কাপ্তেন বললেন, এক মিনিট অপেক্ষা করুন মি. সেন…ডেনহাম, তুমি বিশ জন লোক নিয়ে মি. সেনের সঙ্গে যাও। বাকি লোকদের নিয়ে জাহাজ আর অসভ্যদের ওপরে পাহারা দেবার জন্যে আমি এখানে থাকি। সকলে এইটুকু মনে রেখো মিস্ সেনকে উদ্ধার করা আমাদের কর্তব্য–তাঁকে উদ্ধার করা চাই-ই।
সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, হ্যাঁ, তাঁকে উদ্ধার করবার জন্য আমরা প্রাণ দিতেও ভয় পাব না।
কাপ্তেন বললেন, ভগবান তোমাদের সহায় হোন।
শোভন, ডেনহাম ও বিশজন নাবিক সেই দুর্গম অরণ্য ও দুরারোহ পর্বতের দিকে ঝড়ের মতো ছুটে চলল!
পাহাড়ের যেখান থেকে সেই দানব গরিলার মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, সেইখানে উপস্থিত হয়ে দেখা গেল, পাহাড়ের গা সেখানে ঢালু হয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে– যেন জঙ্গলময় পাতালের অন্ধকারের মধ্যে।
ডেনহাম বললে, সকলে একসার হয়ে চলো–একজনের পিছনে আর-একজন। প্রত্যেকে তার আগের লোকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে অগ্রসর হও!
একে পাহাড়ের ঢালু গা, তার ওপরে জঙ্গল ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছে।
ডেনহাম বললে, মি. সেন, জাহাজে চাকরি নিয়ে আমি সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছি, সব দেশের গাছপালাই আমি চিনি। কিন্তু এখানকার জঙ্গলের একটা গাছও আমি চিনতে পারছি না। এসব গাছপালা দেখলে মনে হয়, এরা যেন এ পৃথিবীর নয়!
শোভন বললে, কেতাবে আমি সেকেলে পৃথিবীর গাছপালার ছবি দেখেছি। এখানকার গাছপালা দেখে সেই ছবির কথা আমার স্মরণ হচ্ছে। এখানকার সঙ্গে বোধহয় আধুনিক জগতের কোনও সম্পর্ক নেই হয়তো এখানকার জীবজন্তুরাও সেকেলে জীবজন্তুদের মতন ভয়ংকর আর কিম্ভুতকিমাকার!
আপনি তো বলছেন, সেই গরিলা-দানবটাকে আপনি দেখতে পেয়েছেন। মাথায় সে কত উঁচু হবে?
শোভন বললে, আমি অনেক দূর থেকে চকিতের মতো তাকে একবার মাত্র দেখেছি। ঠিক করে কিছু বলতে পারব না, তবে আমার মনে হল, মাটি থেকে তার মাথা বোধহয় পঞ্চাশ-ষাট ফুটের চেয়ে কম উঁচু হবে না।
ডেনহাম চমকে উঠে বললে, কী সর্বনাশ! বলেন কী?
পাহাড়ের ঢালু গা একটা উপত্যকার ভিতরে এসে শেষ হয়েছে। উপত্যকার ভিতর দিয়ে। একটা পাহাড়ে নদী কলকল স্বরে বয়ে যাচ্ছে এবং নদীর ওপারে পাহাড়ের গা আবার ওপর। দিকে উঠে গিয়েছে। আরও একটা লক্ষ করবার বিষয় হচ্ছে, নদীর ওপারে যে জঙ্গল রয়েছে তা আরও ঘন এবং দুর্ভেদ্য। সেখানকার এক-একটা গাছই একশো-দেড়শো ফুট বা তার চেয়েও বেশি উঁচু! সেইসব গাছের ওপরে কতরকমের পরগাছা ভিড় করে আছে এবং অসংখ্য লতাপাতার জালে প্রত্যেক গাছের সঙ্গে প্রত্যেক গাছ বাঁধা। এখন আকাশে সূর্যালোকের জোয়ার বইছে, কিন্তু সেই নিবিড় অরণ্যের মধ্যে কোনওকালেই বোধহয় সূর্যালোক প্রবেশ করবার পথ পায়নি!
শোভন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, দেখুন মি. ডেনহাম! নদীর তীরে ভিজে মাটির দিকে চেয়ে দেখুন।
ডেনহাম ও নাবিকরা আশ্চর্য হয়ে দেখলে, ভিজে মাটির ওপরে সারি সারি পায়ের দাগ রয়েছে। সেসব পায়ের দাগ মানুষের পায়ের দাগের মতন দেখতে বটে, কিন্তু মানুষের পায়ের দাগের চেয়ে তা অনেক অনেক গুণ বড়, কারণ তার প্রত্যেকটি পদচিহ্ন পাঁচ-ছয় ফুটের চেয়ে কম লম্বা হবে না!
শোভন বললে, এতক্ষণে সবাই বুঝতে পারলেন তো, আমরা কী ভীষণ দানবের পিছু নিয়েছি। সেই দানব এইখান দিয়ে নদী পার হয়ে গেছে। নদীটা ছোট, জলও বোধহয় বেশি নেই,–আসুন, আমরাও পার হয়ে যাই।
বাস্তবিক, নদীতে এক কোমরের বেশি জল হল না,সকলেই একে একে নিরাপদে পার হয়ে গেল।
ওপারে গিয়ে পায়ের দাগ দেখে বোঝা গেল, সেই দানবটা পাহাড়ের গা বয়ে আর ওপরে উঠেনি, ডানদিকে ফিরে নদীর ধার ধরেই চলে গেছে। সকলে সেই পথেই অগ্রসর হল। কিন্তু খানিক দূর গিয়ে পায়ের দাগও আর পাওয়া গেল না!
ডেনহাম বললে, এই যে, জঙ্গল সরিয়ে এখান দিয়ে মস্ত বড় কোনও জানোয়ার ভিতরে ঢুকেছে। এই পথেই এসো।
আরও খানিকটা এগিয়েই ডেনহাম থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
শোভন বললে, ব্যাপার কী?
ডেনহাম বললে, সামনের দিকে চেয়ে দেখুন!
জঙ্গলের ভিতরে ছোট্ট একটা জমি। সেখানে এক ভীষণাকার জীব বিচরণ করছে! তার দেহটা চার-চারটে হাতির চেয়ে বড়, ল্যাজটা কুমিরের মতন দেখতে কিন্তু লম্বায় তা চব্বিশ-পঁচিশ ফুট হবে এবং তার ওপরে শত শত তীক্ষ্ণ গজাল! তার গলদেশও দীর্ঘায় চব্বিশ-পঁচিশ ফুটের চেয়ে কম হবে না এবং মুখটা দেখতে অজগর সাপের মতো। এই হস্তি কুমির-অজগর আকৃতির কিম্ভুতকিমাকার অতিকায় দানবটা আপন মনে পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে এবং তার পদভরে পৃথিবীর বুক থরথর করে কেঁপে উঠছে।
হঠাৎ সে-ও শোভনদের দূর থেকে দেখে ফেললে এবং সঙ্গে-সঙ্গে এমন বিকট ও কর্কশ স্বরে গর্জন করে উঠল যে, আকাশ বাতাস পর্যন্ত যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।
ডেনহাম চেঁচিয়ে বললে, সবাই সাবধান! ও আমাদের দেখতে পেয়েছে! ও আমাদের দিকে আসছে!
ডেনহাম ও শোভন একসঙ্গে বন্দুক ছুড়লে, গুলি তার গায়েও লাগল, কিন্তু তার অত বড় দেহের ভিতরে দুটো খুদে-খুদে গুলি ঢুকে কিছুই করতে পারল না, সে এক-এক লম্বা লাফ মেরে তেমনি বিকট স্বরে চাঁচাতে-চাঁচাতে শোভনদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
ডেনহাম আবার গলা তুলে বললে, সবাই মাটির ওপর শুয়ে পড়ো! আমি বোমা ছুড়ছি!
