়, ওর কাপড় তুলে দেখুন, জানুর ওপরে দুই ইঞ্চি লম্বা কালো জডুলের দাগ আছে।
অবিশ্বাস ভরে সুন্দরবাবু এগিয়ে গেলেন! কাপড় সরানো হল। জানুর ওপরে সত্য সত্যই রয়েছে দুই ইঞ্চি লম্বা কালো জডুল-চিহ্ন।
ধাঁ করে তার মাথায় জাগল একটা নতুন সন্দেহ। আগ্রহের সঙ্গে তিনি শুধোলেন, আপনার ভাইয়ের নাম নন্দলাল?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
নন্দলাল মিত্র?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাড়ি পাঁচ নম্বর রায় রোডে?
হ্যাঁ।
–তার এক বিশেষ বন্ধুর নাম মণিমোহন বসু।
–হুঁ।
সুন্দরবাবু টুপি খুলে নিজের টাক চুলকোতে-চুলকোতে হতভম্বের মতো বললেন, এ কি কাণ্ড রে বাবা! এটা খুনের মামলা, না হেঁয়ালির মামলা?
.
চন্দ্রনাথ রায়
প্রভাতী চায়ের আসরের জন্যে দুজন প্রস্তুত হচ্ছে, এমন সময়ে হন্তদন্তের মতো সুন্দরবাবুর প্রবেশ
জয়ন্ত শুধোলে, এ কী সুন্দরবাবু, হাঁফাচ্ছেন কেন?
–দৌড়ে দৌড়ে আসছি যে!
–দৌড়ে দৌড়ে?
–প্রায়! পাছে চা-পানের মাহেন্দ্রক্ষণটি উতরে না যায়, সেই ভয়ে সবেগে পদচালনা করছিলুম! গেল তিন দিন তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়নি, ভয় হল আসর থেকে বুঝি নাম কাটা যায়!
–তাহলে গেল তিন দিন বাড়িতে বসে চা-পান করেছেন?
–পাগল! আমার বাড়ির চা ছুঁই না। সে যেন নালতের মতো, আর দোকানের চা ও খাই না, সে যেন ঘোলাটে গঙ্গাজল! আজ তিন দিন চা খাওয়াই হয়নি।
–ব্যাপার কী?
–গড়ের মাঠের সেই হত্যাকাণ্ডের ঠেলা। হন্তদন্তের মতো খালি তদন্ত আর তদন্ত করতে হচ্ছে। সূত্রও পেয়েছি ঢের, কিন্তু সব সূত্র জোট পাকিয়ে গিয়েছে।
–আচ্ছা, আগে চেয়ারাসীন হোন, উদরদেশের দুর্ভিক্ষ নিবারণ করুন। তারপর সব কথা শুনব।
সুন্দরবাবু আসন গ্রহণ করে বললেন, আজ চায়ের সঙ্গে নতুন কোনও বিশেষত্ব আছে না কি?
বিশেষ কিছুই নয়। আমেরিকান ব্রেকফাস্ট বিস্কুট, টোম্যাটো-ওমলেট আর কড়াইশুটির কচুরি।
–ব্যস, ব্যস! ওইতেই আমি খুশি হতে পারব। সত্যি বলতে কি ভায়া বাড়ির চা আর ভালো লাগে না কেন জানো? তোমাদের বউদিটি দ্রৌপদী নন, নতুন পুরাতন যে-কোনও রন্ধনে তিনি একেবারে মুর্তিমতী নিরাশা! হুম, কথায় বলে চা-টা! চায়ের সঙ্গে কিছু কিছু টা না থাকলে চা কখনও সুখের হয়!
মানিক বললে, সুন্দরবাবু, আমাদের বউদি দ্রৌপদী হলে আপনি কি তাকে সহ্য করতে পারতেন?
-মানে?
–দ্রৌপদীর ছিল পাঁচজন স্বামী।
–ধেৎ, খালি কথার ছল ধরা। আচ্ছা, জয়ন্ত, টোম্যাটো-ওমলেট পদার্থটা কী?
–ওমলেটের ভিতর মাখনে ভাজা কুচি কুচি পেঁয়াজ আর টোম্যাটো পুর। খুব সহজ
কিন্তু খেতে মজা তো? নাম শুনেই জিভে জল আসছে। কোথায় হে শ্রীমধুসূদন, শীঘ্র দেখা দাও।
ট্রে হাতে মধু ভৃত্যের প্রবেশ। চা-পর্ব শেষ হবার আগে সুন্দরবাবু আর বাক্যালাপ করবার চেষ্টা করলেন না।
জয়ন্ত বললে, অতঃপর।
সুন্দরবাবু বললেন, তোমরা মর্গের ব্যাপারটা তো আগেই শুনেছ। বেশ, তারপর থেকেই আরম্ভ করি। শালিখার চন্দ্রনাথ রায়ের সন্ধানে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার বাসা খালি, বাহির থেকে তালাবন্ধ। খবর নিয়ে জানলুম হত্যাকাণ্ডের দিন বৈকালে একখানা কালো রঙের বুইক সিডান গাড়িতে চড়ে সে চলে গিয়েছে।
–গাড়িখানা তার নিজের?
হ্যাঁ। গাড়ি চালাত নিজেই।
বাসায় কি সে একলা থাকত?
–হ্যাঁ। অর্থাৎ চাকর-বামুন-দারোয়ান নিয়ে একলা। কিন্তু তার সঙ্গে আর সকলেও অদৃশ্য হয়েছে। এইটেই সন্দেহজনক।
জয়ন্ত খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। ধীরে ধীরে বললে, অসাধারণ মামলা বটে! মহেন্দ্রবাবু লাশ দেখে বলছেন সেটা তাঁর পুত্র মণিমোহনের মৃতদেহ। আর একজন বলছে, সে দেহটা হচ্ছে তার দাদা নন্দলালের। দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা মতো লাশের জানুর কাপড় তুলে দেখা গিয়েছে দুই ইঞ্চি লম্বা কালো জডুলের দাগ। মনে হচ্ছে দ্বিতীয় ব্যক্তির কথাই ঠিক! কারণ লাশের মুখ নেই–মহেন্দ্রবাবুর ভ্রম হওয়া অসম্ভব নয়।
সুন্দরবাবু বললেন, শুনলুম মণিমোহনের আর নন্দলালের দেহের রং উচ্চতা আর গড়ন পিটন নাকি প্রায় একইরকম!
–এখানে প্রশ্ন ওঠে অনেকগুলো। ধরলুম হত ব্যক্তি হচ্ছে নন্দলাল! তাহলে হত্যাকারী কে? মণিমোহন? কিন্তু মহেন্দ্রের মুখে প্রকাশ, নন্দ ছিল তার সবচেয়ে বড় বন্ধু। সে অমন বন্ধুকে হত্যা করবে কেন? ঘটনাস্থলে আর এক ব্যক্তির পদচিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। সেই-ই বা কে? শালিখার চন্দ্রনাথ? সে এখানে কোন ভূমিকায় অভিনয় করেছে? নিশ্চয়ই মহাত্মার ভূমিকায় নয়, কারণ সে-ও গা-ঢাকা দিয়েছে। হা, ভালো কথা। যে তিনজন লোকের পায়ের দাগ পাওয়া গিয়েছে, তার প্লাস্টারের চাঁদ তোলা হয়েছে?
–হয়েছে।
তারপর?
–একজোড়া ছাপের সঙ্গে হত ব্যক্তির–অর্থাৎ নন্দের জুতো অবিকল খাপ খেয়ে গিয়েছে। মণিমোহনের বাসা থেকে জুতোও সংগ্রহ করেছি। তার জুতোও মিলে গিয়েছে আর এক জোড়া ছাপের সঙ্গে। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তিকে পাইনি, তাই ছাপের সঙ্গে তার জুতোও মেলানো হয়নি।
