মানিক বললে, সত্যি সুন্দরবাবু, আপনার সঙ্গে আমিও সহানুভূতি প্রকাশ করছি। এমন বৃষ্টিস্নাত অম্লান প্রভাত, মনে-মনে করছিলুম কাব্যালোচনা, চোখের সামনে দেখছিলুম মাটির ফ্রেমে বাঁধানো জলের পটে নীলিমার ছবি, হঠাৎ কিনা রক্তাক্ত মৃত্যু এসে এক মুহূর্তে বিলুপ্ত করে দিলে সমস্ত সৌন্দর্য। নিয়তির পরিহাস আর কাকে বলে!
সকলে তখন গাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মাটির ওপরে হাত পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে রয়েছে একটা মানুষের নিশ্চেষ্ট দেহ। প্রথম দৃষ্টিতেই বোঝা যায়, সেটা মৃতদেহ ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, তার মুখের অস্তিত্ব নেই বললেই হয় কপালের তলা থেকে চিবুক পর্যন্ত মুখের সমস্ত অংশটা একেবারে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে, দেখা যাচ্ছে কেবল চাপ-বাঁধা রক্তের মধ্যে খানিকটা ছিন্নভিন্ন মাংস। বীভৎস দৃশ্য!
সুন্দরবাবু বললেন, হুম, আত্মহত্যার নয়, হত্যার মামলা!
জয়ন্ত বললে, কেউ ছররা ভরা শটগান ছুঁড়ে এই বেচারার মুখ উড়িয়ে দিয়েছে। আর বন্দুকটা ছোঁড়া হয়েছে কাছ থেকেই, নইলে মুখটা অমনভাবে উড়ে যেত না। সে বসে পড়ে মৃতদেহের ওপর হাত রেখে আবার বললে, দেহটা এখনও একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়নি। খুব সম্ভব এর মৃত্যু হয়েছে ঘণ্টাকয়েক আগেই।
সুন্দরবাবু বললেন, চারিদিকে কত রক্ত দেখেছ?
তার মানে একে হত্যা করা হয়েছে এইখানেই। ঘটনাটা ঘটেছে বৃষ্টি থামবার পরে কোনও এক সময়ে। নইলে কালকের প্রবল বৃষ্টিপাতে মৃতদেহের সমস্ত রক্ত ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। রাত দুটোর আগে বৃষ্টি থামেনি। আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি সকাল সাড়ে পাঁচটার পর। হত্যাকারী কাজ সেরেছে এর মধ্যে।
সুন্দরবাবু বললে, এটা হচ্ছে যুবকের লাশ। জুতো আর পরনের কাপড় দেখলেই বোঝা যায় ভদ্রবংশের যুবক। কিন্তু ওর গায়ে রয়েছে কেবল একটা গেঞ্জি। গভীর রাত্রে কেবল গেঞ্জি পরে ভদ্রবংশের কোনও যুবক কি গড়ের মাঠে বেড়াতে আসে?
–হত ব্যক্তিকে বোধহয় কোনও গাড়িতে করে এখানে আনা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর হয়তো তার উপরকার জামাটা অপরাধী খুলে নিয়ে গিয়েছে!
–কেন?
সহজে যাতে শনাক্ত করা না যায়।
হেঁট হয়ে মাটির ওপর থেকে একখানা খাম তুলে নিয়ে তার ওপর চোখ বুলিয়ে বলল, কিন্তু খুব সম্ভব হত্যাকারী দেখতে পায়নি যে এই খামখানা মৃত ব্যক্তির জামার পকেট থেকে এখানে পড়ে গিয়েছে।
খামের ওপরে কারুর নাম আর ঠিকানা আছে?
–হ্যাঁ। শ্রীযুক্ত মণিমোহন বসু। দশ নম্বর বলাই শীল স্ট্রিট। কলিকাতা।
জয়ন্ত বললে, এটা একটা বড় সূত্র। ওটা হয় হত ব্যক্তির, নয় হত্যাকারীর নাম আর ঠিকানা! খামের ভিতর কোনও চিঠি আছে?
–আছে। এই যে! চিঠিখানা পড়ে মানিক বললে, বাজে চিঠি। শালিখার পঁচিশ নম্বর সুন্দর সেন রোড থেকে এক চন্দ্রনাথ রায় মণিমোহনকে তার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে অনুরোধ করেছে।
বাজে চিঠি নয়, ওটাও কাজে লাগবে। সুন্দরবাবু, আপনার পায়ের কাছে একটা মানিব্যাগ পড়ে আছে না?
সুন্দরবাবু সেটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাগের ভিতর খালি, ঢু–ঢু।
জয়ন্ত আশেপাশের জমি পরীক্ষা করতে করতে বললে, দেখছি বৃষ্টিভেজা মাটির ওপরে তিনজন লোকের আলাদা-আলাদা পায়ের ছাপ আছে। ধরলুম তিনজনের একজন হচ্ছে নিহত মণিমোহন! তাহলে আর দুজন কে? নিশ্চয়ই হত্যাকারী। সুন্দরবাবু, পদচিহ্নগুলোর প্লাস্টারের ছাপ তোলবার ব্যবস্থা করতে হবে।
সুন্দরবাবু খুশি মুখে বললেন, প্রথমেই যখন এতগুলো সূত্র পাওয়া গেল, তখন মামলাটার কিনারা করতে বেশি বেগ পেতে হবে না বোধহয়!
জয়ন্ত বললে, আরও একটা কথা বোঝা যাচ্ছে। ঘটনাস্থলে কোনও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। হত ব্যক্তি নিশ্চয়ই তার সঙ্গীদের চিনত, তাদের বিশ্বাস করত, নইলে রাত দুটোর পর গড়ের মাঠে এমন নির্জন জায়গায় তাদের সঙ্গে বিনা বাধায় আসতে রাজি হত না। আপাতত এই পর্যন্ত। সূর্য উঠেছে, চারিদিকে লোকের ভিড়, চলো মানিক, স্থানান্তরে প্রস্থান করি।
.
হেঁয়ালির মামলা
মণিমোহন বসু। দশ নম্বর বলাই শীল স্ট্রিট।
সুন্দরবাবু যথাস্থানে গিয়ে হাজির হয়ে দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন।
বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। সুন্দরবাবুর ধরাচূড়া-পরা চেহারা দেখেই চমকে উঠল তাঁর দুই চক্ষু।
সুন্দরবাবু শুধোলেন, এ বাড়িতে মণিমোহন বসু বলে কেউ থাকে?
–থাকে। মণি আমার ছেলে।
–আপনার নাম কী?
–মহেন্দ্রমোহন বসু।
–মণিবাবুর সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই।
–মণি কাল থেকে বাড়িতে ফেরেনি। তার জন্যে আমরা বড় ভাবছি। সে তো না। বলে বাইরে কখনও রাত কাটায় না।
বটে। আপনার ছেলের বয়স কত?
–আঠাশ।
–গায়ের রং?
–উজ্জ্বল শ্যাম।
–একহারা, কিন্তু বলিষ্ঠ দেহ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাইরে যাবার সময়ে সে কীরকম পোশাক পরেছিল?
–সিল্কের পাঞ্জাবি। সরু কালোপেড়ে মিলের ধুতি। পায়ে ব্রাউন রঙের জুতো।
–আপনি অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে একটু আসবেন।
–কোথায়?
–মর্গে।
মহেন্দ্রের দুই চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল। সবিস্ময়ে বললেন, মর্গে?
–আপনার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু না বলেও আর উপায় নেই। আজ আমরা একটা লাশ পেয়েছি। সেটা আপনার ছেলের দেহও হতে পারে!
মহেন্দ্রবাবু টলে পড়ে যাচ্ছিল, সুন্দরবাবু তাড়াতাড়ি দু-হাতে তাকে ধরে ফেললেন। তারপর বললেন, স্থির হোন মহেন্দ্রবাবু। আসুন আমার সঙ্গে। আমাদের অনুমান হয়তো সত্য। নয়!
