শোভন বললে, কঙের কাছে লোহার শিকল হয়তো ফুলের মালার মতন পলকা! ও কি বাঁধা থাকতে রাজি হবে?
কাপ্তেন বললেন, রাজি হয় কি না হয়, সেটা পরে বোঝা যাবে! কং, কং, কং! রাজা কং! সবাই কংকং করে ভয়েই সারা! এই দ্বীপেই সে রাজা, সভ্য দেশে সে পশু মাত্র! যে-কোনও পশুকে মানুষ একটা মস্ত বড় শিক্ষা দিতে পারে। সেটা হচ্ছে ভয়! মানুষ হাতি, বাঘ, সিংহকে বশে রেখেছে এই ভয় দেখিয়েই। কংকেও আমরা শিখিয়ে দেব, ভয় কাকে বলে! তারপর সে বশ মানে কি না দেখা যাবে! লোহার শিকলে নয়, ভয়ে এই পশু কং আমাদের গোলাম হয়ে থাকবে!
ওদিকে পাঁচিলের ওপর থেকে বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়ার মতন ডাগর করে অসভ্যরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল তাদের বিশ্ববিজয়ী রাজা কংকে ওই বিদেশিরা লোহার শিকলে বেঁধে ভেলায় করে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রধান পুরোহিত ভেউ-ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললে, ভেটো খোটা হোটো খোটা ঘংচা।
রাজাও চোখের জল মুছতে মুছতে বললে, হাভা ডাভা খাভা তাভা খোংখু!
এ-সব কথার মানে কী জানি না। বোধহয় খুবই দুঃখ-শোকের কথা!
কাপ্তেন শোভনের পিঠ চাপড়ে বললেন, মি. সেন! আপনি বীর বটে! রূপকথার রাজপুত্রের মতো আপনি এই দৈত্যটার হাত থেকে আপনার ভগ্নীকে উদ্ধার করে এনেছেন!…এই কংকে নিয়ে আমি পৃথিবীর বড় বড় সব শহরে ঘুরে বেড়াব, আর আপনার সম্মানের জন্যে সর্বপ্রথমে যাব কলকাতা শহরেই!
.
তেরো। ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’
সারা কলকাতার লোক আজ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের এক মাঠের দিকে সমুদ্রের তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতন ছুটে চলেছে!
সারা কলকাতার ছোট-বড় বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে সচিত্র বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে একটা গগনস্পর্শী গরিলার ছবি এবং তার তলায় মস্ত বড় হরফে লেখা রয়েছে–
রাজা কং, পৃথিবীর অষ্টম বিস্ময়।
সারা কলকাতায় সমস্ত ছেলে-মেয়ে আজ প্রতিজ্ঞা করেছে, রাজা কংকে স্বচক্ষে না দেখে, কেউ আর ইস্কুলের কোনও কেতাব স্পর্শ করবে না।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে যেসব ট্রাফিক কনস্টেবল পাহারা দেয়, মানুষের ভিড়ের চোটে আর গাড়ির ঠেলায় অস্থির হয়ে তারা রাজা কঙের উদ্দেশে অভিশাপ বৃষ্টি করছে।
রাজা কংকে আজ তিনবার দেখানো হবে! কলকাতার কোনও বায়োস্কোপ ও থিয়েটারে আজ একখানাও টিকিট বিক্রি হয়নি। ক্যালকাটা-মোহনবাগানের খেলার মাঠে চেঁচিয়ে গলা ভাঙবার, হাততালি দেবার ও রেফারিকে গালাগালি দিয়ে খুশি হবার জন্যে একজন লোকও যায়নি।
খবরের কাগজওয়ালাদের মুখে আজ হাসি আর ধরছে না। মালবিকার বিপদের ও শোভনের বীরত্বের কাহিনি ছাপিয়ে কাগজওয়ালারা আজ যত কাগজ বিক্রি করেছে, সারা বছরেও তত বিক্রি হয় না।
মাঠে আজ মস্ত তাঁবু পড়েছে এবং তাঁবুর ভিতরে-বাইরে জনতার মধ্যে কেবল হাজার হাজার কালো মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। তিনবারের প্রদর্শনীর সমস্ত টিকিটই বিক্রি হয়ে গেছে। ধুমধামপুরের জমিদার দুমদাম দে এবং প্যানপ্যানগড়ের মহারাজ ভ্যান ভ্যান সিং নাকি এক-একখানি টিকিটের জন্যে যথাক্রমে পাঁচশো ও হাজার টাকা দিতে চেয়েও একটুখানি দাঁড়াবার ঠাঁই পর্যন্ত পাননি।
ফুলস্টপ কোম্পানির বড় সাহেব মিঃ সেমিকোলন ও তাঁর স্ত্রী মিসেস কমা রাজা। কংকে দেখবার আগ্রহে চল্লিশ টাকার একখানি বক্স অতি কষ্টে কিনতে পেরেছিলেন। তাঁবুর ভিতরে এসে দূর থেকে রাজা কঙের গর্জন শুনেই তাঁদের কান নাকি কালা হয়ে গিয়েছে। এবং পাছে রাজা কংকে দেখলে চোখ তাঁদের কানা হয়ে যায়, সেই ভয়ে নাকি তারা চোখে ঠুলি পরবার জন্যে আবার বেরিয়ে গেছেন!
ভিড়ের জন্যে চৌরঙ্গির মোড় পার হতে না পেরে তিতুরাম তাঁতি সেইখানেই পঁচিশ ত্রিশজন শ্রোতার কাছে রীতিমতো আসর জমিয়ে বলছে–ভায়ারা, রাজা কং সোজা লোক নন! তিনি তাঁর দেশে শুয়ে যখন ঘুমোতেন, বুঝলে কিনা–তাঁর ঠ্যাং থাকত পাতালে, ধড় থাকত পৃথিবীতে, আর বুঝলে কিনা মুণ্ডুটা থাকত আকাশের চাঁদের পাশে!
একজন অবিশ্বাসী শ্রোতা বললে, তাহলে ওইটুকু তাঁবুতে তিনি কেমন করে মাথা গুঁজে আছেন?
তিতুরাম তাঁতি একগাল হেসে বললে, আরে মুখ, তাও জানো না! রাজা কং যে– বুঝলে কিনা–তোর বীর হনুমানের ভায়রা-ভাই! হিঁদুর বেটা হয়ে তুমি কি এ-ও শোনোনি যে, হনুমানজি ইচ্ছে করলেই কড়ে আঙুলটির মতন ছোট্টটি হতে পারতেন? রাজা কংও সেই বিদ্যে জানেন, ছোট তাবুতে ছোটটি হয়ে আছেন।
একজন মাড়োয়ারি ভুড়ি চুলকোচ্ছিল, হনুমানজির নাম শুনেই ভুড়ি চুলকানো ভুলে, উদ্দেশে প্রণাম করে বললে, হাঁ বাবুসাব, ও বাত ঠিক হ্যায়!
আর একজন তিতুরামকে শুধোল, এত খবর তুমি কোথা থেকে পেলে?
তিতুরাম তাঁতি ফিক করে আবার একটু হেসে বললে, খবর কি অমনি পাওয়া যায় ভায়া, খবর রাখতে হয়। আমি খবর পাবো না তো খবর পাবে কে? আমার শাশুড়ির বোনঝির মামিশাশুড়ির বোনঝি যে–বুঝলে কিনা–ওই শোভন ছোকরার পিসেমশাইয়ের মামাশ্বশুর বাড়িতে বুঝলে কিনা কাপড় বেচতে যান!
এত বড় প্রমাণের পরে আর কথা চলে না। অতএব সবাই তিতুরাম তাঁতিকে একজন সত্যবাদী লোক বলেই মেনে নিলে।
শহরের হাটে-মাঠে-বাটে এমনি নানানরকম গুজবের অন্ত নেই। সকলের ভাগ্যে রাজা কঙের সঙ্গে দেখা করবার সুবিধা তো ঘটল না, কাজেই আজ কং সম্বন্ধে যে যেমন কথাই বলুক না কেন, সকলেই তা বিশ্বাস করে খুশি হচ্ছে!
