অতি উৎকণ্ঠার সঙ্গে মালবিকা বলে উঠল–না, না, না!
মালবিকা চায়, কং জয়লাভ করুক। কং বড় কম ভয়ানক নয়, তার হাতে বন্দিনি হওয়াও মরণেরই সামিল, কিন্তু এই ভূতুড়ে দানবের মুখগহ্বরে যাওয়ার চেয়ে কঙের কবলগত হওয়া অনেক ভালো।
কং কোনওরকমে সে যাত্রা বেঁচে গিয়ে আবার উঠে দানবটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনের চিৎকারে পাহাড়ের পাথরও যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। দানব আবার তার সাংঘাতিক পা ছুড়লে কং আবার দূরে ছিটকে গিয়ে ভূতলশায়ী হল।
কং আবার উঠে দাঁড়াল। সে আর গর্জনও করলে না, বুকও চাপড়ালে না। বোধহয় সে বুঝলে, এরকম বলিষ্ঠ ও প্রচণ্ড শত্রুকে চেঁচিয়ে বা বুক চাপড়ে ভয় দেখাবার চেষ্টা করা মিথ্যা! এবারে সে খুব সাবধানে এগিয়ে এল এবং তীক্ষ্ণ সতর্ক দৃষ্টিতে একটা ফাঁক খোঁজবার চেষ্টা করতে লাগল। এমন সব শত্ৰু তার কাছে নতুন নয়। এদের কাবু করবার ফিকির সে জানে।
কং হঠাৎ এক লাফে দানবের সুমুখে এল এবং তার উপরকার একখানা পা ধরে একেবারে ভেঙে মুচড়ে দিলে! দানবটাও তার কাঁধ কামড়ে ধরলে কংও আবার তফাতে সরে গেল!
কং আবার এল–আবার এক লাফে দানবের গলা চেপে ধরলে আবার দুইজনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল–এবং দানবটা আবার তাকে লাথি মারলে।
কিন্তু এবারের লাথিতে আর আগেকার জোর ছিল না তাই লাথি খেয়ে মাটিতে পড়বার আগেই কং যা চাচ্ছিল সেই সুযোগটা পেলে,–সে দানবের পিছনের একখানা পা খপ করে ধরে ফেললে এবং সঙ্গে সঙ্গে এক মোচড় দিতেই দানবটা একেবারে হুড়মুড়িয়ে মাটির ওপরে লম্বা হয়ে পড়ল! চোখের পলক ফেলবার আগেই কং একেবারে তার পিঠে চড়ে বসল এবং নিজের দুই পায়ে তার কাঁধ চেপে ধরে দুই হাতে তার দুই চোয়াল বাগিয়ে ধরে প্রাণপণ শক্তিতে দিলে এক বিষম হঁচকা টান। কী হাতের জোর কঙয়ের! দানবের সেই বৃহৎ চোয়াল। চড়চড় করে চিরে গেল! সঙ্গে-সঙ্গে এক লাফে কং আবার দাঁড়িয়ে উঠল! দানবটা মৃত্যুযন্ত্রণায় পাকসাট খেতে-খেতে যতই ছটফট করে, বিজয়-উল্লাসে অধীর হয়ে কং তত হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। তারপর দানবটার দেহ যখন একেবারে স্থির ও আড়ষ্ট হয়ে গেল, কং তখন খুব খুশি হয়ে কচরকচর করে নিজের ভাষায় কী বলতে-বলতে বারংবার মালবিকার পানে তাকাতে লাগল, যেন সে তার মুখে নিজের বীরত্বের জন্যে দু-চারটে বাহবা শুনতে চায়!
কিন্তু মালবিকার তখন কোনও শক্তিই ছিল না–বিপুল উত্তেজনায় আবার তার জ্ঞান লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কং অত্যন্ত যত্ন ও মমতার সঙ্গে তার দেহকে তুলে নিলে।
এই বিশ্রী জানোয়ারটা নোংরা হাতে আবার তার ভগ্নীর দেহ স্পর্শ করছে দেখে, শোভন রাগে যেন খেপে গেল! সে গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবার উপক্রম করলে। কিন্তু তারপরে এই ভেবে আত্মসংবরণ করলে যে, কংকে বাধা দেবার মিছে চেষ্টা করে যেচে নিজের মরণকে ডেকে এনে লাভ কী? তাতে তো মালবিকা মুক্তি পাবে না। তার পক্ষে এখন একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে, লুকিয়ে কঙের পিছনে পিছনে থাকা। তাহলেই যথাসময়ে ডেনহাম লোকজন ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ফিরে এলে মালবিকাকে উদ্ধার করা খুবই সহজ হবে।
ওদিকে কঙের ব্যবহার দেখে বেশ বোঝা গেল যে, গুহার ভিতরকার দুষ্ট-মানুষ-পোকার কথা তার আর কিছুই মনে নেই! সে পুতুলের মতন মালবিকাকে নিজের হাতের চেটোয় নিয়ে আবার পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শোভন ও ডেনহাম তখন নিশ্চিন্ত হয়ে গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে দ্রাক্ষালতা বেয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠল।
শোভন বললে, পোল তো আর নেই! আপনি ওপারে যাবেন কেমন করে?
ডেনহাম বললে, যেমন করে হোক, নদী পার হবই। কিন্তু মি. সেন, এই নরকে আপনাকে একা ফেলে যেতে আমার মন সরছে না।
শোভন বললে, আমার সঙ্গে থেকেই বা আপনি কী করবেন? খালি হাতে আমরা দুজনে কিন্তু কঙের সঙ্গে লড়তে পারব না। বন্দুক চাই, বোমা চাই, লোকবল চাই। আপনি তাই আনতে যান। কঙের পিছনে কোনওদিকে আমি গেছি, পথে সে চিহ্ন রেখে যাব।
ডেনহাম বললে, হ্যাঁ, এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। বেশ, তাই হোক।
শোভন বললে, আর এখানে সময় নষ্ট করলে কংকে হয়তো শেষটা হারিয়ে ফেলব। বিদায় বন্ধু, বিদায়!
বিদায়! ভগবান আপনাকে সাহায্য করুন।
দূরে বনের ভিতরে মড় মড় করে গাছ-ভাঙার শব্দ হচ্ছে। কং তার পথ সাফ করতে করতে বাসায় ফিরে চলেছে। বাজপোড়া গাছের পাশে দানবটার বিশাল দেহ পড়ে রয়েছে। মরা জন্তুর মাংসের গন্ধ যে নীচে নদীর তীরে গিয়ে পৌঁছেছে, সেই প্রমাণ দেবার জন্যে দলে দলে কাছিমের মতো বড় মাকড়সা ও কুমিরের মতো বড় গিরগিটি এবং আরও সব কত বিটকেল জন্তু দানবের সেই আড়ষ্ট দেহের দিকে এগিয়ে আসছে।
শোভন শিউরে উঠে কঙের সন্ধানে ছুটল।
.
দশ। জলচর অজগর
কং কোন দিকে গেছে, তা খোঁজবার জন্যে শোভনকে বিশেষ বেগ পেতে হল না। কোথাও ধুলোর ওপরে প্রকাণ্ড পায়ের দাগ, কোথাও-বা গাছের ভাঙা ডাল পড়ে রয়েছে;–সেইসব চিহ্ন দেখে সে অনায়াসেই ঠিক পথে এগিয়ে চলল। সমস্ত শত্ৰু বধ করে কংও এখন নিশ্চিন্ত হয়েছিল, তাই এখন সে পরম আরামে ধীরে-ধীরে হেলতে-হেলতে দুলতে-দুলতে অগ্রসর হচ্ছিল, কাজেই শোভন শীঘ্রই তার নাগাল ধরে ফেললে। কিন্তু সে খুব সাবধানে লুকিয়ে লুকিয়ে পথ চলতে লাগল,–কেন না একবার করে চোখে পড়ে গেলে তার যে কী দুর্দশাটাই হবে, সেটা সে ভালো করেই জানে! পথের ওপরে নানা আকারের আরও সব পায়ের দাগ দেখে এও সে বুঝতে পারলে যে, এখান দিয়ে কঙের মতো প্রকাণ্ড বহু রাক্ষুসে জীবই আনাগোনা করে থাকে, তারাও তাকে দেখতে পেলে জামাইআদর করবে না। এখানে পদে-পদে বিপদ, একটু অন্যমনস্ক হলেই প্রাণটা বাজে-খরচ হতে বিলম্ব হবে না!
