শবাগারে গিয়ে সন্দেহ কিন্তু সত্য বলেই প্রমাণিত হল। যদিও শবের মুখ চেনবার উপায় নেই, তবু দেহটা পরীক্ষা করেই মহেন্দ্র সক্রন্দনে বলে উঠল, এ আমার মণিমোহন।
খানিক পরে শোকের প্রথম ধাক্কাটা সে যখন কতকটা সামলে নিলে, সুন্দরবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ছেলে কী কাজ করত?
–মার্চেন্ট অফিসে চাকরি করত, কিন্তু আপাতত বেকার হয়ে বসেছিল।
–দেখুন মহেন্দ্রবাবু, আমাদের ধারণা, মণিমোহন যাদের হাতে মারা পড়েছে, সে তাদের চিনত। সে কীরকম লোকের সঙ্গে মেলামেশা করত, আপনি কি তা জানেন?
যতদূর জানি, আমার ছেলের অসৎ সংসর্গ ছিল না। সে নিজেও ছিল শান্ত-শিষ্ট, অতি ভদ্র, মেলামেশাও করত সেইরকম সব লোকের সঙ্গে।
তার কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে আপনি চেনেন?
চিনি। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতা ছিল একজনের সঙ্গে, তার নাম নন্দলাল মিত্র।
–ঠিকানা?
–পাঁচ নম্বর রায় রোড।
–তার সম্বন্ধে আরও কিছু বলতে পারেন?
নন্দ বড় ভালো ছেলে। মণিরই সমবয়সি। কে সরকারের বিখ্যাত জুয়েলারি ফার্মের ক্যাশিয়ার।
–হুম! মণিমোহনের আর কোনও বন্ধুর কথা বলতে পারেন?
–বিশেষ কিছু খবর রাখি না। নন্দের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে আর কাউকে আমি জানি না। তবে হালে…
বলুন, থামলেন কেন?
হালে মণির সঙ্গে একটি লোকের আলাপ হয়েছে বটে। লোকটিকে আমার ভালো লাগত না।
–ভালো লাগত না কেন?
–প্রকৃতির কথা জানি না, তবে আকৃতি ছিল তার বিরুদ্ধে। অত্যন্ত কাঠখোট্টা চেহারা।
–তার নাম?
–চন্দ্রনাথ রায়।
নাম শুনেই সুন্দরবাবু জাগ্রত হয়ে উঠলেন অধিকতর। ঘটনাস্থলে যে পত্র পাওয়া গিয়াছে, তারও লেখকের নাম চন্দ্রনাথ রায়। তিনি বললেন, চন্দ্রনাথ কি শালিখার পঁচিশ নম্বর সুন্দর সেন রোডে থাকে?
–ঠিক ঠিকানা জানি না, তবে সে শালিখাতেই থাকে বটে।
তার দেহের একটু বর্ণনা দিন।
রং কালো। আর এক পোঁচ বেশি কালো হলেই সে আফ্রিকার কাফ্রিদের দলে গিয়ে ভিড়তে পারত। মাথায় ছয় ফুটের কাছাকাছি, রীতিমতো বলবান দোহারা দেহ। খাদা নাক, খুদে-খুদে চোখ, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। গোঁফ-দাড়ি কামানো। সর্বদাই কোট-প্যান্ট পরে আর হাতে থাকে একগাছা মোটা বাঘমারা লাঠি। বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের আধখানা নেই।
–হুম! যে বর্ণনা পেলুম, ভিড়ের ভিতর থেকে চন্দ্রনাথকে চিনে নিতে দেরি লাগবে না। আচ্ছা মহেন্দ্রবাবু, কেবল চেহারার জন্যই কি আপনার চন্দ্রনাথকে ভালো লাগত না?
–না। তার গলার আওয়াজ যেমন কর্কশ, কথাবার্তাও তেমন রুক্ষ! তার সঙ্গে মেলামেশার পর থেকেই মণির প্রকৃতিও যেন একটু-একটু বদলে গিয়েছিল!
কীরকম?
–তার হাব-ভাব-ব্যবহার কিঞ্চিৎ রহস্যময় হয়ে উঠেছিল।
তার মানে?
–সে যেন সর্বদাই কী চিন্তা করত! বাড়ির কারুর সঙ্গে বেশি কথা কইত না, আমাকেও যেন এড়িয়ে-এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করত! আমরা ভাবতুম, বেকার বসে আছে বলেই সে এমন মনমরা হয়ে আছে।
–তাও অসম্ভব নয় তো।
–খুব সম্ভব তাই। কিন্তু মণির আরও একটা পরিবর্তন আমরা লক্ষ করেছিলুম।
বলুন।
–মণি আগে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসত। কিন্তু ইদানীং বাড়ি ফিরতে তার রাত দশ-এগারোটা হয়ে যেত।
কতদিন থেকে এটা লক্ষ করছেন?
–চন্দ্রনাথের সঙ্গে মণির আলাপ হওয়ার পর থেকে।
–চন্দ্রনাথের আবির্ভাব কত দিন?
–সে প্রথমে আমার বাড়িতে আসে মাস পাঁচেক আগে।
মহেন্দ্রবাবু, মৃতদেহের মুখ নেই বললেই হয়। ও দেহ যে আপনারই পুত্রের, সেটা ঠিক চিনতে পেরেছেন তো?
মহেন্দ্র ভগ্নস্বরে বললে, কোনও সন্দেহ নেই–কোনও সন্দেহ নেই। আমি বাপ, নিজের ছেলের দেহ চিনতে পারব না। সেই রং, সেই গড়ন, আঙুলে পলার আংটি, পায়ে সেই জুতো! পরনের কাপড়ে আমাদের ধোপার মার্কা। বেশ বুঝেছি মশাই, আমারই কপাল পুড়েছে। বলতে-বলতে কাঁদো কাঁদো হয়ে এল তার কণ্ঠস্বর।
সুন্দরবাবু মমতাভরা গলায় বললেন, নিয়তি বড় নিষ্ঠুর, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে লাভ নেই মহেন্দ্রবাবু। আপাতত আমার আর কোনও জিজ্ঞাসা নেই, আপনি বাড়ি যেতে পারেন।
মহেন্দ্রের প্রস্থান। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সুন্দরবাবুর চিন্তা ও হুম্! শালখের চন্দ্রনাথ। রঙে কাফ্রি, নামে চন্দ্র কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। আকৃতি-প্রকৃতি নাকি সন্দেহজনক! এইবার তোমার দিকেই আমি পদচালনা করব।…
কিন্তু সুন্দরবাবুকে বেশি দূর পদচালনা করতে হল না। শবাগারের বাইরে আসতেই তিনি দেখলেন, একখানা মোটর এসে দাঁড়াল এবং গাড়ির ভিতর থেকে নেমে পড়ল একটি যুবক। তার মুখের ভাব উদ্বিগ্ন।
সে বললে, আপনিই তো সুন্দরবাবু!
-হুম!
–আমি আপনার কাছেই এসেছি।
–কেন?
–আমার ছোট ভাই নন্দলাল কাল সন্ধ্যার সময়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে এখনও ফেরেনি। থানায় সেই খবর দিতে গিয়ে শুনলুম, আপনারা নাকি একটা মৃতদেহ পেয়েছেন। আমি দেহটা একবার দেখতে চাই।
সুন্দরবাবু শুষ্ক কণ্ঠে বললেন, সেটা দেখে কী হবে?
–দেহটা যদি নন্দের হয়?
–অসম্ভব! তা শনাক্ত হয়ে গিয়েছে।
–কে শনাক্ত করেছে?
যার লাশ, তার বাপ নিজে।
–ভগবান করুন, ও দেহ যেন অন্যেরই হয়। তবু দয়া করে আমাকে কি একটি বার দেখবার সুযোগ দেবেন না?
আরে বাবা, খুনের মামলা–যা আমার চোখের বালি। আমার মগজে এখন বোঁ বোঁ করে চরকি ঘুরছে, এ-সব বাজে ব্যাপার ভালো লাগছে না, আমি চললাম। বিরক্ত মুখে সুন্দরবাবু প্রস্থানোদ্যত হলেন।
