আপনিও তো নিজের বন্দুকটা জলে ফেলে এসেছেন!
হ্যাঁ, হ্যাঁ–যাক গে, আর কিছু বলতে চাই না। কিন্তু চোখের সামনেও বেচারার প্রাণ গেল, আর আমরা কিছু করতে পারলুম না।
শোভন বললে, আর এখানে থাকলে এইবার আমাদেরও প্রাণ যাবে! ওই দেখ ডাইনসরটা ডাঙার দিকেই আসছে। জলে-স্থলে ওর অবাধ গতি।
সবাই আবার প্রাণপণে ছুটল–হ্রদের ধার ছেড়ে, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, ঢালু পাহাড়ের গা বয়ে!
পিছনে আর কোনও শব্দ নেই শুনে সবাই আবার দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।
কিন্তু ভগবান সেদিন তাদের কপালে বিশ্রাম লেখেননি। এক মিনিট জিরুতে না জিরুতে নীচের দিকে জঙ্গল ভাঙার শব্দ হল।
ডেনহাম আঁতকে উঠে বললে, আবার সেই ডাইনসর আসছে নাকি?
শোভন বললে, চুপ! নীচের ওইদিকটায় চেয়ে দেখো!
সেই গরিলা দানব–রাজা কং! তার ডানহাতের মুঠোয় তখনও মালবিকা অজ্ঞান হয়ে আছে।
কী বৃহৎ তার দেহ বড় বড় গাছের ওপরেও তার মাথা জেগে আছে। অতি যত্নে মালবিকাকে নিয়ে ঢালু পাহাড়ের গা বেয়ে সে ওপরে উঠে আসছে এবং মাঝে মাঝে মালবিকার দেহের দিকে যেন সস্নেহেই তাকিয়ে আছে।
আচম্বিতে পাশের জঙ্গল ভেদ করে আরও দুটো বেয়াড়া, ভীষণদর্শন জানোয়ার কঙয়ের সামনে এসে পথ জুড়ে দাঁড়াল। দেখতে কতকটা গন্ডারের মতো, কিন্তু মাথায় তারা প্রায় হাতির সমান উঁচু এবং তাদের প্রত্যেকের মাথার ওপরে তিন-তিনটে করে ধারাল শৃঙ্গ।
ডেনহাম চুপিচুপি সভয়ে বললে, ও আবার কী সৃষ্টিছাড়া জীব?
শোভন বললে, ট্রাইশেরোটপ! ওরাও সেকেলে পৃথিবীর জীব।
ট্রাইশেরোটপদের দেখেই কং যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল! সে তখনি একটা উঁচু ঢিপির ওপরে মালবিকার দেহকে নিরাপদ করবার জন্যে তুলে রাখলে এবং তারপর প্রকাণ্ড একখানা পাথর তুলে গর্জে উঠে সজোরে একটা ট্রাইশেরোটপের দিকে নিক্ষেপ করলে। কঙয়ের হাতের জোরে ও পাথরের ভারে ট্রাইশেরোটপের একটা শৃঙ্গ তখনি ভেঙে গেল।
ডেনহাম সবিস্ময়ে বললে, ও দানবের দেহের শক্তি স্বচক্ষে দেখেও যে বিশ্বাস হচ্ছে না। ও পাথর ছুড়লে না, একটা পাহাড় তুলে ছুড়লে? অত বড় পাথর, কোনও জ্যান্ত জীব তুলতে পারে?
এদিকে সঙ্গীর দুর্দশা দেখে দ্বিতীয় ট্রাইশেরোটপটা ভয়ে পিছিয়ে আসতে লাগল। প্রথমটাও পালাই পালাই করছে, কিন্তু তার আগেই আর একখানা আরও বড়-প্রস্তর তুলে কং আবার তার দিকে সজোরে ছুড়ল সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে রইল। বিজয়গৌরবে ফুলে উঠে কং সগর্বে দুই হাতে ঘন ঘন নিজের বুক চাপড়াতে লাগল।
শোভন বললে, আর এখানে নয়। ওই দেখুন, দ্বিতীয় ট্রাইশেরোটপটা এদিকেই ছুটে আসছে। ওর আগেই আমাদের পালাতে হবে।
সকলে দ্রুতপদে পলায়ন করলে! কিন্তু ট্রাইশেরোটপটা তাদের চেয়েও বেশি তাড়াতাড়ি ছুটে আসছিল–সে তাদের দেখতে পেলে এবং এরা আর একদল নতুন শত্রু ভেবে ভীষণ আক্রোশে তাদের আক্রমণ করলে।
সকলের পিছনে ছিল যে বেচারা, সে ভয়ে তাড়াতাড়ি একটা গাছের ওপরে চড়তে লাগল। কিন্তু ট্রাইশেরোটপের মাথার এক আঘাতে গাছটা মড় মড় করে ভেঙে পড়ল।
তার পরেই বুকফাটা এক আর্তনাদ এবং তারপরেই ট্রাইশেরোটপের নিষ্ঠুর শৃঙ্গ আর একজন অসহায় মানুষের কণ্ঠ চিরকালের জন্যে নীরব করে দিলে।
.
আট । মানুষ পোকা
সকলে একান্ত শ্রান্তভাবে টলতে টলতে একটা বড় ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বসে পড়ল।
মানুষের শরীরে আর কত সয়? সাহস ও বীরত্বেরও একটা সীমা আছে। এই খানিক আগেই যারা বলেছিল, আমরা মরতে ভয় পাই না এখন তারাই আর সে কথা বলতে পারবে কিনা সন্দেহ। ভেলা ডোবার সঙ্গে-সঙ্গে তাদের সমস্ত আশা ফুরিয়ে গিয়েছে। তারা এতক্ষণে বুঝলে, যেখানে পদে পদে এমন সব মারাত্মক বিপদ, সেখানে নিরস্ত্র ক্ষুদ্র মানুষ কোনও কাজই করতে পারবে না।
তখনও হাল ছাড়েনি খালি শোভন ও ডেনহাম।
ডেনহাম বললে, মি. সেন, আমার এক প্রস্তাব আছে। আমার বিশ্বাস, খালি হাতে ওই দানবের কাছ থেকে মিস্ সেনকে আমরা কখনওই উদ্ধার করতে পারব না। তার চেয়ে আর এক কাজ করলে কেমন হয়?
কী কাজ?
আমাদের একজন এখানে থেকে লুকিয়ে-লুকিয়ে ওই গরিলা-দানবের গতিবিধির ওপরে দৃষ্টি রাখুক। দলের বাকি লোকেরা কোনওরকমে ফিরে গিয়ে আবার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসুক।
এ পরামর্শ মন্দ নয়। আপনারা ফিরে যান, আমি এখানে থেকে ওই দানবের ওপরে পাহারা দি।
কিন্তু ওই দেখুন মি. সেন, দানবটা আবার এই দিকেই আসছে। ও কি আমাদের দেখতে পেয়েছে?
মালবিকার অচেতন দেহ সেইভাবে করতলে নিয়ে কং আবার এই দিকেই আসছে বটে! কিন্তু তার ভাব দেখে মনে হয় না, সে সন্দেহজনক কিছু দেখেছে। কারণ, সে বেশ নিশ্চিন্তভাবেই পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসছে।
খানিকটা এগিয়ে এসেই সে আবার থেমে দাঁড়াল। একবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চারিদিকে দেখে নিলে। তারপর পাহাড়ের গা বেয়ে একদিকে নামতে লাগল।
অত্যন্ত সন্তর্পণে সবাই ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখলে, অল্প নীচেই আর একটা পাহাড়ে নদী বয়ে যাচ্ছে। সেই নদীর এপার থেকে ওপার পর্যন্ত রয়েছে সুদীর্ঘ একটা গাছের গুঁড়ি। হয়তো কবে কোনও ঝড়ে পড়ে গিয়ে গাছটা এই স্বাভাবিক সেতুর সৃষ্টি করেছে।
কং সেই সেতু পার হয়ে ওপারের জঙ্গলের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শোভন বললে, আমিও সেতু পার হয়ে ওর পিছনে পিছনে চললুম। আপনারা ফিরে গিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসুন। আমি আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করব! এই বলে সেও পাহাড়ের গা বেয়ে সেতুর দিকে নামতে লাগল।
