কিন্তু আজ কাপ্তেন ঈঙ্গলহর্নের চেয়ে বেশি খুশি কেউ নয়। তিনি ব্যাপার দেখে স্থির করেছেন, এইবারে জাহাজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীর শহরে-শহরে কংকে দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করবেন।
ডেনহামকে ডেকে তিনি বললেন, আর তুমি ছোকরা হবে আমার ম্যানেজার। আমার যা লাভ হবে, তা থেকে তুমি দু-আনা অংশ পাবে। আমি একলাই সব টাকা হজম করতে চাই না।
ডেনহাম হেসে বললে, বেশ, ওসব কথা নিয়ে পরে আলোচনা করব। কিন্তু আপাতত যে ভারী বিপদ উপস্থিত!
কাপ্তেন ব্যস্ত হয়ে বললেন, বিপদ! কীসের বিপদ? কং কি খাঁচার দরজা ভেঙে ফেলেছে?
ডেনহাম বললে, না, আজ সে দরজা ভাঙেনি–তবে পরে একদিন হয়তো ভাঙবে।
তবে আবার বিপদ কীসের?
মিঃ সেন আর মিস সেন দর্শকদের সামনে আসতে রাজি হচ্ছে না!
কেন? আমি তো স্বীকার করেছি, তাদের বীরত্বের পুরস্কারের জন্যে আজ টিকিট বিক্রির সব টাকা তাদেরই আমি উপহার দেব!
ডেনহাম ঘাড় নেড়ে বললে, না, না সেজন্যে তাদের আপত্তি নয়! টিকিট বিক্রির টাকা তাঁরা চান না। তাঁরা বলছেন, এমনভাবে সকলের সামনে আসতে তাদের লজ্জা করছে!
ডেনহামের পিঠে এক আদরের চড় মেরে কাপ্তেন বললেন, ওঃ, এইজন্যে তুমি এত ভাবছ? কোনও ভাবনা নেই, তাদের এখানে নিয়ে এসো, আমি ঠিক রাজি করাব।
ডেনহাম বেরিয়ে গেল এবং শোভন ও মালবিকাকে নিয়ে আবার ফিরে এল।
কাপ্তেন বললেন, আপনারা দর্শকদের সামনে আসতে রাজি নন কেন?
শোভন বললে, কারণ তো মি. ডেহামকে আগেই বলেছি।
কাপ্তেন বললেন, তাহলে আমার মান কোথায় থাকবে? সমস্ত কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছি, আজকের প্রদর্শনীতে এলে সবাই আপনাদেরও দেখতে পাবে। আপনাদের একবার চোখের দেখা দেখবার জন্যে আজ কত লোক টিকিট কিনেছে, আপনারা কি সে-খবরটা রাখেন? কঙের সামনে দাঁড়িয়ে, কেমন করে তাকে ধরা হল যখন সেই গল্প বলা হবে, তখন লোকে আপনাদের খুঁজবে। কিন্তু তখন আমি কী বলব?
শোভন বললে, আপনি টিকিট বিক্রি করছেন বলেই তো আমাদের আপত্তি।
কেন? আজকের টাকা তো আমি নিজের পকেটে পুরছি না। এ সবই তো আপনাদের!
শোভন একটু বিরক্ত স্বরে বললে, আমাদের আসল আপত্তি তো সেইজন্যেই! আমরা কি থিয়েটারের অভিনেতা, না সার্কাসের খেলোয়াড় যে, টাকার লোভে লোকের কৌতূহল মেটাতে আসব? না, মিঃ ঈলহন, আমাদের দিয়ে একাজ হবে না!
কাপ্তেন মুশকিলে পড়ে হতাশভাবে বললেন, তা হলে আমার কী উপায় হবে? লোকে যে আমাকে মারতে আসবে!
কাপ্তেনের মুখ দেখে মালবিকার মায়া হল। খানিকক্ষণ ভেবে সে বললে, আচ্ছা, যখন অন্য উপায় নেই, তখন কী আর করা যাবে? তবে আমরা এক শর্তে রাজি হতে পারি। আজকের টিকিট বিক্রির এক পয়সাও আমরা নেব না। কী বল দাদা?
শোভন বললে, এ প্রস্তাব তবু মন্দের ভালো।
কাপ্তেন বললেন, খামোখা এতগুলো টাকা ছেড়ে দেবেন? শোভন বললে, টাকার লোভে আমরা মনুষ্যত্ব বিক্রি করতে পারব না।
কাপ্তেন উচ্ছ্বসিত স্বরে বললেন, সাধু! সাধু! আপনাদের যতই দেখছি, আপনাদের ওপরে আমার শ্রদ্ধা ততই বেড়ে উঠছে। এইবার চলুন–প্রথম প্রদর্শনীর সময় হয়েছে।
.
চোদ্দো । কঙের জাগরণ
কং বসে আছে। কিন্তু আজ আর সে রাজা কং নয়! বেজায় মজবুত ইস্পাতের খাঁচার ভিতরে, সর্বাঙ্গে ইস্পাতের শিকলের বাঁধন নিয়ে পর্বতের ভেঙে পড়া শিখরের মতো স্তব্ধ হয়ে, হেঁট মাথায়, ম্রিয়মাণ মুখে সে বসে আছে। মোটা লোহার চেনে তার প্রকাণ্ড হাত ও পা বাঁধা। সমস্ত দেহের মধ্যে মাঝে-মাঝে নড়ছে কেবল তার চোখ দুটো।
তাকে দেখলে দুঃখ হয় সত্য-সত্যই। কী অধঃপতন! আকাশছোঁয়া সেই খুলি-পাহাড়ের শিখর। সে ছাড়া আর কোনও জীবজন্তুর ছায়া সেখানে পড়েনি! তার ওপর দিয়ে বয়ে যেত মেঘের সার আর ঝোড়ো হাওয়া এবং নীচে দিয়ে বয়ে যেত অনন্ত মহাসাগর! সেইখানে বসে-বসে কং তার দ্বীপ-রাজ্য শাসন করত। অরণ্যবাসী ভয়ংকর সব দানব জন্তু–যাদের লাঙ্গ এলের আঘাত লাগলে বড় বড় শাল, তাল, দেবদারু গাছ ধুলো হয়ে উড়ে যায়, যাদের পায়ের ভারে মেদিনী টলমল করে, কঙের বলিষ্ঠ বাহু তাদেরও দর্প চূর্ণ করেছে। যেসব পুঁচকে মানুষপোকাগুলো তাকে খুশি রাখবার জন্যে পূজা করত, বৎসরে-বৎসরে বউ যোগাত, কং একটা নিশ্বাস ফেললে, হয়তো যারা ঝড়ের তোড়ে শুকনো পাতার মতো হুস করে কোথায় উড়ে যায়, দৈব-বিড়ম্বনায় আজ কিনা সেই ঘৃণ্য কীটগুলোই তাকে কুকুর-বিড়ালের মতো বেঁধে রেখে দিয়েছে, পরম অবহেলা-ভরে তার সুমুখ দিয়ে আনাগোনা করছে। যদিও এই পোকাগুলোর ভাষা সে জানে না, তবু এটুকু তার বুঝতে বাকি থাকছে না, প্রায়ই তাকে একটা তুচ্ছ জীব ভেবে তারা নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-তামাশা করে, তাকে টিটকিরি দেয়! হাতি পাঁকে পড়লে ব্যাঙও তাই নিয়ে কৌতুক বিদ্রূপ করতে ছাড়ে না। হায় রে অদৃষ্ট!….
কয়েকজন খবরের কাগজের রিপোর্টারকে নিয়ে কাপ্তেন এলেন, তার পিছনে-পিছনে ডেনহাম, শোভন ও মালবিকা।
মালবিকা সহজে সেখানে আসতে রাজি হচ্ছে না, বলছে, না মি. ডেনহাম, আপনি জানেন না, কংকে দেখলেই আমার বুক ধুক ধুক করে, ভয়ে আমার প্রাণ উড়ে যায়!
ডেনহাম বললে, মিস্ সেন, আপনি মিথ্যে ভয় পাচ্ছেন। এর মধ্যে ইস্পাতের খাঁচা, শিকল আর চাবুকের মহিমায় কঙের সব জারিজুরি আর জাঁক আমরা ভেঙে দিয়েছি। এখন
