কং আবার গুঁড়ি ধরে নাড়া দিলে, আবার কয়েকজন লোক নীচে গিয়ে পড়ল। আবার গুঁড়ি ধরে নাড়া, আবার মনুষ্য-বৃষ্টি।
আর একজন মাত্র মানুষ সাঁকোর ওপরে আছে। সে এমন প্রাণপণে গুঁড়িটা জড়িয়ে রইল যে, কং অনেক নাড়া দিয়েও তাকে স্থানচ্যুত করতে পারলে না। তখন সে একটানে গুঁড়িসুদ্ধ মানুষকে শূন্যে তুলে নদীগর্ভে নিক্ষেপ করলে। নদীগর্ভ তখন হরেকরকম বীভৎস জানোয়ারে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে; আসন্ন ভোজের সম্ভাবনায় তারা পরস্পরের সঙ্গে লড়তে লাগল এবং আহত মানুষদের মর্মান্তিক আর্তনাদে আকাশ, বাতাস, পর্বত ও অরণ্য ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।
নিজের গুহায় নিরুপায় হয়ে বসে মহা আতঙ্কে ও স্তম্ভিত নেত্রে শোভন এইসব হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা দেখতে লাগল। ইতিমধ্যে হয়তো মানুষের গন্ধ পেয়েই এক বিরাট মাকড়সা দ্রাক্ষালতা বেয়ে কখন যে ওপরে উঠতে শুরু করেছে, শোভন প্রথমটা তা টের পায়নি। যখন। দেখতে পেলে, মাকড়সাটা তখন প্রায় গুহার মুখে এসে পড়েছে, দুটো ক্ষুধার্ত ড্যাবডেবে ভীষণ চক্ষু শোভনের দিকে তাকিয়ে আছে। শোভন তাড়াতাড়ি ছোরাখানা বার করলে–এই ছোরাখানাই তখন তার একমাত্র সহায়। সে ছোরার আঘাতে দ্রাক্ষালতা কেটে দিলেলতাসুদ্ধ মাকড়সাটা নীচে পড়ে গেল।
ডেনহামের চিৎকার শোনা গেল–মি. সেন। মি. সেন।
আবার কী ব্যাপার, দেখবার জন্যে শোভন গুহার ভিতর থেকে মুখ বাড়ালে। একখানা লোমশ, কৃষ্ণবর্ণ গাছের গুঁড়ির মতন প্রকাণ্ড বাহু পাহাড়ের ওপর থেকে গুহার দিকে নেমে আসছে। পাহাড়ের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে কং তাকে ধরবার চেষ্টা করেছে। শোভন সাঁৎ করে গুহার ভিতরে সরে গেল। তারপর হাতখানা যেই গুহার মুখে এল, শোভন অমনি তার ওপরে বসিয়ে দিলে ছোরার এক ঘা। হাঁউ-মাউ করে চেঁচিয়ে কং তখনি হাত সরিয়ে নিলে! নিজের রক্তমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে সে সবিস্ময়ে ভাবতে লাগল–মানুষ পোকাগুলো তাহলে কামড়াতেও জানে! ওদিকের গুহা থেকে ডেনহাম একখানা বড় পাথর ছুড়লে–পাথরখানা সিধে এসে ঠক করে তার নাকের ডগায় লাগল। চোট খেয়ে কং আরও চটে গেল–অ্যাঃ, আমার নাকের ডগায় পাথর ছুঁড়ে মারা! রোস তো, মজাটা দেখাচ্ছি তবে! বোধহয় এইরকম একটা কিছু ভেবেই কং আবার পাহাড়ের ধারে ঝুঁকে পড়ে গুহার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে শোভনকে খুঁজতে লাগল–ছেলেরা যেমন করে দেওয়ালের গর্তে হাত ঢুকিয়ে পাখির বাচ্চা খোঁজে। শোভন আড়ষ্ট হয়ে সেই গুহার পিছনের দেয়ালে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
.
নয়। কুমির-ক্যাঙারু
বাজপোড়া গাছের ওপরে এতক্ষণ পরে মালবিকার জ্ঞান ফিরে এল।
প্রথমটা কিছুই তার মনে পড়ল না। একবার এপাশ, আর একবার ওপাশ করে ব্যথা বোধ হল–আবার চিত হয়ে দেখলে, ওপরে রোদের সোনার জলে ধোয়া নীল আকাশ।
পিঠে কেন লাগে? কোথায় সে? ধড়মড় করে উঠে বসে দেখে, চারিদিকে পাহাড়, বন, নদী। এখানে সে কেমন করে এল?
আচম্বিতে তার মনের মধ্যে জেগে উঠল, অসভ্যদের ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, গরিলারূপে নর্তকদের নাচ, হাজার-হাজার মশালের আলো, আকাশছোঁয়া পাঁচিলের প্রকাণ্ড ফটক, প্রান্তরের দুই থামওয়ালা পাথরের বেদি, সহস্র কণ্ঠের চিৎকার–এবং তারপর, সেই বিভীষণ গরিলা দানব–রাজা কং! তখন তার সকল কথা মনে পড়ল।
খানিক তফাতেই দেখলে, পাহাড়ের ধারে বসে কং নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ে কী করছে। তাহলে এখনও সে তাকে ছাড়েনি। এই উঁচু গাছের গুঁড়ির ওপরে এখনও সে কঙের বন্দিনি?
আর একটা ভয়ানক ও কী জীব এদিকে আসছে? একি স্বপ্ন? একি সত্য? এমন জীব কি দুনিয়ায় থাকতে পারে? আকারে এ কঙেরই মতন বিরাট, কিন্তু এর চেহারা যে কঙেরও চেয়ে ভয়ঙ্কর! মাথায় পাঁচ-ছয়তলা বাড়ির চেয়েও উঁচু, যেন একটা বিশালদেহ কুমির ক্যাঙারুর মতন পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে লাফাতে লাফাতে আসছে।
মূর্তিটা আরও কাছে এলে পর মালবিকা দেখলে, তার সামনেও দুটো পা আছে বটে, কিন্তু সে পা দুটো এত পলকা যে, মুখে খাবার তুলে খাওয়া ছাড়া তার দ্বারা বোধহয় আর কোনও কাজ করাই চলে না। কিন্তু তার মুখ! কী ভীষণ, কী বীভৎস সে মুখ, দেখলেই যেন আর জ্ঞান থাকে না।
মূর্তিটা ক্ষুধিতভাবে রক্তরাঙা চক্ষে চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখছিল। হঠাৎ মালবিকা তার নজরে পড়ে গেল। আর কোথায় যায়? পৃথিবী কাঁপানো এক হুঙ্কার দিয়ে মালবিকার দিকে সে মস্ত এক লাফ মারলে। মালবিকাও মহা ভয়ে আর্তনাদ করে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললে।
সেই হুঙ্কার আর এই আর্তনাদ কঙের কানে গেল বিদ্যুতের মতন ফিরেই সে সেই নরখাদক জীবটাকে দেখতে পেলে। গুহার ভিতরকার তুচ্ছ মানুষ-পোকার কথা ভুলে তখনি সে উঠে দাঁড়াল এবং বিষম আক্রোশে দুই হাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে ঝড়ের মতন বেগে ধেয়ে এসে সেই ভয়াবহ দানবকে অকুতোভয়ে আক্রমণ করলে।
দানবটার গজালের মতন বড় বড় দাঁতে যেন আগুন খেলে গেল–মস্ত এক হাঁ করে সে কংকে কামড়ে দিতে এল–তারপরেই পরস্পরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে দুই বিরাট দেহই প্রপাত ধরণীতলে হল। কং পড়ল তার উপরদিকে। প্রথমটা মনে হল, এই দানবটাকে কায়দায় আনতে কঙের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু ভুল। সেও বড় সামান্য রাক্ষসে জীব নয়। কং দুই হাতে গলা টিপে ধরেছিল বটে, কিন্তু তার পিছনের বিষম মোটা বলবান পা দুটো দিয়ে সে শত্রুর বুকে এমন প্রচণ্ড লাথি মারলে যে, অদ্ভুত শক্তির অধিকারী হয়েও কং কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারলে না–বেজায় একটা ডিগবাজি খেয়ে সে বহুদূরে ছিটকে নীচে নদীর গর্ভে পড়ে যায় আর কি।
