হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি বোমার সাহায্যেই কংকে বন্দি করব! এ যে-সে বোমা নয়,–গ্যাসের বোমা বিষাক্ত গ্যাসের বোমা।
ডেনহাম চমকৃত হয়ে মহা উৎসাহে একটা লক্ষ্য ত্যাগ করে বললে, কী আশ্চর্য! এই সোজা কথাটা তো এতক্ষণ আমার মাথায় ঢোকেনি। ধন্য আপনার বুদ্ধি! হ্যাঁ, বিষাক্ত বোমার ওপরে আর কোনও কথা নেই বটে!
কাপ্তেন হঠাৎ প্রান্তরের দিকে সচকিত চোখে তাকিয়ে বলেন, ওরা কারা? ওরা কারা এদিকে আসে? মানুষ! একটি মেয়ে, একটি ছেলে।
ডেনহাম আহ্লাদে আর এক লাফ মেরে বললে, আরে–আরে! ও যে মিস আর মিস্টার সেন! অ্যাঁ! এ কী কাণ্ড! অবাক!
শোভন ও মালবিকা প্রান্তরের ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে।
ডেনহামও তাদের দিকে ছুটে গিয়ে বললে, মিঃ সেন–
ছুটতে ছুটতেই বাধা দিয়ে শোভন হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, সব কথা পরে শুনবেন। এখন পালিয়ে আসুন–ফটক বন্ধ করুন! কং আমাদের পিছনে-পিছনে আসছে।
কং!
হ্যাঁ, হ্যাঁ, পালিয়ে আসুন–পালিয়ে আসুন!
কং আসছে শুনে সকলেরই পিলে চমকে গেল। লাম্পি বলে একজন লম্বা-চওড়া নাবিক এতক্ষণ সঙ্গীদের কাছে বড়াই করতে করতে আসছিল যে, বোমা ছুঁড়ে কেমন করে সে কঙের মোটা ভুড়ি ফাঁসিয়ে দেবে। এখন কঙের নাম শুনেই সকলের আগে সে ফটকের দিকে এমন লম্বা দৌড় মারলে যে, একবারও আর পিছন ফিরে চাইবার সময় পেলে না!
কেবল কাপ্তেন একবার বললেন, আসুক না কং! আমরা এইখানে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে শক্তি-পরীক্ষা করব।
ডেনহাম বললে, না, না, পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে! শিগগির পালিয়ে আসুন। বলেই ডেনহাম দৌড় মারলে! কং যে কী চিজ সেটা আর বুঝতে বাকি নেই।
দেখতে দেখতে প্রান্তর জনশূন্য হয়ে গেল!
ওদিকে উচ্চ প্রাচীরের ওপর থেকে অসভ্যরা আশ্চর্য দৃষ্টিতে দেখলে, তাদের রাজা কঙের বউ আবার ফিরে এসেছে। নিজেদের চোখকেই তারা যেন বিশ্বাস করতে পারলে না। রাজা কঙের বউ ফিরে এসেছে এমন অসম্ভব ব্যাপার সে-দেশে আর কখনও কেউ দেখেনি।
প্রান্তরের অরণ্যের ভিতর থেকে আচম্বিতে এক ভয়াবহ, বুক দমানো গুরুগম্ভীর গর্জন জেগে উঠল–সে-গর্জন শুনলে পাহাড়ের চূড়াও যেন খসে পড়ে!
.
বারো। কঙের বউ-খোঁজা
কং! কং! কং!-প্রাচীরের ওপর থেকে হাজার হাজার কণ্ঠে চিৎকার উঠল–কং! কং! কং!
প্রান্তরের ওপর পাঁচ-ছয়-তলা অট্টালিকার চেয়ে উঁচু কী-একটা মহাদানব বন্যার বেগে ধেয়ে আসছে চারিদিকে ধোঁয়ার মতন ধুলারাশি উড়িয়ে। প্রান্তরের বড় বড় গাছগুলোও তার বুক পর্যন্ত পৌঁছোয় না।
চিৎকার সমানে চলল–কং! কং! কং! কং! কং! কং! কং!
অসভ্যদের রাজার কি হুকুম হল–দলে দলে লোক ছুটে গিয়ে প্রাচীরের মস্ত বড় ফটকটা সশব্দে বন্ধ করে দিলে।
কিং! কং! কং! রাজা কং তার বউকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসছে!
কিন্তু ফটক বন্ধ হয়েও বন্ধ হল না। তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হবার আগেই কং তার হাতির দেহের চেয়েও মোটা একখানা প্রকাণ্ড পা ফটকের ফাঁকের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছে– আর হুড়কো লাগানো অসম্ভব।
পাছে সে ভিতরে ঢুকে পড়ে, সেই ভয়ে শত শত মানুষ ফটকের দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। কং ভিতরে ঢুকলে কী অমঙ্গল যে ঘটবে, সকলেই তা জানে!
শোভন কাপ্তেনের দিকে ফিরে বললে, মি. ঈঙ্গলহর্ন, এই বিপদের ভিতরে আমার ভগ্নীর আর থাকা উচিত নয়। ওকে আগে জাহাজে পাঠিয়ে দিন!
কাপ্তেন সায় দিয়ে বললেন, ঠিক বলেছেন মিঃ সেন! আচ্ছা, আমি এখনি সে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
তখন ফটকের ওদিকে কং, আর এদিকে শত শত অসভ্য মহা ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিয়েছে। কয়েকজন জাহাজি-গোরাও অসভ্যদের সঙ্গে যোগদান করলে।
আগেই বলেছি, কং তার পা দিয়ে ফটকটা ফাঁক করে রেখেছিল। হঠাৎ সেই ফাঁকের ভিতর হাত চালিয়ে সে একসঙ্গে দুজন অসভ্য ও একজন গোরাকে খপ করে মুঠোর ভিতরে চেপে ধরলে এবং পরমুহূর্তেই সেই তিনজনের দেহ আকারহীন মাংসপিণ্ডে পরিণত হল।
কং ফটকের ওপরে আবার এক প্রচণ্ড চাপ দিলে–সঙ্গে-সঙ্গে ফটকের উপরদিকের একটা অংশ সশব্দে ভেঙে পড়ল। তারপর সে এমন ধাক্কার পর ধাক্কা মারতে লাগল যে, ফটকের বাকি অংশও হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে দেরি লাগল না।
সমুদ্র-তীরে এসে দাঁড়াল যে প্রলয়ঙ্কর কালভৈরবের মূর্তি, তাকে দেখেই হাজার হাজার অসভ্য পঙ্গপালের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল! দুর্জয় ক্রোধে কং আজ উন্মত্ত হয়ে উঠেছে; সে প্রত্যেকবার পা ফেলছে আর তার বৃহৎ পদের চাপে প্রতিবারই তিন-চারজন করে লোকের দেহ ভেঙে চটকে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে-সঙ্গে কী সে গর্জন! সেই গর্জন শুনেই অনেকে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ছে!
মানুষগুলো কে মরল, কে পালাল, আর কেই-বা বাঁচল সেসব দিকে কঙের আজ কোনও লক্ষ্যই নেই,–তার মুণ্ড চারিদিকে ঘুরছে, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চারিদিকে ফিরছে কিন্তু যাকে অন্বেষণ করছে, তাকে যেন পাচ্ছে না!
কং খুঁজছে মালবিকাকে! সে সেই পুতুল-মেয়েকে আবার নিজের বাসায় নিয়ে যেতে চায়! কিন্তু মালবিকা তখন জাহাজে।
এইবারে কং অসভ্যদের গ্রামের দিকে ছুটল! সারি সারি কুঁড়েঘর। কং এক-একবার হাত ছোড়ে আর এক-একখানা ঘরের চাল উড়ে যায়–দেয়াল পড়ে যায়। কং অমনি সেই ঘরের ভিতরে হাত চালিয়ে যারা তার ভয়ে সেখানে গিয়ে লুকিয়েছিল, সেই খুদে-খুদে ঘৃণা মানুষ পোকাগুলোকে টেনে-টেনে বার করে আনে, শূন্যে তুলে তাদের ভালো করে লক্ষ করে দেখে– তারপর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেয় এবং কাতর আর্তনাদ করে সে অভাগারা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে মরে যায়! কান্নায় আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ হয়ে গেল!
