কিন্তু মানুষ-পোকা আর পুতুল-মেয়েটা তো ডুবল না। মাছের মতো সাঁতার কেটে ওরা যে পুকুরের ওপারের দিকে ভেসে যাচ্ছে! বটে! ওইদিকে গিয়ে ডাঙায় উঠে তোমরা আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালাতে চাও? হুঁ, কং-এর হাত ছাড়িয়ে পালানো এত সোজা নয়,দাঁড়াও মজাটা টের পাইয়ে দিচ্ছি।
কং আবার লাফিয়ে লাফিয়ে পুকুরের দিকে নেমে আসতে লাগল।
সাঁতার কাটতে কাটতে শোভন ও মালবিকা কঙের ওপরে দৃষ্টি রাখতে ভোলেনি।
শোভন বললে, মালবি! তাড়াতাড়ি! কং নীচে আসবার আগেই আমাদের ওপারের কাছে যেতে হবে!
মালবিকা বললে, কিন্তু ওপারে গিয়ে ডাঙায় উঠলেই তো কং আবার আমাদের ধরে ফেলবে!
আঃ, যা বলি শোনো না! কং আমাদের কিছুই করতে পারবে না!
কং যখন পুকুরের পাড়ে এসে নামল, শোভন ও মালবিকা তখন পুকুরের ওপারের কাছে এসে পড়েছে!
বড় বড় কয়েকটা লাফ মেরে কং ওপারে ডাঙার ওপরে গিয়ে হাজির হল। পুকুরের দুই দিকে তার দুই সুদীর্ঘ বাহু বাড়িয়ে কং শোভন ও মালবিকার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল– তার তখনকার ক্রুদ্ধ চেহারা দেখলে বুকের রক্ত জল হয়ে যায়!
মালবিকা সভয়ে বলে উঠল, দাদা, এইবারেই আমরা গেলুম।
শোভন বললে, কোনও ভয় নেই। শোনো, যতটা পারো নিশ্বাস নাও। একেবারে পুকুরের তলায় ডুব দাও। এইখানে একটা বড় সুড়ঙ্গ আছে। নীচে গিয়ে সাঁতার কেটো না। হাত দুটো দিয়ে মাথা চেপে রাখো। এসো!
খুব জোরে একটা নিশ্বাস টেনে নিয়ে শোভন ডুব দিলে। মালবিকাও তাই করলে।
খানিকটা নীচে নামতেই জলের ভিতরে তারা একটা প্রবল টান অনুভব করলে–এবং সেই টানে তাদের দেহ তিরবেগে ছুটে চলল–হয়তো কোনও অজানা মরণের দিকেই! তারা বেশ বুঝলে, জলের গতি যেদিকে, এখন হাজার বাধা দিলেও সেদিকে ছাড়া আর কোনওদিকে তাদের যাবার উপায় নেই। তাদের দেহ ঘুরতে-ঘুরতে জলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, এখন সামনে যদি কোনও বাধা থাকে, তাদের দেহ তাহলে কাচের পেয়ালার মতই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
এইবারে মালবিকার কষ্ট হতে লাগল। নিশ্বাস বন্ধ করে মানুষ কতক্ষণ থাকতে পারে? এ ভেসে যাওয়ার শেষ কোথায়?–জলের টান কখন তাদের মুক্তি দেবে? আর বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে দম বন্ধ হয়েই সে যে মারা পড়বে।
আচম্বিতে জলের টান খুব কমে গেল–মালবিকা দেখলে, আলোয় জলের ভিতরটা ধবধব করছে। তাড়াতাড়ি সে হাত দিয়ে জল কেটে পায়ের ঠেলায় নিজের দেহটাকে উপরপানে তুলে দিলে।
কী আনন্দ! ওই তো আকাশ পূর্ণিমার রূপোর মতন উজ্জ্বল! তার সামনেই ভেসে চলেছে শোভন। তারা এখন এক নদীর ভিতরে এবং নদীর দু-ধারে খালি পাহাড় আর বন।
মালবিকা খুব খুশি হয়ে বলে উঠল, দাদা, দাদা! এ আমরা কোথায় এলুম–কেমন করে এলুম?
শোভন বললে, পুকুরের তলায় সুড়ঙ্গ দিয়ে আমরা এই নদীতে এসেছি। এই নদীর জন্ম ওই পুকুরে। আর এই নদী গিয়ে পড়েছে একেবারে সেই প্রান্তরের কাছে। জলের যেরকম টান দেখছি, আমাদের খালি ভেসে থাকলেই চলবে! এখানে এসেছি স্থলপথে, কিন্তু এখন জলপথে তার চেয়ে ঢের সহজেই আমরা প্রান্তরের কাছে গিয়ে পড়ব।
মালবিকা বললে, ওহো, কী মজা! কিন্তু দাদা, দৈত্য কং আমাদের পিছনে-পিছনে তেড়ে আসছে না তো?
শোভন বললে,কং যাই-ই হোক, সে পশু ছাড়া আর কিছুই নয়! কী কৌশলে আমরা তাকে ফাঁকি দিলুম, হয়তো সে সেটা বুঝতেই পারবে না। আর, যদিও পারে, তবে তাকে আসতে হবে স্থলপথে, অনেক ঘুরে! সে সাঁতার জানে না; নদীর জল যেখানে খুব গভীর, সেখানে সে আসতে পারবে না। আমাদের আর ভয় নেই। কঙের ঢের আগেই আমরা প্রান্তরের কাছে গিয়ে পড়ব।
.
এগারো । কঙের প্রত্যাগমন
প্রান্তরের ওপর দিয়ে আবার নতুন একদল নাবিক খুলি-পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। তাদের সঙ্গে একখানা বোট, ঝুলোনো সাঁকো তৈরি করবার জন্যে রাশীকৃত দড়িদড়া, এবং আরও নানানরকম জিনিসপত্তর রয়েছে।
দলের আগে আগে দেখা যাচ্ছে কাপ্তেন ঈঙ্গলহন ও ডেনহামকে। এরা সবাই চলেছে মালবিকা ও শোভনকে উদ্ধার করতে।
কাপ্তেন বললেন, আমি খালি মিস সেন আর মি. সেনকে উদ্ধার করব না। আমি কংকেও বন্দি করবার চেষ্টা করব।
ডেনহাম বিস্ময়ে দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে বললে, কেন? কংকে বন্দি করে কী হবে?
কাপ্তেন বললেন, আমাদের মুখের কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি সভ্য জগৎকে দেখাতে চাই, কী ভীষণ দৈত্য এখনও এই পৃথিবীতে বাস করছে। আমাদের এই অদ্ভুত আবিষ্কারে সারা দুনিয়ায় হই-চই উঠবে,–আর লোকের মুখে-মুখে আমাদের নাম ফিরতে থাকবে, আমরা অমর হয়ে যাব!
ডেনহাম বললে, কং হবে মানুষের হাতে বন্দি! অসম্ভব! পাগলের প্রলাপ।
কাপ্তেন খাপ্পা হয়ে বললেন, পাগলের প্রলাপ! কেন?
ডেনহাম বললে, আপনি কংকে এখনও দেখেননি বলেই এই কথা বলছেন। সে এক সজীব পাহাড়! পিঁপড়েরা যদি বলে মানুষকে বন্দি করব,তাহলে সেটা কি তাদের পাগলামি হবে না? কঙের কাছে আমরা কীটপতঙ্গ-পিঁপড়ের মতোই তুচ্ছ!
কাপ্তেন বললেন, কিন্তু সে পশু, আর আমরা হচ্ছি মানুষ! মানুষের বুদ্ধির কাছে পশুকে হার মানতেই হবে। কংকে বন্দি করব বলে আমি অনেক বোমা এনেছি।
ডেনহাম বললে, বোমা আমাদেরও কাছে ছিল। তবু এতগুলো লোকের প্রাণ গেল!
সেটা তোমাদেরই বুদ্ধির দোষে!
মানলুম! কিন্তু বোমা ছুঁড়ে কংকে বড়জোর আমরা হত্যা করতে পারি। তাকে হত্যা করা এক কথা, আর জ্যান্ত অবস্থায় বন্দি করা অন্য কথা।
