নামতে নামতে সে দেখলে, সেতুর প্রায় পঞ্চাশ ফুট নীচে, নদীর তীরে-তীরে শত শত অজানা ও ভয়ানক জীব বিচরণ করছে। কোনওটা মাকড়সার মতো দেখতে, কিন্তু আকারের বড়-জাতের কচ্ছপকেও হার মানায়। কোনও কোনও জীব অনেকগুলো শুড় নেড়ে বেড়াচ্ছে, অক্টোপাসের মতো। কোনও কোনওটা গিরগিটির মতো কিন্তু কুমিরের মতো মস্ত গিরগিটি। তারা সবাই পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। শোভন শিউরে উঠে ভাবলে, নরকও বোধ করি এই দ্বীপের চেয়ে ভয়ানক নয়।
এদিকে ডেনহামও তার দলবল নিয়ে উঠে দাঁড়াল। অস্ত্র হাতে নিয়েও মানুষ এখানে নিরাপদ নয়, এখন আবার সকলকে নিরস্ত্র অবস্থায় এই সুদীর্ঘ পথ পার হতে হবে। হয়তো ফেরবার পথে আরও কত লোকের প্রাণ নষ্ট হবে। সেই বিষম হ্রদ! তার জলের তলা দিয়ে ক্ষুধার্ত সব কালো ছায়া আনাগোনা করে মানুষ সেখানে অসহায় কীট মাত্র, তার জীবনের কোনও মূল্যই নেই।
সকলে অত্যন্ত নাচারের মতো অগ্রসর হতে লাগল সকলেই বোবা ও বিমর্ষ, জাহাজে ফিরে যাবার জন্যেও কারুর মনে কিছুমাত্র উৎসাহ নেই।
কিন্তু সর্বনাশ! সেই শয়তান ট্রাইশেরোটপ তখনও যে পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে রাগে ঘোঁত ঘোঁত করছে। সামনে এতগুলো মানুষকে দেখেই প্রবল পরাক্রমে সে আবার তিনটে শিং নেড়ে তেড়ে এল।
ডেনহাম বললে, নদীর ধারে নদীর ধারে চলো সাঁকোর মতো সেই গাছের ওপরে।
সকলে ঊর্ধ্বশ্বাসে সেই পাহাড়ে নদীর তীরে সাঁকোর সামনে এসে দাঁড়াল।
শোভন ততক্ষণে ওপারে গিয়ে হাজির হয়েছে। পিছনে গোলমাল শুনে ফিরে দাঁড়িয়েই দেখলে, তার সঙ্গীরাও সাঁকোর ওপরে ছুটে আসছে এবং তাদের পিছনে-পিছনে আসছে মূর্তিমান বিভীষিকার মতো সেই ট্রাইশেরোটপ। ব্যাপারটা বুঝতে তার দেরি লাগল না।
এদিকে ওপর থেকে কার এক বিপুল ছায়া তার গায়ের ওপর এসে পড়ল।
মাথা তুলতেই নজরে পড়ল, কঙের প্রকাণ্ড মুখ পাহাড়ের পাশ থেকে উঁকি মারছে। পর-মুহূর্তেই কঙের মুখ আবার অদৃশ্য হয়ে গেল–শোভন বুঝলে, কং তাদের আক্রমণ করতে আসছে।
সে চিৎকার করে বললে, পালাও–পালাও-মাথার ওপরে সাক্ষাৎ যম!
দেখা গেল, আবার পাহাড়ের গা বেয়ে কং লাফাতে-লাফাতে নেমে আসছে।
শোভন হেঁট হয়ে দেখলে, নদীর ধার থেকে পাহাড়ের যে-অংশটা খাড়া ওপরে উঠেছে, তার ভিতরে মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট গুহার মতন রয়েছে অনেকগুলো গর্ত। পাহাড়ের ওপর থেকে অগুন্তি আঙুরলতা সেই সব গর্তের মুখ পর্যন্ত ঝুলে পড়ছে! আঙুরলতা যে কীরকম শক্ত, শোভনের সেটা অজানা ছিল না। সে চট করে একটা আঙুরলতা ধরে ঝুলে পড়ল এবং একটা গুহার ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
ডেনহামও তখন সাঁকো পেরিয়ে নদীর এপারে এসে পড়েছিল, শোভনের দেখাদেখি সেও আর একটা আঙুরলতাকে অবলম্বন করে আর-একটা গুহায় গিয়ে ঢুকল।
কং সাঁকোর মুখে এসে হাজির হল। যে নারকীয় দেশে সে বাস করে, সেখানকার মূলমন্ত্র হচ্ছে–হয় মারো, নয় মরো। হিংসাই সেখানকার ধর্ম! প্রত্যেক জীবই সেখানে অন্য জীবকে হিংসা করে। কাজেই জীবিত যা কিছু, কং তাকেই শত্রু বলে ভাবে–তা সে আকারে ছোটই হোক, আর বড়ই হোক।
এতগুলো মানুষ পোকাকে দেখে তাই কঙের আজ রাগের সীমা নেই! একটা বজ্ৰদগ্ধ চুড়োভাঙা গাছের গুঁড়ির ওপরে মালবিকার জ্ঞানহারা দেহকে সকলের নাগালের বাইরে রেখে, কং সশব্দে তার বুক চাপড়াতে লাগল–যেন সে সবাইকে যুদ্ধে আহ্বান করছে!
কঙের কাছে পোকার মতোই খুদে-খুদে সেই মানুষগুলো তার সঙ্গে যুদ্ধ করবে কি, উভয় সঙ্কটে পড়ে তাদের অবস্থা তখন অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়েছে। সাঁকোর এদিকে দাঁড়িয়ে কং করছে যুদ্ধং দেহি, যুদ্ধং দেহি আর সাঁকোর ওদিকে দাঁড়িয়ে তিন তিনটে। শিং উঁচিয়ে তড়পাচ্ছে সেই বিশ্রী ট্রাইশেরোটপ! তুচ্ছ এক গাছের গুঁড়ির সাঁকো, তার ওপরে আঠারো জন অসহায় মানুষ–একবার পা ফসকালেই আর রক্ষা নেই।
কং গাছের গুঁড়িটা ধরে একবার একটা ঝকানি দিয়ে দেখলে। মানুষগুলো অমনি গুঁড়ি জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল শুনে কং নিজের ভাষায় কচর কচর করে কি যেন বলতে লাগল।
শোভন গুহা থেকে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বললে, হুশিয়ার হুঁশিয়ার!
কং শোভনকে দেখে তার দিকেই দুপা এগিয়ে এল কিন্তু তার পরেই কী ভেবে আবার সাঁকোর মুখে গিয়ে দাঁড়াল।
ডেনহাম নিজের গুহার ভিতর থেকে একখানা বড় পাথর দু-হাতে তুলে কংকে সজোরে ছুঁড়ে মারলে। সে পাথরখানা কোনও মানুষের ওপরে গিয়ে পড়লে তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু ঘটত; কিন্তু তার আঘাত কং গ্রাহ্যের মধ্যেই আনলে না। সে দুই হাতে কাঠের গুঁড়ির একমুখ তুলে ধরে ক্রমাগত ডাইনে-বাঁয়ে নাড়া দিতে লাগল।
দুইজন হতভাগ্য লোক গাছের গুঁড়ি থেকে ফসকে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠে নীচে পড়ে গেল। সেখানে নদীর জল ছিল না। প্রথম লোকটা নীচে পড়ে একটুও নড়ল না। কিন্তু সে পড়বামাত্রই কুমিরের মতো মস্ত একটা গিরগিটি এসে তার দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় লোকটা পড়ল নীচের দিকে পা করে–তার কোমর পর্যন্ত কাদায় ডুবে গেল। হয়তো সে বেঁচে যেত, কিন্তু সে যখন কাদা থেকে ওঠবার চেষ্টা করছে, তখন কোথা থেকে দলে দলে প্রকাণ্ড কাছিমের মতো মাকড়সা এসে তাকে আক্রমণ করলে। সে পরিত্রাহি ডাক ছাড়তে লাগল এবং সেই মাকড়সাগুলো তার গা থেকে ডুমো ডুমো মাংস খুবলে খেতে লাগল।
