মোটরগুলো আবার ছুটল।
একটু গিয়েই এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল।
হোয়াইটওয়ে লেডল-র উঁচু গম্বুজের ওপর থেকে হাত-পা দিয়ে দেওয়াল জড়িয়ে বিরাট ও কৃষ্ণবর্ণ এক দৈত্যমূর্তি নীচের দিকে নেমে আসছে।
ডেনহাম বললে, কী আশ্চর্য! কং যে টিকটিকির মতো দেওয়াল বেয়ে নেমে আসছে!
কং খানিকটা নেমে এসেই পথের ওপর লাফিয়ে পড়ল। একবার চারদিকে চেয়ে দেখে মেঘগর্জনের মতন চিৎকার করলে। রাজপথের জনতা চোখের নিমিষে অদৃশ্য হয়ে গেল!
কং এক লাফে চৌরঙ্গি রোড পার হল। পথের পাশে একখানা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল, বিষম আক্রোশে কং সেখানা একহাতে তুলে নিয়ে ছোট্ট একটা দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মতোই ছুঁড়ে ফেলে দিলে–গাড়িখানা শূন্যে ঘুরতে-ঘুরতে শোভাবাজারের খেলার মাঠের ওপরে গিয়ে পড়ে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল!
ততক্ষণে মেশিন-গান এসে পড়েছিল। জনকয় তোক সেই কলের কামান চালাবার উপক্রম করাতে কমিশনার বাধা দিয়ে বললেন, কামান ছুড়ো না। ওর হাতে একটি মহিলা রয়েছেন!
কঙের হাতের চেটোয় মালবিকাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বাড়ির দেওয়াল বয়ে নামবার সময়েও কং তার এ হাতখানা ব্যবহার করেনি।
আরও গোটাকয়েক লাফকং একেবারে মনুমেন্টের কাছে গিয়ে হাজির!
কমিশনার বললেন, যা ভেবেছি তাই! দেখো, দেখো, জানোয়ারটা মনুমেন্ট জড়িয়ে কত তাড়াতাড়ি ওপরে উঠছে!
একজন ইন্সপেক্টর বললে, এখন উপায়? ওকে কেমন করে আমরা ধরব? সব চেয়ে মুশকিল হচ্ছে, ওকে গুলি করেও মারতে পারব না। তাহলে গুলি ওই মেয়েটির গায়ে লাগতে পারে!
কাপ্তেন বললেন, এরোপ্লেন আনলে কেমন হয়?
কমিশনার বললেন, ঠিক বলেছ। আমরা সেই ব্যবস্থাই করব। ওর কাছে যাবার আর কোনও উপায় নেই।
শোভন বললে, মি. ডেনহাম, আমাকে আর একবার করে কাছে যেতে হবে।
কেমন করে যাবেন?
আমি মনুমেন্টের ভিতর দিয়ে ওপরে উঠব। তাহলে হয়তো মালবিকাকে আবার বাঁচালেও বাঁচাতে পারি।
আচ্ছা, চলুন,আমি আপনার সঙ্গে যাব।
কং তখন মনুমেন্টের আধাআধি পার হয়ে গেছে। সে এক-একবার নীচের দিকে তাকায়, গর্জন করে, আবার ওপরে উঠে। তার চেহারা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে, উচ্চতার জন্যে।
শোভন ও ডেনহাম মনুমেন্টের নোংরা ও অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে লাগল। তাদের খালি ভয় হতে লাগল যে, কঙের প্রকাণ্ড দেহের ভার সইতে না পেরে মনুমেন্টের এই পুরোনো ইটের গাঁথুনি যদি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে! তাহলেই তো সব শেষ। কং মরবে, মরুকগে। কিন্তু সেইসঙ্গে মালবিকাও মরবে, তারাও বাঁচবে না! কঙের দেহের দাপট সইতে না পেরে মনুমেন্ট যেন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে, এটা তারা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই অনুভব করতে পারছিল।
মনুমেন্টের নীচেকার বারান্দায় এসেই তারা আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কঙের বিপুল উদর তাদের দৃষ্টিসীমা একেবারে রোধ করে দিয়েছে! কঙের এত কাছে তারা আর কখনই আসেনি।
কং তার মস্তবড় দুই ঊরু ও পা দিয়ে মনুমেন্টের ওপর দিকটা জড়িয়ে বসে আছে– তার দেহের উপর-অংশ তারাও দেখতে পেলে না, এবং তার কোলের কাছে যে দুটো মানুষপোকা এসে দাঁড়িয়ে আছে, কংও সেটা মোটেই টের পেলে না!
বাইরে তিন-চারখানা এরোপ্লেনের গর্জন শোনা গেল! এবং এটাও বোঝা গেল যে, উড়োজাহাজগুলো কঙের খুব কাছে এসেই উড়ছে।
বোধহয় এই নতুন শত্রুর আবির্ভাবে কং ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে! আচম্বিতে তার একখানা মস্ত হাত নীচে নেমে এল, তার মুঠোর দেখা গেল মালবিকাকে। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করবার সময়ে কং বরাবরই মালবিকাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখে! এবারেও বোধহয় সেই কারণেই। সে মনুমেন্টের নিচেকার বারান্দায় মালবিকার অচেতন দেহকে শুইয়ে রেখে দিলে!!
কিন্তু কং জানতেও পারলে না যে, দুটো মানুষপোকা বারান্দা থেকে আবার তার পুতুল মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেল! শোভন আবার করে চোখে ধুলো দিয়ে মালবিকাকে উদ্ধার করলে।
চৌরঙ্গির মোড়ে তখন সারা কলকাতা শহর ভেঙে পড়েছে।
পা দিয়ে মনুমেন্ট জড়িয়ে বসে আছে রাজা কং, সগর্বে তার মাথাটা শূন্যে তুলে! তার চারিপাশ দিয়ে চারখানা উড়োজাহাজ ক্রমাগত ঘোরাঘুরি করছে–আসছে আর চলে যাচ্ছে, আসছে আর চলে যাচ্ছে। কং ভাবলে, নিশ্চয় এগুলো কোনও অজানা উড়োজন্তু,–গর্জন করে তাকে লড়াই করতে ডাকছে! বেশ তো, লড়াই করতে সে কোনও দিনই পিছপাও হয়নি। এতক্ষণ হাতের সেই পুতুল-মেয়েটার জন্যেই তার যা কিছু ভাবনা ছিল, এখন সে তাকে সরিয়ে রেখে হাত খালি করেছে। এইবার সে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত। উড়োজাহাজের গর্জনের উত্তরে কংও দুই হাতে বুক চাপড়াতে-চাপড়াতে হুঙ্কার দিয়ে উঠল।
কং দেখলে একটা উড়োজন্তু তার খুব কাছ দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের মতো তার একখানা। হাত তার দিকে এগিয়ে গেল এবং পর মুহূর্তে উড়োজাহাজখানা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পৃথিবীর দিকে গোত্তা খেয়ে পড়ে গেল।
কঙের শক্তি ও বাহাদুরি দেখে সারা কলকাতা থ!
মাটিতে পড়বার আগে উড়োজাহাজের ভিতর থেকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। মানুষের চোখ যেমন কঙের মতন দানব দেখেনি, কঙের চোখও তেমনি এমন কোনও উড়ো জন্তু দেখেনি, যার মুখ দিয়ে এরকম হু-হু করে আগুন বেরোয়! সে কিছু ভড়কে গেল। বোধহয় ভাবলে, ভাগ্যিস–ও আগুন তার হাত কামড়ে দেয়নি! আগুন যে কী ভয়ানক কামড়ে দেয়, কং তা জানে!
