এ ওষুধটা হয়তো এত শীঘ্র আমি নিজের উপরে প্রয়োগ করতুম না, কিন্তু বাধ্য হয়ে শেষটা করতে হল। পূর্ণ, আমি যে ধনীর ছেলে নই এ কথা তুমি জানো। সামান্য যা কিছু পুঁজি-পাটা ছিল, এই পরীক্ষা শেষ করতেই তা ফুরিয়ে গেল। কয়েক মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি, বাড়িওয়ালা বিষম তাগাদা শুরু করলে। তাগাদায় যখন ফল হল না, তখন সে নালিশ করে আমার বিরুদ্ধে বডি-ওয়ারেন্ট বার করলে। বাড়িওয়ালা ও ওয়ারেন্টকে ফাঁকি দেবার জন্যে শেষটা আমি মরিয়া হয়ে ওষুধ খেয়ে অদৃশ্য হয়ে পড়লুম।
বাড়িওয়ালার চোখের সুমুখ দিয়েই আমি সরে পড়লুম, কিন্তু সে আমাকে মোটেই দেখতে পেলে না। রাজপথে জনতার ভিতর দিয়ে লক্ষ্যহীনের মতন এগিয়ে চললুম। কিন্তু খানিক দূর এগুতে না এগুতেই নানান রকম মুশকিল হতে লাগল। মোটরগাড়িগুলো হর্ণ না দিয়েই আমার ঘাড়ের উপর দিয়ে চলে যেতে চায়। একটা মুটে একরাশ জিনিস ভরা ঝাঁকা মাথায় করে আমার গায়ের উপরে এসে পড়ল। আমি সাৎ করে একপাশে সরে গেলুম বটে, কিন্তু আমার অদৃশ্য গায়ে ধাক্কা খেয়ে মুটেটা আশ্চর্য হয়ে এমনি চমকে উঠল যে তার সমস্ত মোট মাট পথের উপরে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তার আঁকার ভিতরে কাচের কি–একটা জিনিস ছিল, তারই এক টুকরো ভেঙে আমার পায়ের তলায় ফুটে গেল ও ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগল। আমি কাচের টুকরোটা পা থেকে বার করে ফেলবার চেষ্টা করছি, ইতিমধ্যে
সেখানে অনেক লোকজন জমে গেল। তারা মুটেটাকে বললে, তুই কানা হয়ে পথ চলছিস। নাকি? মুটেটা বললে, না বাবু, ভূতে আমায় ধাক্কা মেরেছে! সব লোক হেসে উঠল। মুটে বললে, ওই দেখুন, রক্তমাখা পায়ের দাগ। বেগতিক দেখে আমি তাড়াতাড়ি সেখান থেকে। পালাতে লাগলুম। কিন্তু কি আপদ, যতই অগ্রসর হই রক্তমাখা পায়ের রেখা আমার পিছনে পিছনেই চলে। রাস্তার ভিড় ক্রমেই বেড়ে উঠল, সকলেই ভীত, বিস্মিত, স্তম্ভিত! সেই মস্ত ভিড় রক্তাক্ত পায়ের দাগ ধরে আমায় অনুসরণ করতে লাগল! তার উপরে পথের লেড়ে কুকুরগুলোর ব্যাপার আরও সঙিন করে তুলল। তারা আমাকে দেখতে পাচ্ছিল না বটে, কিন্তু তাদের তীব্র ঘ্রাণশক্তি আমাকে আবিষ্কার করে ফেললে অনায়াসেই! হতভাগারা আমাকে ঘেউ ঘেউ করে কামড়ে দিতে এল! ব্যতিব্যস্ত হয়ে কি করব ভাবছি এমন সময় দেখি একখানা ফিটনগাড়ি সেইখান দিয়ে যাচ্ছে। একলাফে তার উপরে উঠে পড়লুম, গাড়িখানা দুলে উঠল, গাড়োয়ান সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে পিছন ফিরে একবার দেখলে; কিন্তু কিছুই না দেখতে পেয়ে আশ্বস্ত হয়ে আবার গাড়ি চালাতে লাগল।
খানিক পরেই এক নতুন বিপদ! একটা ভীষণ মোটা মেম হঠাৎ সেই গাড়িখানার উপরে চড়ে বসল। আমি তাড়াতাড়ি অন্য দরজা দিয়ে আবার পথের উপরে লাফিয়ে পড়লুম। এবারে খুব সাবধানে সকলকে এড়িয়ে পথ চলতে লাগলুম। সন্ধে পর্যন্ত এইরকম ঘুরে ঘুরে রীতিমতো ক্ষুধার উদ্রেক হল। একখানা খাবারের দোকানের একপাশে গিয়ে দাঁড়ালুম। দোকানি যেই একটু অন্যমনস্ক হয়, অমনি খান-দুই-তিন লুচি বা দু-একখানা কচুরি বা দু-একটা আলুর দম প্রভৃতি টপাটপ সরিয়ে ফেলি! কিন্তু দু-একটা খাবার মুখে ফেলেই নতুন এক বিপদের সম্ভাবনায় মুষড়ে পড়লুম! আমার দেহের রক্ত যেমন বাইরের আলো-হাওয়ার সংস্পর্শে এলে আর অদৃশ্য থাকে না, তেমনি বাইরের কোনও খাবার জিনিসও হজম না হওয়া পর্যন্ত উদরের মধ্যে দৃশ্যমান হয়েই থাকে। এই সত্যটা ধরতে পেরেই পেটের ক্ষুধা পেটে নিয়ে পালিয়ে এলুম।
সারাদিন ঘুরে ঘুরে ও অনাহারে শরীর এলিয়ে পড়ল। এখন উপায়? বাসায় ফেরবার পথ নেই, রাস্তায় রাস্তায় কতক্ষণ আর এমন করে ঘুরে বেড়াব? সারাদেহে এক-টুকরো কাপড় নেই, তার উপরে পৌষমাসের প্রখর শীত! কাঁপতে কাঁপতে ভাবতে লাগলুম, কোনওরকমে যদি জামাকাপড় ও জুতো জোগাড় করতে পারি, আর চশমা ব্যান্ডেজ ও পরচুল প্রভৃতির সাহায্যে। মুখের অদৃশ্য অংশগুলো ঢাকা দিতে পারি, তাহলে আমার চেহারা খুব চমৎকার দেখতে না হলেও এক রকম চলনসই হতে পারে। কেউ শুধোলে বললেই হবে যে, দৈব-দুর্ঘটনায় চোট। খেয়েছি বলে মুখে ব্যান্ডেজ বাঁধতে হয়েছে!..আরও মিনিট পনেরো পথ চলবার পরই যা। খুঁজছিলুম সেই সুযোগই পেলুম!–একটা বাড়ির সামনে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে–এককড়ি বিশ্বাস এন্ড কোং। এইখানে যাত্রা ও থিয়েটারের সকল রকম সাজপোশাক ও সরঞ্জাম সুলভে ভাড়া দেওয়া হয়।
কোনওরকম ইতস্তত না করে একেবারে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলুম। ঘরের ভিতরে একটা টাকমাথা বুড়ো একটা বাক্সের সামনে মাদুরের উপর বসে একখানা খাতায় কি লিখছিল! আমার পায়ের শব্দে চমকে মুখ তুলে দেখলে, কিন্তু সামনে কিছুই দেখতে না পেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। চারিদিকে সিন্দুক, বাক্স ও তোরঙ্গ সাজানো রয়েছে, দেয়ালে হরেকরকম সাজপোশাক এবং পরচুল ও গোঁফ-দাড়ি ঝোলানো রয়েছে, নানা আকারের মুখোশ ও অস্ত্রশস্ত্র টাঙানো রয়েছে। আমি পা টিপে টিপে একটা কোণের দিকে যাবার চেষ্টা করলুম। কিন্তু এমনি আমার কপাল যে হঠাৎ আমার ধাক্কা লেগে একটা তোরঙ্গ গেল হুড়মুড় করে পড়ে! বুড়ো এবারে কাজকর্ম ফেলে একেবারে উঠে দাঁড়াল! যে-তোরঙ্গটা পড়ে গিয়েছিল তার কাছে এসে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চারিদিকে চেয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কিছুই আবিষ্কার করতে না পেরে আরও বেশি হতভম্ব হয়ে গেল।
