ক্রুদ্ধ কং টপ করে এক হাত বাড়িয়ে পুকুরের উপরকার খাড়া পাহাড়ের গুহার ভিতরে মালবিকার দেহকে রেখে দিলে, তারপর মহাগর্জন করে প্রতি আক্রমণ করলে। তারপর সে কী ঝটাপটি! অজগরটা পাকে-পাকে কঙের সর্বাঙ্গকে নাগপাশে বেঁধে ফেললে, তারপর চেষ্টা করতে লাগল তাকে পুকুরের কালো জলে টেনে আনবার জন্যে! কং এবার খালি তার বজ বাহু দিয়ে নয়, তার বড় বড় ধারালো দাঁত দিয়েও লড়ছে! সেই রুদ্রমূর্তি কুমির-দানব যা পারেনি, এই আশ্চর্য জলচর অজগর সেই অসাধ্যই সাধন করলেনাগপাশের বাঁধনে কঙের দুই চক্ষু যেন ঠিকরে কপালে উঠল! সে তবু দুই হাতে অজগরের গলা টিপে রইল এবং বার বার কামড় দিয়ে অজগরের ভীষণ বন্ধন ছিঁড়ে ফেলবার চেষ্টা করতে লাগল।
দেহের সমস্ত শেষ শক্তি এক করে দেহের প্রত্যেক মাংসপেশি ফুলিয়ে কং অজগরের মাথাটা দুই হাতে আপনার বুকে চেপে ধরে একেবারে থেতলে ফেললে। অজগরের ল্যাজের দিকটা তখন ছটফট করতে করতে জলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলকং এক পায়ে তাকে মাড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চূর্ণ-বিচূর্ণ মাথাটা সজোরে পাহাড়ের ওপরে আছড়ে ফেললে! আবার দ্বীপের রাজা কঙের জয়। কিন্তু এবারে তার আর বিজয়-আনন্দ প্রকাশ করবারও শক্তি ছিল না–অজগরের নাগপাশ তার সেই বিরাট দেহকেও এমনি অবশ করে দিয়েছিল যে, সে টলতে টলতে মাটির ওপরে ধপাস করে বসে পড়ল। এমনকী, সেই বিশাল অজগরের যে বিপুল কুণ্ডলী তখনও তার চারিপাশে পাকিয়ে আছে, তার বাইরে গিয়ে বসবার শক্তিটুকুও কঙের তখন ছিল না। দুই চোখ মুদে পাহাড়ের গায়ে মাথা কাত করে রেখে ভোঁস-ভোঁস শব্দে সে হাঁপাতে লাগল।
শোভন দেখলে, এ এক সোনার সুযোগ! এমন সুযোগ সে হারালে না–পা টিপে টিপে কঙের পিছনদিক দিয়ে ওপরে উঠে শোভন সেই খাড়া-পাহাড়ের গুহার পাশে গিয়ে হাজির হল।
বাইরে যখন দুই মত্ত দানবের বিষম লড়াই বেধে গেছে, গুহার ভিতরে মালবিকার তখন আবার জ্ঞানোদয় হয়েছে। পাথরের ঠান্ডা, আদুড়-গা ছুঁয়ে সে ভাবলে, এ আবার আমি এলুম কোথায়? কং কোথায় গেল? বাইরেও মাতামাতি আর দাপাদাপি করছে কারা? আবার কি কোনও নতুন দানবের আবির্ভাব হয়েছে,–না ভূমিকম্প হচ্ছে?
গুহার মুখ খোলাই রয়েছে। বাইরে কী কাণ্ডকারখানা চলছে, সেটা একবার উঁকি মেরে দেখে আসবার জন্যে মালবিকার অত্যন্ত কৌতূহল হল, কিন্তু তার ভরসায় কুলালো না।
হঠাৎ গুহার মুখে কার ছায়া এসে পড়ল। মালবিকার বুকটা ধড়াস করে উঠল! পা টিপে টিপে চুপিচুপি এ আবার কোন নতুন শত্রু গুহার ভিতরে তাকে আক্রমণ করতে এল? মালবিকা ভয়ে সেদিকে তাকাতে পারলে না।
মালবি, মালবি শিগগির ওঠ!
এ যে তার দাদার গলা! কঙের গুহায় তার দাদা! অসম্ভব। সে কি ভুল শুনছে! সে স্বপ্ন দেখছে! সে পাগল হয়ে গেছে!
শিগগির শিগগির! মালবি, আমি এসেছি। যদি বাঁচতে চাস, এখান থেকে পালাতে চাস, তবে উঠে পড়–দেরি করিস নে!
দাদা, দাদা! আমার দাদা এসেছ?
চুপ! পরে দাদা বলে ডাকবার আর কথা কইবার অনেক সময় পাওয়া যাবে। কং। এখনি আসবে, আর তাহলেই আমি মারা পড়ব। উঠে আয়!
কোথায় যাব?
গুহার ধারে আয়। ঠিক তলাতেই একটা পুকুর দেখতে পাচ্ছিস?
হ্যাঁ।
তুই তো খুব ভালো সাঁতার আর ডাইভ করতে জানিস। এখান থেকে লাফিয়ে পুকুরে পড়তে পারবি?
পারব। কিন্তু তারপর? পুকুর তো ওইটুকু! আর ওইখানেই যে কং বসে আছে! আমরা পালাব কেমন করে?
সে কথা পরে বলব। এখন কংকে পুকুরের ধার থেকে সরাতে হবে। নইলে বলা যায় না তো, পুকুরের ভিতরে হাত বাড়িয়েই হয়তো সে আমাদের ধরে ফেলবে। তুই তৈরি হয়ে থাক। আমি বললেই লাফিয়ে পড়বি। আমি কংকে রাগিয়ে দি।
গুহার ধার থেকে বড় বড় পাথর তুলে নিয়ে শোভন ছুঁড়তে লাগল, কংকে টিপ করে! সঙ্গে-সঙ্গে সে যা মনে আসে তাই বলে চাঁচাতে লাগল–ওরে ছুঁচো কং! ওরে নেংটি ইঁদুর! ওরে ক্ষুদে খোকা! ওরে ধেড়ে পোকা! আয় এখানে, আমি তোর সঙ্গে আজ কুস্তি লড়ব!
দৈত্য কং তখনও কাতরভাবে হাঁপাচ্ছিল। দু-একটা পাথর গায়ে লাগতেই সে চমকে চোখ খুলে দেখে–আঁঃ ও কী ব্যাপার? তারই গুহার মুখে একটা মানুষ-পোকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাঁচাচ্ছে, আর লাফাচ্ছে, আর তাল ঠুকছে! যেখানে যমও ভয়ে ঢোকে না, সেখানে একটা বাজে মানুষ-পোকা তিড়িং বিড়িং করছে! এও কি সহ্য হয়?
হুঙ্কার দিয়ে লাফ মেরে কং দাঁড়িয়ে উঠল! নিজের সমস্ত কষ্ট ভুলে কালবোশেখির কালো মেঘের মতো কং রুদ্রমূর্তিতে গুহার পথে উঠতে লাগল।
আরে গেল! মানুষ-পোকাটা এখনও যে নাচে, ঢিল ছোড়ে, তাল ঠোকে! ওটা কি জানে না আমি হচ্ছি বিশ্বজয়ী রাজা কং আর ও গুহা হচ্ছে আমারই রাজবাড়ি, আর ওখান। দিয়ে পালাবার কোনও পথ নেই?
একটা ঢিল তার হাঁকরা মুখের মস্ত গর্তে ঢুকে তার গলায় গেল আটকে। মুশকিলে পড়ে সে খক খক করে খানিক কেশে ঢিলটাকে গলা থেকে বার করে দিলে। খুদে মানুষ পোকার নষ্টামি দেখে কং রেগে টং হয়ে উঠল! দুই হাতে বুক চাপড়াতে-চাপড়াতে সে প্রায় গুহার কাছে এসে পড়ল।
আরে-আরে–ও কী? মানুষ-পোকা আর সেই জ্যান্ত পুতুলমেয়েটা যে পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদের ভরসা তো কম নয়–এখনি ডুবে মরবে যে!
গুহার ধারে মুখ বাড়িয়ে কং অবাক হয়ে দেখতে লাগল। সে-ও ওদের মতো জলে আঁপিয়ে পড়তে পারলে না, ওইখানেই তার হার। তার তালগাছ সমান দেহ নিয়ে সাধারণত নদী বা হ্রদ সে অনায়াসেই হেঁটে পার হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে জানে, পুকুরের গভীর জলে তার বিশাল দেহও থই পাবে না! পায়ের তলায় মাটি থাকলে কং অসম্ভবও সম্ভব । করতে পারে, কিন্তু অথই জলে সে সাঁতার কাটতে পারে না।
