দেখতে-দেখতে অতবড় গ্রামের সমস্ত ঘর তাসের বাড়ির মতো ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল– তবু কং যাকে খুঁজছে, তাকে পেলে না! নিষ্ফল আক্রোশে সেই প্রকাণ্ড ধ্বংসস্তূপের নিহত ও আহত দেহগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কং তখন ভয়ংকর চিৎকার করতে করতে বুক চাপড়াতে লাগল। সে চিৎকার জাহাজে মালবিকার কানেও পৌঁছোল। শুনে সে ভয়ে শিউরে উঠল, তবু কং আর তার মাঝখানে আছে সমুদ্রের তরঙ্গ, যার কাছে কঙের শক্তি ব্যর্থ!
গ্রামের বাকি সমস্ত লোক তখন উচ্চ প্রাচীরের ওপরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। প্রধান পুরোহিত ও তার চ্যালারা তখন কঙের মেজাজ ঠান্ডা করবার জন্যে সমস্বরে স্তোত্রপাঠ আরম্ভ করলে! কিন্তু কং শান্ত হবে কি, মানুষ পোকাগুলো অমন একতানে ঘ্যানর ঘ্যানর করছে শুনে সে আরও রেগে যেন তিনটে হয়ে উঠল! রেগে দৌড়ে গিয়ে সে পাঁচিলের ওপরে বার বার ধাক্কা মারতে লাগল। যখন দেখলে পাঁচিল একটু টলও না, তখন সুদীর্ঘ লাফ মেরে ওপরে উঠবার চেষ্টা করলে। কিন্তু কঙের দেহ বিশাল হলেও দেড়শো ফুট উঁচু পাঁচিলে লাফিয়ে উঠবার শক্তি তার ছিল না। তখন সে বড় বড় পাথর ছুঁড়তে শুরু করলে। সেই পাথরের ঘায়েও অনেক লোক হত ও আহত হল।
ওদিকে একেবারে সমুদ্রের জলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল কাপ্তেন, শোভন, ডেনহাম ও নাবিকের দল। বেগতিক দেখলেই সমুদ্রে পাড়ি দেবার জন্যে তারা সবাই প্রস্তুত হয়েই আছে।
কঙের কাণ্ড দেখে শোভন বললে, মিঃ ঈঙ্গলহর্ন! আর তো এ দৃশ্য সহ্য হয় না। যত গণ্ডগোলের জন্যে অসভ্যরাই দায়ী বটে, কিন্তু তাদের যথেষ্ট শাস্তিই হয়েছে। ওরা অসভ্য হলেও মানুষ। আর কতক্ষণ হাত-পা গুটিয়ে চোখের সামনে এমন নরহত্যা দেখব?
কাপ্তেন বললেন, কিন্তু আমরা কী করব বলুন! কং যেখানে আছে তার চারিদিকেই গাছপালা আর জঙ্গল। সে খোলা জায়গায় না এলে আমাদের বোমা ব্যর্থ হতে পারে। ওই অসভ্য বনমানুষগুলোকে বাঁচাতে গিয়ে শেষটা কি নিজেরাই বিপদে পড়ব?
কাপ্তেনের কথা ঠিক। শোভন আর কিছু বললে না।
এমন সময়ে হঠাৎ কং তাদের দেখতে পেলে। মালবিকার গায়ের রংয়ের মতন এদেরও গায়ের রং সাদা। তাহলে পুতুল-মেয়েটা নিশ্চয় ওদের দলে আছে। বোধহয়, এমনিধারাই কিছু ভেবে কং আবার গজরাতে-গজরাতে শোভনদের দিকে বেগে ছুটে এল।
কাপ্তেন তো তাই চান। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, সবাই হাতে এক একটা বিষাক্ত বোমা নাও। অতগুলো বোমা হয়তো দরকার হবে না, তবুও বলা তো যায় না সাবধানের মার নেই!
মুর্তিমান বিভীষিকার মতো কং তেড়ে আসছে–তার হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে দাঁতগুলো ঠিক ইস্পাতের ছোরার মতন চকচক করছে, তার হাত দুখানা বড় বড় থামের মতন আকাশের দিকে উঠে গেছে, তার সমস্ত দেহখানা রাগের আবেগে ফুলে ফুলে উঠছে।
কাপ্তেন বীরবিক্রমে কঙের দিকে ছুটে এগিয়ে গেলেন। একটা নগণ্য মানুষ-পোকাকে দম্ভভরে এগিয়ে আসতে দেখে কং আরও বেশি খাপ্পা হয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল। পায়ের কড়ে আঙুলের টিপুনিতে যার নাড়িভুড়ি বেরিয়ে পড়ে, সে চায় তার সঙ্গে লড়াই করতে! কী আস্পর্ধা!
কাপ্তেন তার দিকে টিপ করে বিষাক্ত গ্যাসের বোমা ছুড়লেন। বোমাটা কঙের আসবার পথের ওপরে পড়ে গর্জে উঠল। কং অবাক হয়ে ভাবলে, ওই একরত্তি জিনিস এতজোরে চাঁচাতে পারে।
বোমার ধোঁয়ায় কঙের বিরাট দেহও ঢেকে গেল। সেই ধোঁয়ার বিশ্রী গন্ধটা তার মোটেই পছন্দ হল না–সে ভয়ানক কাশতে লাগল।
তারপর শোভন এবং তারপর ডেনহামও তার দিকে এক একটা বোমা নিক্ষেপ করলে। ধোঁয়া যেন পুরু মেঘের মতন কংকে গ্রাস করে ফেললে!
কাপ্তেন বললেন, ব্যস! দেখো, কী হয়! আর বোধহয় বোমা ছুঁড়তে হবে না!
বোমার ধোঁয়ার ভিতর থেকে কং যখন বেরিয়ে এল, তখন তার আগেকার তেজ আর নেই। তার পা দুটো তখন মাতালের মতন টলমল করছে, মুণ্ডটা থেকে-থেকে কাঁধের ওপর কাত হয়ে পড়ছে এবং ক্রমাগত কাশির ধমকে তার দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু সমুদ্রের তীরে সুদীর্ঘ কালো ছায়া ফেলে প্রচণ্ড কুম্ভকর্ণের মতো কং আসছে–আসছে তবু আসছে! ভয় কাকে বলে তা সে জানে না!
কাপ্তেন বিপুল বিস্ময়ে বললেন, এই একটা বোমা একদল মানুষকে অজ্ঞান করে দিতে পারে, কিন্তু ওই আশ্চর্য দৈত্যটা তিন-তিনটে বোমা হজম করে ফেললে, আচ্ছা, বন্ধু, আমরা এখনও ফতুর হইনি,–এই নাও, তোমাকে আর একটা বোমা উপহার দিলুম। আশা করি, এইবারে তুমি লক্ষ্মীছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়বে?
চতুর্থ বোমাটা করে বুকের ওপরে দড়াম করে ফেটে আবার রাশি রাশি ধোঁয়া বমন করলে সঙ্গে সঙ্গে তার ভিতর থেকে খানিকটা জলীয় বিষ তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল! কং আর-এক পাও চলতে পারলে না, তার চোখ তখন অন্ধ এবং দমও যেন বন্ধ হয়ে গেল, তবু কোনওরকমে একটা মানুষ-পোকাকে ধরবার জন্যে সামনের দিকে দুটো হাত বাড়িয়ে সমুদ্রতীরের বালির ওপরে ধপাস করে সটান সে পড়ে গেল।
শোভনের মনে হল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে হিড়িম্বা-পুত্র রাক্ষস ঘটোৎকচও বোধহয় এমনি করে ধরাশায়ী হয়েছিল।
ডেনহামের মনে হল, তার সামনে যেন বিশ-পঁচিশটা হাতি পাশাপাশি মরে পড়ে রয়েছে।
কাপ্তেন হাঁক দিলেন, শিগগির মোটা লোহার শিকল দিয়ে ওর সর্বাঙ্গ বেঁধে ফেলো। ভয় হচ্ছে? আর কোনও ভয় নেই কং এখন অন্তত তিন-চার ঘণ্টা খুব আরাম করে ঘুমোবে– একটা আঙুলও নাড়তে পারবে না। আমার বোমার গুণ কত!…তাড়াতাড়ি একটা বড় ভেলা তৈরি করে ফেলো! কঙের ওই ছোট্ট খোকার মতো দেহখানি তো জাহাজে তোলা চলবে না, জাহাজের সঙ্গে ভেলায় করে ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে হবে! যাও, যাও, ভ্যাবাকান্তের মতো হাঁ করে দেখছ কী?
