বোমা ফাটবার সময়ে কাছে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে তারও আহত হওয়ার সম্ভাবনা। সবাই শুয়ে পড়ল–সেই হিংস্র দানবটার দিকে সজোরে বোমা ছুঁড়ে ডেনহামও ধরণীতলকে আশ্রয় করলে!
গড়াম করে কান-ফাটানো শব্দের সঙ্গে বোমা ফেটে গেল–চারিদিকে ধুলো-ধোঁয়া কাঠ পাথর মাংস ও হাড়ের টুকরো ঠিকরে পড়তে লাগল এবং সকলেই শুনতে পেলে বিরাট এক দেহ মাটির ওপরে এক প্রচণ্ড আছাড় খেলে।
সকলে আবার উঠে দাঁড়াল। প্রায় ডেনহামের পায়ের কাছে এসে সেই জীবটার অজগরের মতন ভয়ানক মুখটা ছটফট করছে এবং তার দেহটা স্থির ও উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে ছোটখাটো একটা পাহাড়ের মতো!
আরও গোটাকয়েক গুলিবৃষ্টি করবার পর তার শেষ প্রাণটুকুও বেরিয়ে গেল।
শোভন বললে, কী ভয়ানক! বোমা ছোড়বার পরেও এই জীবটা অন্তত পঞ্চাশ ফুট জমি পার হয়ে এসেছে।
ডেনহাম আনন্দ ও গর্বের স্বরে বললে, কিন্তু এই রাক্ষসকে আমি কাত করেছি। একি যে-সে বোমা!
শোভন বললে, আমি যা ভেবেছিলুম, তাই। যে-কোনও কারণেই হোক, এই দ্বীপে সেকেলে পৃথিবীর রাক্ষুসে জীবগুলো এখনও বেঁচে আছে!..কিন্তু এখন আমাদের এ সব কথা ভাববার সময় নেই। এবার কোনদিকে যাব?
একজন নাবিক আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে, এই তো আমাদের পথ। দেখছেন না, জঙ্গল ভেঙে এখান দিয়ে যেন একটা পাগলা হাতি চলে গিয়েছে!
নাবিক ঠিকই বলেছে। সকলে আবার সেই পথে পা চালিয়ে দিলে। বেশিদূর যেতে হল না! আবার সুমুখে এক মস্ত বাধা!
জঙ্গলের একপাশে নদীর জল প্রায় একটা হ্রদের মতো জলাশয় সৃষ্টি করেছে। গরিলা দানবের পায়ের দাগ সেই জলের ভিতরে নেমে গিয়েছে; দেখলে বুঝতে দেরি লাগে না যে, সে হ্রদ পার হয়ে ওপারে গিয়ে উঠেছে।
হ্রদের গভীরতা পরীক্ষা করে সকলেই বুঝলে এবারে আর পায়ে হেঁটে ওপারে যাওয়া চলবে না। এখন উপায়?
ডেনহাম দমবার পাত্র নয়। সে বললে, এসো, সবাই মিলে গাছ কেটে ভেলা তৈরি করি। আমরা ভেলায় চড়ে হ্রদ পার হব।
তা ছাড়া উপায়ও ছিল না। সবাই গাছ কাটতে আরম্ভ করলে।
শোভন বললে, আমার ভগ্নীর উদ্ধারের জন্যে আমাকে যদি পৃথিবীর এদিক থেকে ওদিকে যেতে হয়, যদি মরণের সম্মুখীনও হতে হয়, তাতেও আমার ভাববার কিছু থাকবে না। এইমাত্র আমরা যে অদ্ভুত জীবের কবলে গিয়ে পড়েছিলুম, এই দ্বীপে হয়তো তার চেয়েও সব ভয়ংকর জীবজন্তু আছে। হয়তো তাদের আক্রমণে আমাদের অনেকেরই প্রাণ যাবে। আমার ভগ্নীর জন্যে আপনারা নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করবেন কি না, এইবেলা সেই কথাটা ভেবে দেখুন। আমি নিশ্চয়ই মরণের দুয়ার পর্যন্ত এগিয়ে যাব, কিন্তু আপনারা ইচ্ছা করলে এখনও ফিরে যেতে পারেন।
সকলে একস্বরে বলে উঠল, আমরা কাপুরুষ নই মরতে ভয় পাই না।
.
সাত। ডাইনসর
কতকগুলো মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি কেটে শক্ত লতার বাঁধনে তাদের একসঙ্গে বেঁধে ভেলা তৈরি করা হল। লম্বা-লম্বা গাছের ডালের সাহায্যে ভেলা চালাবারও ব্যবস্থা হল।
বাইশজন লোক সেই ভেলার পক্ষে গুরুভার হলেও ভেলা সে-ভার কোনওরকমে সহ্য করলে। তারপর ভেলাকে অন্য তীরের দিকে সাবধানে চালনা করা হল।
খানিক দূরে গিয়ে গাছের লম্বা ডাল যতটা পারা যায় জলে ডুবিয়েও থই পাওয়া গেল না।
ডেনহাম বললে, আচ্ছা, ডালগুলোকে দাঁড়ের মতো ব্যবহার করো। অবশ্য, আমরা আর ততটা তাড়াতাড়ি যেতে পারব না, কিন্তু এ ছাড়া উপায়ও নেই।
ডালগুলোকে দাঁড়ের মতো ব্যবহার করাতে ভেলাটা টলমল করতে লাগল।
ডেনহাম বললে, ভাইসব, সাবধান! ভেলা উলটোলে আর রক্ষা নেই।
হঠাৎ সমস্ত ভেলাটা একপাশে কাত হয়ে পড়ল–যেন জলের ভিতরে কীসের সঙ্গে তার ধাক্কা লেগেছে।
সেইসঙ্গেই একসঙ্গে যেন পঞ্চাশটা ষাঁড় ক্রুদ্ধ গর্জন করে উঠল।
একজন নাবিক সভয়ে বললে, হে ভগবান! ও আবার কী?
জলের মধ্য থেকে ভেলার ঠিক পাশেই প্রকাণ্ড একখানা বীভৎস মুখ এবং বিরাট একটা দেহের কতক অংশ জেগে উঠল। সে মুখখানা এত বড় যে, এক গ্রাসে পাঁচ-ছয়জন মানুষকে গিলে ফেলতে পারে!
শোভন বলে উঠল, ডাইনসর! ডাইনসর! ছবিতে আমি এ মূর্তি দেখেছি।
ভীষণ আতঙ্কে সকলে এ ওর ঘাড়ে গিয়ে পড়ল! ভেলা উলটে যায় আর কি!
হঠাৎ সেই ভয়াবহ ডাইনসর জলের ভিতরে আবার ডুব মারলে। নাবিকরা আস্বস্তির নিশ্বাস ফেললে; কিন্তু শোভন ও ডেনহাম দেখলে জলের ভিতর দিয়ে মস্ত একটা ছায়া ভেলার দিকে এগিয়ে আসছে।
ডেনহাম তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ভেলা সামলাও–ভেলা সামলাও! কিন্তু তার মুখের কথা ফুরোতে না ফুরোতে সেই ক্রুদ্ধ জীবটা ভেলার তলায় বিষম এক টু মারলে। পর মুহূর্তে ভেলাখানা টুকরো-টুকরো হয়ে শূন্যে ঠিকরে উঠে আবার জলের ভেতরে গিয়ে পড়ল।
শোভন, ডেনহাম ও অন্যান্য নাবিকরা পাগলের মতো ওপারের দিকে সাঁতরে চলল। ভাগ্যে তীর আর বেশি দূরে ছিল না, সবাই কোনওরকমে ডাঙায় গিয়েই উঠে পড়ল–কেবল একজন ছাড়া। ডাঙায় উঠে শোভন ও ডেনহাম তাড়াতাড়ি পিছন ফিরে দেখলে, ডাইনসরটা আবার জলের ওপর মাথা তুলছে এবং তার চোয়ালের একপাশ দিয়ে এক হতভাগ্যের পা দুটো বেরিয়ে তখনও ছটফট করছে।
ডেনহাম শিউরে বলে উঠল, বোমা। একটা বোমা দাও।
একজন নাবিক বললে, বোমা জলে তলিয়ে গেছে।
বন্দুক, বন্দুক, একটা বন্দুক!
তাও জলের ভেতরে।
মূর্খ! তোমার নিজের বন্দুকটাও রক্ষা করতে পারোনি?
