আরে মোলো! একটা সঙ্গীর দুর্দশা দেখেও ও তিনটে উড়োজন্তু ভয় পেলে না! আবার তাকে জ্বালিয়ে মারতে আসছে! কং চটেমটে তাদের ধরবার জন্যে একবার এদিকে, আর একবার ওদিকে লম্বা লম্বা হাত বাড়াতে লাগল।
উড়োজাহাজগুলো এবার সাবধান হয়েছে তারা আর কঙয়ের নাগালের ভিতর এল না।
কিন্তু নাগালের বাইরে থেকেই এবারে তারা অব্যর্থ মৃত্যুবাণ ছাড়তে লাগল! একখানা করে উড়োজাহাজ কঙের কাছে আসে, এক সেকেন্ডের জন্যে থামে, সাংঘাতিক কলের কামান ছোঁড়ে, আর চোখের পলক পড়তে না পড়তেই সাঁৎ করে সরে যায়!
কং চেয়ে দেখলে, তার সারা দেহ বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে এবং তার দেহের রক্তস্রোত মনুমেন্টের মাথা রাঙা করে গড়িয়ে পড়ছে।
মেশিনগান, কং ও উড়োজাহাজের গর্জনে আকাশের বুক যেন ফেটে যাবার মতো হল।
কঙের দৈত্য দেহ মনুমেন্টের ওপর টলতে লাগল রক্তধারার সঙ্গে তার সমস্ত শক্তি যেন শরীর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল।
কিন্তু উড়োজগুলোর দয়া নেই। তাদের মৃত্যুভরা তপ্ত দংশন অদৃশ্যভাবে কঙের দেহের ওপর এসে পড়ছে।
ক্রোধোন্মত্ত কং শেষটা আর সহ্য করতে পারলে না হঠাৎ একখানা উড়োজাহাজকে ধরবার জন্যে সে শূন্যে এক মস্ত লম্ফ ত্যাগ করলে–উড়োজাহাজ আবার সাঁৎ করে তার হাতের সীমানার বাইরে বেরিয়ে গেল এবং মূর্তিমান একটা ধূমকেতুর মতন করে বিপুল দেহটা এসে ভীষণ শব্দে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল!
রাজা কং আর তার পুতুল-মেয়েকে দেখবার জন্যে চোখ মেলে তাকায়নি।
কে! (উপন্যাস)
নতুন মামলা
মবে ফুটি-ফুটি করছে ভোরের আলো। কলকাতায় গড়ের মাঠ।
গাছে-গাছে বিহঙ্গদের ঐকতান। এখানে ওখানে অশ্বচালনা করছে পাঞ্জাবি ঘোড়সওয়াররা। প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছে আরও অনেকে এবং তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে আমাদের পরিচিত তিনটি মানুষকে সাধের গোয়েন্দা জয়ন্ত আর মানিক ও পুলিশ কর্মচারী সুন্দরবাবু।
শরৎ ঋতুর জন্যে আসর ছেড়ে দেবার আগে শেষ-বর্ষা যথেষ্ট বিক্রম প্রকাশ করে গিয়েছে গতকল্য রাত্রে। সারা শহরটা ঘণ্টা কয়েক ধরে স্নান করেছে এমন ঘন বৃষ্টিধারায় যে, পথের আর মাঠের অনেক জায়গাতেই এখনও থইথই করছে ঘোলাটে জল। রাত দুটোর পরে বৃষ্টি থেমেছে বটে, কিন্তু গড়ের মাঠ এখনও প্রাতভ্রমণের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
তবু প্রভাতী ভ্রমণে যারা অভ্যস্ত এ সময়টায় তারা ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে চায় না। জয়ন্ত আর মানিক হচ্ছে এই জাতীয় জীব। কেবল সূর্যোদয়ের আগে নয়, সূর্যাস্তের পরেও একবার মুক্ত আকাশ বাতাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারলে তারা যেন আত্মস্থ হতে পারে না।
এ বাতিক কোনওদিনই ছিল না সুন্দরবাবুর। কিন্তু ইদানীং তাঁর উদরদেশের বিপুলতা এতটা বেড়ে উঠেছে যে, চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন, নিয়মিতভাবে প্রত্যহ কিঞ্চিৎ ব্যায়াম– অর্থাৎ অন্তত মাইলদুয়েক পদব্রজে ভ্রমণ করতে। তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধেও আজকাল তাকে হতে হয়েছে জয়ন্তদের ভ্রমণের সঙ্গী।
ভুড়ির দ্বারা ভারাক্রান্ত সুন্দরবাবু কিছুক্ষণ পদচালনা করবার পর শ্রান্ত স্বরে বললেন, মানিক, পথের আর মাঠের অবস্থা দেখছ তো?
–দেখছি।
–আজ আমি কিছুতেই বেড়াতে আসতুম না।
–তবে এলেন কেন?
–তোমাদের উৎপাতের দায়ে পড়ে। ভোর হতে না হতেই, কাক-চিল না ডাকতেই, বাসায় ঢুকে তুমি গাধার মতো যা ডাকাডাকি শুরু করলে। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে ভেবে ছেলেমেয়েগুলো পর্যন্ত চমকে জেগে উঠল। তোমার গর্দভ কণ্ঠকে রুদ্ধ করবার জন্যই আজ আমাকে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়েছে।
মানিক মুখ টিপে হাসতে-হাসতে বললে, আমাকে গাধা বলে আপনি যদি খুশি হন, আমি আপত্তি করব না। কিন্তু বাইরে এসে কি দেখছেন না, আজকের দিনটির বিশেষত্ব?
–হুম! বিশেষত্বের মধ্যে তো দেখছি কেবল জল, কাদা আর পিছল পথ।
–আর কিছু দেখছেন না?
–উঁহু!
–তাহলে আপনার চোখের দোষ হয়েছে।
–চোখের কিছু দোষ হয়নি। তাহলে আমি চশমা পরতুম।
মানিক এদিক-ওদিক অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে, দেখছেন?
সুন্দরবাবু এদিকে-ওদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হতভম্বের মতো বললেন, কিছুই দেখছি না তো!
–ভালো করে চেয়ে দেখুন, মাঠের যেখানে যেখানে জল জমেছে, সেইখানে স্বর্গ নেমে এসেছে মাটির কোলে।
-মানে?
–স্বর্গ বললে আমরা কোন দিকে তাকাই? আকাশের দিকে। দেখুন, মাঠের যেখানে যেখানে জল জমেছে, সেইখানে নেমে এসেছে টুকরো আকাশের সুন্দর নীলিমা। একটু পরেই দেখতে পাবেন ওখানে সাঁতার কাটছে কচিরোদের কাঁচা সোনালি আভা। আবার সন্ধ্যার পরে হয়তো ওখানে ফুটে উঠবে নতুন চাঁদের রুপোলি জ্যোৎস্নাও।
সুন্দরবাবু দুই ভুরু তুলে বললেন, উঃ ভয়ংকর কাব্যি!
জয়ন্ত এতক্ষণ নির্বাক মুখে অগ্রসর হচ্ছিল। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, সুন্দরবাবু!
তার কণ্ঠস্বর শুনে সুন্দরবাবু সচমকে বললেন, কী জয়ন্ত?
আঙুল দিয়ে এক দিকে দেখিয়ে জয়ন্ত বললে, ওই গাছতলায় কী পড়ে আছে দেখছেন?
–একটা মানুষ শুয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে! না, না, ওটা যে রক্তাক্ত দেহ!
–হুঁ। খুব সম্ভব ওটা মৃতদেহ! গড়ের মাঠে এমনধারা দৃশ্য নতুন নয়। এগিয়ে চলুন, ব্যাপারটা কী দেখা যাক!
সুন্দরবাবু একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, ব্যাপার আর কী, কেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে। মানিক এতক্ষণ আমাকে গড়ের মাঠে মাটির ওপরে স্বর্গ দেখাবার চেষ্টা করছিল। এখন সামলাও বাবা স্বর্গের ঠেলা, স্বর্গের বদলে ঘাড়ে হয়তো চাপল একটা নতুন খুনের মামলা।
