শোভন বললে, মালবি, তুই এত ভীতু, আমি তা জানতুম না!
মালবিকা বললে, দাদা, দাদা! আর আমি সইতে পারছি না। কং ছাড়া পেয়েছে। সে আবার আমাকে সেই দ্বীপে ধরে নিয়ে যাবে!
তার মাথায় হাত বুলোতে-বুলোতে শোভন বললে, দূর পাগলি। সে তোর খোঁজ পেলে তো।
মালবিকা বললে, না দাদা, আমার মন বলছে, সে আবার আসবে।
হু, আসবে, না আরও কিছু। এটা অসভ্যদের দ্বীপ নয়, এ হচ্ছে কলকাতা শহর। এতক্ষণে কং হয়তো আবার গ্রেপ্তার হয়েছে।
তবুও মালবিকা প্রবোধ মানলে না, উ-উ করে কাঁদতে লাগল।
শোভন বললে, ভারি মুশকিলে পড়লুম দেখছি। কোথাও কিছু নেই, নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে আছে, তবু কচি খুকির মতো কান্না। আচ্ছা বাপু, একটু সবুর কর, আমি লালবাজারের থানায় টেলিফোন করে খবর এনে দিচ্ছি। কেমন, তাহলে ঠান্ডা হবি তো?
মালবিকা সজল চোখে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না দাদা, তুমি যেও না–তোমার পায়ে পড়ি। আমি একা থাকতে পারব না।
যত বাজে ভয়! চুপ করে শুয়ে থাক, ফোন করে আমি এখনি আসছি বলতে বলতে শোভন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
লালবাজারের সঙ্গে ফোনের যোগ করে শোভন বললে, হ্যাঁ, আমি হচ্ছি শোভন সেন। হ্যাঁ, আমারই ভগ্নীকে কং ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আমার ভগ্নী বড় ভয় পেয়েছেন, পাছে কং আবার তাকে ধরে…কং আবার বন্দি হয়েছে তো? কী বললেন? বন্দি হয়নি? তবে সে এখন কোথায়? পাগলের মতো চৌরঙ্গির বাড়িতে-বাড়িতে ঘরে-ঘরে উঁকি দিয়ে দেখছে? কারুকে আক্রমণ করেছে কি? করেনি? তার পায়ের চাপে অনেক লোক মারা পড়েছে? সে থিয়েটার রোডের ভেতরে ঢুকেছে?…আচ্ছা, ধন্যবাদ।
রিসিভারটা যখন রেখে দিলে, শোভনের হাত তখন ঠকঠক করে কাঁপছে। কং থিয়েটার রোডে ঢুকেছে। তাদের বাড়িও যে থিয়েটার রোডেই।
মালবিকাকে সাবধান করে দেবার জন্যে শোভন তাড়াতাড়ি তার ঘরে ছুটে এল। দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই দেখলে, মালবিকার বিছানা খালি, জানলার গরাদ ভাঙা এবং থামের মতন মোটা মোটা দুখানা কালো রোমশ পা, জানলার সামনে দিয়ে ওপর দিকে উঠে যাচ্ছে।
বেগে ছাদের ওপরে গিয়ে সে দেখলে, তার বাড়ির ছাদ থেকে কং খুব সহজেই লাফ মেরে থিয়েটার রোড পার হয়ে ওপাশের এক বাড়ির ওপরে গিয়ে পড়ল এবং তার হাতের চেটোয় রয়েছে মালবিকার অচেতন দেহ। পর মুহূর্তে আর এক লাফে কং একেবারে অদৃশ্য।
পাগলের মতন ছুটে রাস্তায় এসে শোভন দেখলে, সেখানে জনতার সীমা নেই। লরির পরে লরি ছুটে আসছে, তাদের ওপরে দলে দলে পাহারাওয়ালা…সার্জেন্ট ও মিলিটারি পুলিশের
পুলিশের একজন বড়কর্তা উত্তেজিত স্বরে বলছে, ও জানোয়ারটা অমন শক্ত চেন ছিড়লে কেমন করে? অমন ইস্পাতের চেন দিয়ে যুদ্ধের ট্যাঙ্ক পর্যন্ত আটকে রাখা যায়!..ফায়ার ব্রিগেডকে ফোন করো। শিগগির লম্বা মই নিয়ে তাদের লোকজনকে আসতে বলো। বদমাইশটা ছাদে-ছাদে লাফিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও দেখছি ছাদে ছাদে তার সঙ্গে যেতে হবে।
আরও অনেক পুলিশের লোকের সঙ্গে মোটরে করে কাপ্তেনসাহেব ও ডেনহাম এসে হাজির।
শোভন বললে, মি. ঈঙ্গলহর্ন! কং আমার বোনকে নিয়ে পালিয়েছে।
দূরের একটা বাড়ির ছাদে কঙের বিশাল দেহ একবার দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
পশুটা আবার চৌরঙ্গির দিকে যাচ্ছে। ওদিকে চলো, পথ সাফ করো!
মিলিটারি-পুলিশের অনেকগুলো বন্দুক একসঙ্গে গর্জন করে উঠল।
ডেনহাম তাড়াতাড়ি তাদের কাছে গিয়ে বললে, সাবধানে বন্দুক ছোড়! কঙের হাতে এক মহিলা আছেন!
কিন্তু কোথায় কং? পুলিশের লরিগুলো বেগে পশ্চিম দিকে ছুটেছে।
একজন ট্যাক্সিচালক পশ্চিম দিক থেকে গাড়ি ছুটিয়ে আসছিল বা পালাচ্ছিল। একজন সার্জেন্ট তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কংকে দেখেছ?
সে বিস্ময়ে প্রায়-রুদ্ধস্বরে বললে, কে কং, তা আমি জানি না। কিন্তু আমি একটা তালগাছের মতো উঁচু ভূতকে পার্ক স্ট্রিটের এপাশের ছাদ থেকে ওপাশের ছাদে লাফিয়ে যেতে দেখেছি। বলেই সে আবার গাড়ি চালিয়ে পলায়ন করলে।
সবাই পার্ক স্ট্রিটের দিকে চলো–পার্ক স্ট্রিটের দিকে।
পুলিশ কমিশনার কাপ্তেনকে ডেকে শুধোলেন, মেশিনগানের বুলেট কি তোমার এই পোষা দৈত্যকে বধ করতে পারবে?
কাপ্তেন বললেন, অনেকগুলো মেশিনগান ছুড়লে ফল হলেও হতে পারে।
আচ্ছা, আগে তাকে কোণঠাসা করা যাক!
একজন সার্জেন্ট বললে, কিন্তু আমরা যে তার নাগালই ধরতে পারছি না।
দূর থেকে আবার অনেকগুলো বন্দুকের শব্দ শোনা গেল।
ওরা বোধহয় তাকে দেখেছে। ওইদিকে গাড়ি চালাও।
গাড়ি পার্ক স্ট্রিট পার হতেই একজন পাহারাওয়ালা খবর দিলে, কং যাদুঘরের ছাদে গিয়ে চড়েছে!
যাদুঘরের কাছে গিয়ে দেখা গেল, কং সেখানেও নেই।
কমিশনার বললেন, হতভাগাটা আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারবে দেখছি। ও যে কোথায় যেতে চায়, কিছুই যে বোঝা যাচ্ছে না!
ডেনহাম বললে, আমার বোধহয় সে খুব-একটা উঁচু জায়গা খুঁজছে! কং পাহাড়ের জীব। উঁচুতে উঠতে পারলেই সে বোধহয় মনে করে, শত্রুরা তার কোনওই অনিষ্ট করতে পারবে না!
কমিশনার বললেন, খুব সম্ভব তাই। কং বোধহয় উঁচু জায়গাই খুঁজছে। তাহলে অক্টারলনি মনুমেন্টই হচ্ছে তার যোগ্য জায়গা!
একজন ইন্সপেক্টর বললে, রাস্তার ভিড় কর্পোরেশন স্ট্রিটের কাছে গিয়ে জমেছে! কং বোধহয় ওইখানেই আছে।
