সে পোষ খরগোশের মতো শান্ত হয়ে পড়েছে।
মালবিকা ভয়েভয়ে তার দাদার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল।
দেশবন্ধু পত্রের রিপোর্টার অনেক তফাতে দাঁড়িয়ে বললেন, বাঁদরটার শিকল বেশ শক্ত তো।
বঙ্গবীর পত্রের রিপোর্টার ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন কঙের একখানা ফোটো তুলতে। কিন্তু তিনি ফোটো তুলবেন কি, কঙের চেহারা দেখে তারই দাঁতে দাঁত লেগে গেল!
যুবক ভারত-এর রিপোর্টার খাঁচার ভিতরে একবার উঁকি মেরেই তুষ্ট হয়ে কাঁপতে কাঁপতে চলে গেলেন।
হঠাৎ বাইরে ঘণ্টা বেজে উঠল। কানে বললেন, আর সময় নেই। কংকে দর্শকদের সামনে নিয়ে চলো।
খাঁচার তলায় ছিল চাকা। প্রায় দুশো কুলি এসে দড়ি দিয়ে হেঁইও জোয়ান হো বলে খাঁচাটাকে টানতে টানতে নিয়ে চলল।
তাঁবুর ভিতরে দর্শকদের আসনে তখন আর তিলধারণের ঠাঁই নেই।
এতক্ষণ সেখানে বাজে গোলমালে ও তর্কবিতর্কে কান পাতবার যো ছিল না কিন্তু এখন রাজা কং সশরীরে আসছেন শুনে, পৃথিবীর এই অষ্টম বিস্ময়-কে স্বচক্ষে দেখবে বলে, সকলে রুদ্ধশ্বাসে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগল।
তারপর কঙের মূর্তি দেখে চারিদিকে বিস্ময়ের যে বিপুল চিৎকার উঠল, তা বর্ণনা করা যায় না। প্রথম কয়েক সারে বেশি দামি আসনে যেসব ধনী বাঙালি ও সাহেব-মেম বসে ছিল, তারা তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে পিছনে সরে গেল। অনেক মেম মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল, এবং সমস্ত বালক-বালিকা এক তানে কান্নার কত্সার্ট শোনাতে শুরু করলে।
তবু করে দাঁড়ানো মূর্তির ভয়ানক ভাবটা কেউ দেখতে পেলে না,কারণ খাঁচার ভিতরে কং জড়োসড়ো হয়ে মাথা হেঁট করে বসে থাকতে বাধ্য হয়েছিল!
এমন সময়ে দর্শকদের আগ্রহে ও অনুরোধে কাপ্তেনসাহেব শোভন ও মালবিকাকে এনে খাঁচার পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
এতক্ষণ কং টু-শব্দটিও করেনি। তার অত্যন্ত নির্বিকার ভাব দেখে কাপ্তেন-সাহেব স্থির করেছিলেন যে, সে ভয়েই এমন চুপ মেরে আছে।
কিন্তু এখন, মালবিকা যেমনি খাঁচার পাশে এসে দাঁড়াল, কং অমনি চমকে মুখ তুলে বাজের মতন চেঁচিয়ে উঠল!
পরমুহূর্তে সেই মস্ত তাবুর আধখানা খালি হয়ে গেল। দর্শকরা আঁতকে উঠে এ-ওর ঘাড়ে পড়ে তিরের মতন বেগে পালাতে লাগল! যারা অত্যন্ত সাহসী তারাও আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল–এবং তাদেরও ভাব দেখলে বোঝা যায়, আর একটু বাড়াবাড়ি হলে তারাও পলায়ন করবার জন্যে রীতিমতো প্রস্তুত হয়েই আছে।
কাপ্তেন গলা তুলে বললেন, ভদ্রমহোদয়গণ ও মহোদয়গণ! আপনারা মিথ্যা ভয় পাবেন না। কারণ, কঙের শিকল ক্রোম স্টিলে প্রস্তুত–এ শিকল ছেঁড়া অসম্ভব।
মালবিকার মুখও তখন ভয়ে সাদা হয়ে গেছে! একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে সে-ও কয়েক পা পিছিয়ে এল।
শোভন তার কানে কানে বললে, সবাই জানে আমরাই কংকে বন্দি করে এনেছি। মালবি, এত লোকের সামনে ভয় পেও না, সবাই ঠাট্টা করবে।
কঙের হাত-পায়ের শিকলগুলো হঠাৎ ঝনঝনিয়ে বেজে উঠল।
মালবিকা বললে, দাদা, কঙের চোখ দেখ! ও কীরকমভাবে আমার পানে তাকিয়ে আছে। কাপ্তেনকে বলো,–ওঁর যা বলবার, তাড়াতাড়ি সেরে নিন; নইলে হয়তো আমি অজ্ঞান হয়ে যাব!
শোভন বললে, মি. ঈঙ্গলহর্ন, আর দেরি করবেন না, যা বলতে হয় চট করে বলে ফেলুন। আমার ভগ্নী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন!
কাপ্তেন আবার গলা তুলে বললেন, ভদ্রমহোদয়গণ ও মহোদয়গণ
শিকলগুলো এবার বড় জোরে বেজে উঠল,কাপ্তেন স্তম্ভিত নেত্রে দেখলেন কঙের হাত ও পা থেকে শিকলের বাঁধন খুলে পড়েছে। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন–ডেনহাম! ডেনহাম। শিগগির কুলিদের ডাকো।
কিন্তু তাঁর মুখের কথা মুখে রইল শূন্যে মুখ তুলে কং আর একবার বিকট গর্জন করে আচম্বিতে উঠে দাঁড়াল এবং সঙ্গে-সঙ্গে সেই মজবুত ইস্পাতে তৈরি ছাদ ঝনঝনিয়ে বেজে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কঙের মাথা তখন প্রায় তাবুর ছাদে গিয়ে ঠেকল।
তাঁবুর দরজার কাছে দর্শকদের ভিতরে তখন রীতিমতো যুদ্ধ বেধে গেছে–কে আগে পালাবে তাই নিয়ে। অনেকে ভিড়ের ধাক্কা সইতে না পেরে মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ল– পিছনের লোকেরা তাদেরই দেহ পায়ে থেতলে এগিয়ে যেতে লাগল! ভীত চিৎকারে, আহতদের আর্তনাদে চারিদিক পরিপূর্ণ হয়ে গেল!
ইতিমধ্যে শোভনও তাড়াতাড়ি মালবিকার মূৰ্ছিত দেহকে কাঁধে তুলে নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ডেনহাম একটা গ্যালারির তলায় আশ্রয় নিলে, কাপ্তেনও তার পিছনে-পিছনে গ্যালারির ফাঁক দিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকতে গেলেন কিন্তু গ্যালারির দুই তক্তার মাঝখানে গেল তাঁর হৃষ্টপুষ্ট ভুড়িটা আটকে। অসহায়ভাবে দুই পা শূন্যে ছুঁড়তে ছুঁড়তে তিনি বললেন, ডেনহাম। আমাকে বাঁচাওকং আমাকে ধরলে বুঝি।
ডেনহাম প্রাণপণ শক্তিতে তাঁর দুই হাত ধরে টেনে-হিঁচড়ে কোনওরকমে তাকে ভিতরে টেনে নিলে!
দুই পদাঘাতে সমস্ত খাঁচা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে দৈত্য কং বাইরে এসে দাঁড়াল।
একজন সার্জেন্ট তাকে লক্ষ্য করে পাঁচ-ছয়বার রিভলভার ছুড়লে কিন্তু কং সে-সব। গ্রাহ্যও করলে না। সে একটানে সমস্ত তাঁবুটা ছিঁড়ে ওপরে আকাশের দিকে এক টুকরো ন্যাকড়ার মতন উড়িয়ে দিলে এবং তারপর পায়ের তলায় কলকাতা শহরের দিকে সক্রোধে তাকিয়ে হুঙ্কারের পর হুঙ্কার দিতে লাগল।
.
পনেরো। কঙের কথা ফুরল
নিজের বাড়িতে ফিরে বিছানায় শুয়ে মালবিকা তখন কঁদছিল।
