মাঝে-মাঝে ভরসা করে দু-পা বেশি এগিয়ে সে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছে মালবিকার অবস্থাটা। কিন্তু কঙের হাতের চেটোয় কী বরাবর ঠিক একভাবেই স্থির হয়ে পড়ে রয়েছে– বোধহয় এখনও তার মূর্ছা ভাঙেনি।
জঙ্গল ক্রমেই পাতলা হয়ে আসছে–ঝোপঝাপ, লতাপাতা আর বড় দেখা যায় না। খানিক তফাতে তফাতে বড় গাছগুলো কেবল দাঁড়িয়ে রয়েছে!
পাহাড়ের ঢালু গা ক্রমেই ওপরে উঠে গিয়েছে–শোভনের চোখের সুমুখে এখন স্পষ্ট জেগে উঠল মড়ার মাথার খুলির মতো সেই পাহাড়টার ন্যাড়া শিখর। কং সেই দিকেই যাচ্ছে।
শোভন বুঝলে, এই সব উঁচু শিখরের উপরেই কঙের বাসা আছে। এখানে গাছপালা ঝোপঝাপ জঙ্গল নেই। কাজেই এখানকার সাংঘাতিক জীবজন্তুরা খুব সম্ভব এদিকে-বড়-একটা বেড়াতে বা শিকার খুঁজতে আসে না এবং কখনও-সখনও এলেও কঙের তীক্ষ্ণ চোখের সামনে সহজেই তাদের ধরা পড়বার সম্ভাবনা! এইসব বুঝেসুঝেই বুদ্ধিমান কং হয়তো এখানে তার আস্তানা গেড়ে বসেছে।
শোভনের শরীর আর তার মনের বশে থাকতে চাইছে না। এখন বৈকাল। আজ খুব ভোর থেকেই তার শরীরের ওপর দিয়ে যেসব ধাক্কা চলে যাচ্ছে, অন্য কেউ হলে এতক্ষণ হয়তো এ সব সহ্য করতে পারত না। অন্য কেউ কেন, অন্য সময়ে সে নিজেই কি এতটা সইতে পারত; কেবল তার আদরের বোনের মায়ামাখা মুখখানিই এতক্ষণ তাকে দু-পায়ের ওপরে সোজা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তার বোনের জন্যে আজ কত বিদেশি পর হয়েও প্রাণ দিলে, হয়তো আবার আরও কত লোক, প্রাণ দিতে আসছে! আর রক্তের টান ভুলে এখন কি সে অমানুষের মতো বিশ্রাম করতে পারে? নিজের শরীরকে নিজে নিজেই ধমক দিয়ে সে ফের চাঙ্গা করে তুললে–দ্বিগুণ উৎসাহে বেগে কয় পা এগিয়েই সে আবার চমকে ও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কী সর্বনাশ, তার খুব কাছেই ওই যে কং! অতিরিক্ত উৎসাহকে দমন করে আবার সে পিছিয়ে এল।
এমন সময়ে একটি দৃশ্য তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে। পাহাড়ের ওপর মস্ত বড় একটা সুড়ঙ্গ রয়েছে এবং তার ভিতর দিয়ে হুড় হুড় করে জল বেরিয়ে আসছে। পাহাড়ের গর্ভে নদী। শোভন মুখ ফিরিয়ে দেখলে, ঢালু পাহাড়ের গা বেয়ে খানিক দূরে গিয়ে নদীর জলধারা একটা জঙ্গলের কাছে মোড় ফিরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।…এই দৃশ্য দেখে তখন আর কোনও কথা মনে হল না বটে, কিন্তু খানিক পরেই সে এক অদ্ভুত আবিষ্কার করলে!
ধীরে-ধীরে সে ক্রমেই ওপরে উঠছে। তারপর সূর্যের শেষ আলোকরেখা যখন আকাশের গায়ে মিলিয়ে যাই-যাই হয়েছে, কং তখন পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরের তলায় এসে দাঁড়াল। সেখানে পাহাড়ের গা ঢালু হয়ে চারিদিক থেকে খানিকটা নেমে গিয়েছে–মাঝখানে খানিকটা সমতল জায়গা ঠিক যেমন সার্কাসের গ্যালারির মাঝখানে থাকে খেলা দেখাবার খোলা জমি।
সেই সমতল জায়গাটার একপাশে রয়েছে পুকুরের মতো একটা জলাশয়! সেই পুকুরের দিকে কং সন্দেহপূর্ণ নেত্রে তাকিয়ে খানিকক্ষণ স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল। কী দেখছে কং? পুকুরের কালো জল তো স্থির হয়ে আছে–ওখানে জীবনের কোনও লক্ষণই নেই! খানিকক্ষণ জলের দিকে তাকিয়ে থেকে কং আবার এগিয়ে গেল। পুকুরের ওপরেই খাড়া-পাহাড়, এবং জল থেকে বিশ-পঁচিশ ফুট উপরেই সেই খাড়া-পাহাড়ের গায়ে একটা বড় গুহা।
কঙের দেখাদেখি শোভনও পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল! অল্পক্ষণ পরে সে লক্ষ করলে, পুকুরের যেদিকে খাড়া-পাহাড় নেই, কেবল সেইদিকে জল যেন চক্রাকারে ঘুরছে। এর মানে কী? তবে কি পুকুরের তলায় জল বেরুবার কোনও পথ আছে?
ধাঁ করে শোভনের মনে পড়ে গেল সেই সুড়ঙ্গ-নদীর কথা। পুকুরের জল যেদিকে ঘুরছে, সেইদিকেই খানিক আগে সে যে সেই সুড়ঙ্গ-নদী দেখে এসেছে। এ এক মস্ত আবিষ্কার!
শোভন ভাবতে লাগল, আজ সকালে প্রান্তরের কাছে সে প্রথম যে নদী দেখেছে, তারপর থেকে সারা পথেই জমি ধীরে ধীরে ক্রমেই উঁচু হয়ে উঠেছে। এই পাহাড়ের শিখরের কাছে এসে চড়াই শেষ হয়েছে।
এই পাহাড়ে পুকুরের জল যখন এক জায়গায় চক্রাকারে ঘুরছে, তখন পুকুরের নীচে নিশ্চয়ই জল বেরুবার একটা পথ আছে। সে পথ কোথায় গেছে? নিশ্চয়ই খানিক আগে দেখা সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে।
এবং জল যখন বেরুচ্ছে, অথচ পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে না, তখন জলের যোগান আসছে কোথা থেকে? পাতাল থেকে? নিশ্চয়ই পুকুরের তলায় গুপ্ত উৎস আছে। পাহাড়ের উপরকার অধিকাংশ সরোবর বা হ্রদের তলাতেই যা থাকে।
প্রান্তরের কাছে সেই যে নদী, এই পাহাড়ের শিখরেই তার উৎস। পাহাড়ের গা ক্রমেই ঢালু হয়ে যখন প্রান্তরের প্রায় কাছে গিয়ে নেমেছে, তখন জলের ধারাও এঁকে-বেঁকে ভীষণ ডাইনোসরের হ্রদ হয়ে নিশ্চয়ই একেবারে সেই প্রান্তরের নদীর ভিতর দিয়েই বয়ে গেছে! শোভনের এই অদ্ভুত আবিষ্কারের কী আশ্চর্য ফল হয় একটু পরেই সেটা ভালো করে বোঝা যাবে। তার হিসাব খুব ঠিক। কেউ একটা ছোট নৈবেদ্যের আকারে মাটির পাহাড় বানিয়ে তার মাথায় জল ঢেলে পরীক্ষা করলেই দেখবে, সে জল একেবারে নীচে না গিয়ে পারবে না।
ওদিকে কং তখনও কেন যে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে পুকুরের পানে তাকিয়ে আছে, শোভন তার কারণ বুঝতে পারলে না! সে-ও বারকয়েক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুকুরের দিকে তাকাতে লাগল। একটু পরেই সে-রহস্যও স্পষ্ট হল। পুকুরের কালো জলের তলায় আরও বেশি কালো কী একটা যেন এঁকে-বেঁকে ওপরে উঠে আসছে! মোষের পেটের মতন মোটা একটা অজগর সাপ। কঙের সাবধানী চোখ আগেই তাকে দেখে ফেলেছে এবং সে-ও কংকে দেখেছে। সে ভয়ানক সাপটা যে কত লম্বা, ভগবানই তা জানেন কিন্তু সে যখন জলের ভিতর থেকে বেরিয়ে কংকে তেড়ে এল, তখনও তার দেহের নীচের দিকটা জলের ভিতরেই রইল।
